অর্থমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি

অসাধু ব্যবসায়ীরা সাবধান সাবধান এবং সাবধান

প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯      

সমকাল প্রতিবেদক

ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। গতকাল এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী বলেন, অসাধু ব্যবসায়ীরা ঋণ নিয়ে উদ্দেশ্যমূলক তা শোধ করেন না। এদের কোনো ছাড় নেই। এ সময় তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, অসাধু ব্যবসায়ীরা- সাবধান, সাবধান এবং সাবধান। তিনি আরও জানান, এই অসাধু ব্যবসায়ীদের যারা সাহায্য করেছেন, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে রাষ্ট্রীয় মালিকানার রূপালী ব্যাংক আয়োজিত বার্ষিক ব্যবসায়িক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনিয়ম ধরতে বহিঃনিরীক্ষক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সব ব্যাংকে বিশেষ অডিট করার ঘোষণাও দেন অর্থমন্ত্রী।

রূপালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মনজুর হোসেন এমপির সভাপতিত্বে সম্মেলনে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ফজলুল হক। স্বাগত বক্তব্য দেন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আতাউর রহমান প্রধান। সম্মেলনে সারা দেশের ৪৬৮টি শাখার ব্যবস্থাপক এবং প্রধান কর্যালয় ও জোনাল অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

অর্থমন্ত্রী বলেন, মালয়েশিয়ায় কেউ ঋণ নিয়ে খেলাপি হলে সব সংস্থার কাছে তার তালিকা দেওয়া হয়। ঋণখেলাপি ব্যক্তি দেশের বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করলে তাকে বিমানবন্দরে আটক করা হয়। সেখানে কেউ খেলাপি হয়ে দেশের বাইরে গিয়ে ফুর্তি করতে পারে না। কঠোরতার ফলে দেশটি আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা আনতে পেরেছে। বাংলাদেশেও এ ধরনের উদ্যোগ নিতে হবে। ভালোদেরকে উৎসাহিত এবং খারাপদের নিরুৎসাহিত করা হবে। তিনি উল্লেখ করেন- 'সময় কঠিন; কেউ সহজ সিদ্ধান্ত নিলে ফেল করবেন।'

মুস্তফা কামাল বলেন, এদেশে দু'ধরনের ব্যবসায়ী আছে। এক শ্রেণি ভালো ব্যবসায়ী; আরেক শ্রেণি অসাধু ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ীরা ঝুঁকি নিয়ে এদেশের অর্থনীতির হাল ধরেছেন। তারা সময়মতো ঋণ শোধ করেন। মাঝেমধ্যে হোঁচট খেয়ে বাধাগ্রস্ত হন। অনেক চেষ্টা করেও প্রকৃত সমস্যার কারণে কখনও কখনও হয়তো টাকা ফেরত দিতে পারেন না। অসাধু ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তাদের এক করলে হবে না। অসাধু ব্যবসায়ীরা ঋণ নেন শোধ না করার জন্য। এদের জন্য কোনো ছাড় নেই। কেউ প্রকৃত সমস্যায় পড়লে সুবিধা দেওয়া হবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, অনিয়ম ধরতে সব ব্যাংকে বিশেষ অডিট করা হবে। অডিটের মাধ্যমে দেখা হবে যাদের ঋণ দেওয়া হয়েছে, তারা কারা। ব্যাংকের মাধ্যমে মেশিনারিজ আমদানি করে তা কোথায় বসানো হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হবে। তিনটি বহিঃনিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করে ব্যাংকগুলোর গত তিন বছরের তথ্য যাচাই করা হবে। তবে বিপদে ফেলার জন্য নয়; নিরীক্ষা হবে ব্যাংকারদের নির্ভার করার জন্য। ব্যাংকারদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ঋণ দেওয়ার আগে ভালোভাবে দেখতে হবে। ঋণ নিয়ে যার যন্ত্রপাতি আমদানি করার কথা, তিনি করলেন কি-না, যাচাই করতে হবে। দেখতে হবে, কারখানা আছে, নাকি শুধু নগদ সহায়তা পাওয়ার জন্য রফতানি দেখিয়ে যাচ্ছেন। সরকার এসব বিষয় দেখবে। এ জন্য গভর্নর ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবের সঙ্গে আলাপ করে নিরীক্ষা কার্যক্রম শুরু করা হবে।

অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ অনেক বেশি। খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি একটা অপরাধ। কেননা, ব্যাংকে জনগণের পরিশ্রমের টাকা থাকে। এটা সঠিক ব্যবহার করতে না পারাটা ব্যর্থতা। দেখা যাচ্ছে, রফতানি এলসির বিপরীতে বিদেশে পণ্য পাঠানোর কথা বলে কেউ ব্যাংক থেকে ঋণ নিল, অথচ রফতানি আয় দেশে আসেনি। বারবার একই ব্যক্তি বা একই গ্রুপ একই কাজ করল, অথচ একবারও ব্যাংক দেখল না। এভাবে ১০ বার, ২০ বার, ৩০ বার টাকা নিয়ে চলে যাবে; একবারও দেখবে না- এটা হতে পারে না। এ ধরনের অনিয়মের ক্ষেত্রে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

তিনি বলেন, ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে পরিবর্তিত পরিস্থিতি বিবেচনায় নিতে হবে। ঋণ দেওয়ার প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি আগে দেখতে হবে। দেখা গেল, এমন প্রতিষ্ঠানে ১০ বছর মেয়াদি ঋণ দেওয়া হলো যে, ১০ বছর পরে আর ওই পণ্যের চাহিদা থাকবে না। তিনি বলেন, আবাসন খাত থেকে ঋণের টাকা ফেরত আসতে অনেক সময় লাগে। এ খাতে ৩ বছর কিংবা ৫ বছরের জন্য ঋণ দেওয়া উচিত নয়। প্রথমেই চিন্তা করতে হবে- যাচাই করে ঋণ দিলে সহজে খারাপ হবে না।

গভর্নর ফজলে কবির বলেন, রূপালী ব্যাংকের সব শাখা অনলাইনের আওতায় আসা ভালো দিক। তবে সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকটির ২২ শতাংশের বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে, যা অনেক বেশি। এ ছাড়া মুনাফা আগের তুলনায় কমেছে। মূলধন ঘাটতি রয়েছে, যদিও লোকসানি শাখা কমেছে। করপোরেট সুশাসনের ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

ব্যাংকের এমডি আতাউর রহমান প্রধান বলেন, রূপালী ব্যাংকে সারা দেশে ১ কোটি ৩০ লাখ শিক্ষার্থীর মায়ের মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। এর মাধ্যমে উপবৃত্তির টাকা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এ উদ্যোগের ফলে ৩০ লাখ ভৌতিক উপবৃত্তি এবং বই ছাপানো বন্ধ হয়েছে। এতে বছরে সরকারের ৬শ' কোটি টাকার অপচয় রোধ হচ্ছে। তিনি বলেন, রূপালী ব্যাংকের মাত্র ৩৭২ কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধন রয়েছে। অথচ একটি নতুন ব্যাংক করতে ৪০০ কোটি টাকার মূলধন লাগে। এ ছাড়া ব্যাংকটির অনুমোদিত জনবল ১৪ হাজার হলেও বর্তমানে রয়েছে মাত্র ৪ হাজার ৯০০ জন।