কী করুণ মৃত্যু ১৬ দিনের শিশুর!

প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০১৯     আপডেট: ১২ জানুয়ারি ২০১৯      

সমকাল প্রতিবেদক

শীতের সকালে রোদ পোহাতে ১৬ দিন বয়সী ভাগ্নে আব্দুল্লাহকে কোলে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়েছিল কিশোরী তামিমা সুলতানা। টিনশেড ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার সময় হঠাৎ ওপর থেকে একটি ইটের টুকরো তার মাথায় পড়ে। তার মাথায় পড়ার পর তা নবজাতকটির মুখের ওপরও পড়ে। ইটের আঘাতে তামিমার মাথা ফেটে যায় আর আব্দুল্লাহ আহত হয়। খালা তামিমার কোল থেকে নিচে পড়ে যায় আব্দুল্লাহ। এরপর হাসপাতালে। আর সেখান থেকে মৃত্যুর হিমশীতল কোলে আশ্রয় মেলে তার। মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটেছে রাজধানীর মিরপুরের পাইকপাড়ার আহম্মেদ নগর এলাকায়।

আহত তামিমা সুলতানা জানায়, আহম্মেদ নগরের জোনাকী রোডের টিনশেড বাসায় তারা থাকে। তার ভগ্নিপতি কবির হোসেন পেশায় প্রাইভেটকার চালক। বোন লাইজু বেগম গৃহিণী। ১৫ দিন আগে মিরপুরের একটি হাসপাতালে তাদের দ্বিতীয় সন্তান আবদুল্লাহর জন্ম হয়। গতকাল সকাল ১০টার দিকে তামিমা তার ঘুমন্ত ভাগ্নেকে কোলে নিয়ে রোদে দাঁড়িয়েছিল। ইটের টুকরোটি প্রথমে তার মাথায় পড়ে, এরপর তা গড়িয়ে পড়ে আব্দুল্লাহর মুখে। একই সময়ে তার হাত ফসকে শিশুটি নিচে পড়ে যায়।

শিশুটির বাবা কবির হোসেন জানান, তামিমার চিৎকার শুনে সবাই এগিয়ে যায়। আব্দুল্লাহকে উদ্ধার করে প্রথমে আগারগাঁওয়ের শিশু হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে তাকে স্থানান্তর করা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে দুপুর ১টার দিকে তাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।

কবির জানান, ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর পরই আব্দুল্লাহর জন্ডিস ধরা পড়ায় নয় দিন হাসপাতালেই থাকতে হয়। সুস্থ হওয়ার পর শনিবার তাকে বাসায় আনা হয়। লামিয়া নামে তাদের ৯ বছর বয়সী এক মেয়ে রয়েছে। দেড় বছর আগে তাদের বড় মেয়ে আনিলা (১১) অসুস্থ হয়ে এখানেই মারা যায়।

সরেজমিন দেখা যায়, জোনাকী রোডে কবির হোসেনের টিনশেড বাসার পাশেই একটি তিনতলা ভবন। সেটির তৃতীয় তলায় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে থাকেন শফিকুর রহমান। তিনি জানান, সাড়ে তিন ও দুই বছর বয়সী দুই মেয়ে রয়েছে তার। গতকাল সকালে তিনি লক্ষ্য করেন, মেয়েরা ঘরে নেই। তাদের খোঁজে তিনি বাসার নিচে নেমে যান। সেখানেও শিশু দুটি ছিল না। এরপর তিনি তৃতীয় তলার ছাদে গিয়ে দুই মেয়েকে পান। তারা জানায়, দুই বোন খেলার সময় হঠাৎ করেই ইটের টুকরোটি নিচে পড়ে যায়।

প্রতিবেশীদের অভিযোগ, তিনতলা বাড়িটির ছাদ থেকে মাঝেমধ্যেই বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য ও নোংরা জিনিসপত্র ফেলা হয়। এ বিষয়ে বাড়িওয়ালার কাছে অভিযোগ জানিয়েও তারা কোনো সুফল পাননি।

এদিকে ছোট্ট আব্দুল্লাহর মৃত্যুর খবরে ঢামেক হাসপাতালে কান্নায় ভেঙে পড়েন তার স্বজন। তাদের কান্না-আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে হাসপাতালের পরিবেশ। সন্তান হারানোর শোকে লাইজু বেগম একটু পর পরই অচেতন হয়ে পড়ছিলেন। আর ভাগ্নের মৃত্যুর জন্য নিজেকে 'অপরাধী' ভাবছে তামিমা। তার ভাষ্য, সে ওখানে না দাঁড়ালে এমন মর্মান্তিক পরিণতি হতো না আব্দুল্লাহর। নিহত শিশুটির স্বজনরা জানান, এ ঘটনায় তারা কোনো মামলা করতে চান না। কারণ, কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে এ ঘটনা ঘটায়নি।

মিরপুর থানার ওসি দাদন ফকির সমকালকে বলেন, এটি নিছক দুর্ঘটনা। পাশের ভবনের ছাদে দুই শিশু খেলার সময় ইটের টুকরোটি গড়িয়ে পড়ে। এতেই নিচে খালার কোলে থাকা শিশুটির মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় কোনো পক্ষই পুলিশের কাছে অভিযোগ করেনি। তবে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে।