মাদক ছাড়লেও পুলিশ ছাড়ছে না ওয়াসিমকে

প্রকাশ: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯      

নওগাঁ প্রতিনিধি

এক বছর আগেই মাদক ব্যবসা ছেড়ে সুস্থ জীবনে ফিরে আসেন সদর উপজেলার কির্ত্তীপুর ইউনিয়নের সালেবাজ (হিন্দুপাড়া) গ্রামের মনতাজের ছেলে ওয়াসিম। এ জন্য স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান-মেম্বারসহ স্থানীয়রা তাকে নানাভাবে সহায়তাও করেন। কিন্তু পুলিশের হয়রানি থেকে মুক্তি মিলছে না তার। বিভিন্ন সময় পুলিশ তার বাড়িতে হানা দিচ্ছে। মাদক মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয়ভীতি দেখাচ্ছে।

সর্বশেষ গত ২৭ জানুয়ারি সদর থানার এসআই ইব্রাহিম হোসেন ও এএসআই ফজুলল হক মাদক মামলায় জড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তার কাছ থেকে ৩৯ হাজার টাকা আদায় করেন। আরও পাঁচ হাজার টাকা বিকাশের মাধ্যমে দেওয়ার জন্য চাপও দিচ্ছেন এই দুই পুলিশ কর্মকর্তা। এখন অসহায় এই যুবকটির সুস্থ জীবনে ফিরে আসার জন্য পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন এলাকাবাসী।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সালেবাজ গ্রামটি মাদক এলাকা হিসেবে পরিচিত। এ গ্রামের অধিকাংশ নারী-পুরুষই মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। দরিদ্র ওয়াসিম এক সময় কৃষি, কখনও রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। একটি প্রভাবশালী মাদক ব্যবসায়ী চক্র তাকে দিয়ে মাদক আনা-নেওয়া করত। এভাবে একসময় ওয়াসিম নিজেই হেরোইনের ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। এলাকায় মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিতিও পেয়ে যান। পুলিশও বিভিন্ন সময় তাকে মাদকসহ আটক করে কারাগারে পাঠায়। জামিনে মুক্ত হয়ে আবারও শুরু করেন মাদক ব্যবসা। তার বিরুদ্ধে মাদকের শতাধিক মামলা ছিল। বিভিন্ন সময় কারাভোগ করেছেন প্রায় ৭-৮ মাস। বর্তমানে আটটি মামলা চলমান। পাঁচ বছর আগে সর্বনাশা এ পথে পা বাড়ালেও এক বছর হলো তিনি এ ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন। ২০১৭ সালের ১৪ ডিসেম্বর সদর থানায় মাদক ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে সুস্থ জীবনে ফিরে আসার জন্য অঙ্গীকারনামা দেন। এ সময় স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান-মেম্বারসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিরাও উপস্থিত ছিলেন।

কিন্তু মাদক ব্যবসা ছেড়ে ওয়াসিম সুস্থ জীবনে ফিরে এলেও পুলিশের হয়রানি থেকে রক্ষা পাচ্ছেন না। কারণে-অকারণে পুলিশ তার বাড়িতে গিয়ে হানা দিচ্ছে। মাদকের মামলা দিয়ে ফাঁসানোর ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। সর্বশেষ গত ২৭ জানুয়ারি দুপুরে বাড়ির পাশে আলুক্ষেতে কাজ করছিলেন ওয়াসিম। এ সময় এসআই ইব্রাহিম হোসেন ও এএসআই ফজুলল হক তাকে আটক করে পাহাড়পুর ব্রিজের ওপর নিয়ে গিয়ে ৫ লাখ টাকা দাবি করেন। টাকা না দিলে ৫০ পিস ইয়াবা ও ১০০ গ্রাম হেরোইন দিয়ে মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখান। এরপর পাহাড়পুর বাজারে এসে স্থানীয় ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি রতন হোসেনসহ কয়েকজনের উপস্থিতিতে ৩৯ হাজার টাকা দুই পুলিশ কর্মকর্তার হাতে দেওয়া হয়। এ ছাড়া এএসআই ফজুলল হক যাওয়ার সময় ওয়াসিমকে একটা বিকাশ অ্যাকাউন্ট নম্বর দিয়ে যান। ওই নম্বরে পাঁচ হাজার টাকা পাঠাতে বলেন। পরবর্তী সময়ে ওই পাঁচ হাজার টাকার জন্য বিভিন্ন সময় তাগাদা দেন এএসআই ফজুলল হক।

ভুক্তভোগী ওয়াসিম বলেন, ভুল করে মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছিলাম। পুলিশ আমাকে আটকের পর বিভিন্নভাবে নির্যাতন করত। এসব ভয়ে আমি সুস্থ জীবনে ফিরে আসি। চেয়ারম্যান, মেম্বার ও এলাকাবাসীর সহযোগিতায় থানায় অঙ্গীকারনামাও দিই। সে দিনের পর থেকে আর কখনও মাদক ব্যবসা করিনি। তারপরও পুলিশ আমার পিছু ছাড়ছে না।

সালেবাজ গ্রামের গৃহবধূ ইতি, বিলকিস ও নাসরিনসহ কয়েকজন বলেন, আগে ওয়াসিমের বাড়িতে বিভিন্ন লোকজন আসা-যাওয়া করত। থানায় লিখিত দেওয়ার পর থেকে তার বাড়িতে অপরিচিত লোকজনকে আর দেখা যায় না। সে এখন কৃষি কাজ করে সংসার চালায়। তারপরও পুলিশ বিভিন্ন সময় তার বাড়িতে এসে হানা দেয়; অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। তারা বলেন, আগে হয়তো ভুল করে মাদকের সঙ্গে ওয়াসিম জড়িয়ে পড়েছিল। এখন তাকে সুস্থ জীবনে ফিরে আসার সুযোগ তো দিতে হবে। পুলিশ যদি এভাবে ঝামেলা করে, তাহলে তো সম্ভব না।

স্থানীয় ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি রতন হোসেন বলেন, সে দিন ওই দুই পুলিশ কর্মকর্তা সিভিলে ছিলেন। তাদের হাতে জনসম্মুখে ৩৯ হাজার টাকা দিলে তারা টাকা নিয়ে চলে যান। যাওয়ার সময় পরে ওয়াসিমকে তারা দেখা করতে বলেন।

স্থানীয় ইউপি সদস্য বাবুল হক বাবু জানান, ওয়াসিম থানায় মুচলেকা দিয়ে এক বছর ধরে মাদক ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন। তবুও দুই পুলিশ কর্মকর্তা মাদক মামলার ভয় দেখিয়ে সম্প্রতি তার কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন।

অভিযোগ প্রসঙ্গে সদর থানার এসআই ইব্রাহিম হোসেন ও এএসআই ফজুলল হক বলেন, তাদের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ ভিত্তিহীন। ওয়াসিম একজন মাদক বিক্রেতা। আর মাদক বিক্রেতারা এ ধরনের গুজব ছড়াতেই পারেন।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) লিমন রায় বলেন, পুলিশের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ থাকলে তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।