জেসিসির বৈঠক শেষে যৌথ বিবৃতি

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্থায়ী করতে চায় ঢাকা-দিল্লি

প্রকাশ: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯      

কূটনৈতিক প্রতিবেদক

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্থায়ী করতে চায় ঢাকা-দিল্লি

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন শুক্রবার নয়াদিল্লিতে জওহরলাল নেহেরু ভবনে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এএফপি

ভবিষ্যতের দিকে নজর রেখে অংশীদারিত্বের সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করতে চায় বাংলাদেশ ও ভারত। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে স্থায়ী রূপ দিতে দূরদর্শী রোডম্যাপ তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুই দেশ। এদিকে, তিস্তা চুক্তি দ্রুত সম্পন্ন করার আশ্বাস দিয়েছে ভারত।

গতকাল শুক্রবার দিল্লিতে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ পরামর্শক কমিশনের (জেসিসি) বৈঠকে দু'দেশের সম্পর্ক সুদৃঢ় করার সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন। ভারতের পক্ষে নেতৃত্ব দেন সে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ। বৈঠক শেষে দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ ও ভারত দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার পরিধি বিস্তৃত করছে। নিরাপত্তা ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে বিনিয়োগ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, যৌথ নদীর পানি বণ্টন, উন্নয়ন অংশীদারিত্ব, পরিবহন ও যোগাযোগ, সংস্কৃতিসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে দুই দেশ অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। এসবের বাইরে মহাকাশ, পারমাণবিক জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি এবং ইলেকট্রনিক্সের মতো উচ্চপ্রযুক্তি ক্ষেত্রগুলোতেও দুই দেশ একসঙ্গে এগিয়ে যাবে।

বিবৃতিতে বলা হয়, বৈঠকে বাংলাদেশ ও ভারতের পারস্পরিক স্বার্থ-সংশ্নিষ্ট দ্বিপক্ষীয় ইস্যুগুলো নিয়ে আলোচনা হয়। দু'দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার অংশীদারিত্বকে অপরিবর্তনীয় করার লক্ষ্যে একটি দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রোডম্যাপ প্রণয়নের জন্য উপস্থিত কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেন। তারা বলেন, সম্পর্ককে এমন উচ্চতায় স্থাপন করতে হবে, যা বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উৎসবের সঙ্গে মানানসই হয়।

এ ছাড়া মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ায় বাংলাদেশের প্রশংসা করেন সুষমা স্বরাজ। রোহিঙ্গারা যাতে দ্রুত, নিরাপদে মিয়ানমারে ফিরে যেতে পারে, সে জন্য ভারত সরকারের অব্যাহত সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।

বৈঠকে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে চারটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। এর পাশাপাশি ড. মোমেন ও সুষমা স্বরাজের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়েছে। কূটনৈতিক সূত্র জানায়, দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের বিষয়ে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলোচনা করেছেন।

দিল্লির বাংলাদেশ হাইকমিশনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, জওহরলাল নেহেরু ভবনে অনুষ্ঠিত জেসিসি বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি দ্রুত করার অনুরোধ জানান। পাশাপাশি তিনি অভিন্ন সব নদীর পানি বণ্টন-সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানের বিষয় আলোচনায় তোলেন। জবাবে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি দ্রুত করার আশ্বাস দেন।

এছাড়া বৈঠকে দু'দেশের মধ্যে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, উন্নয়ন অংশীদারিত্ব, সাংস্কৃতিক সফর বিনিময়, মানুষে মানুষে যোগাযোগ ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা হয়। এর বাইরে ২০২১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর যৌথভাবে উদযাপনের বিষয়েও আলোচনা হয়। এ ব্যাপারে কূটনৈতিক সূত্র জানায়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যায়ে আরও কয়েক দফা আলোচনার মধ্য দিয়ে উদযাপনের রূপরেখা চূড়ান্ত করা হবে।

সভায় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সই হওয়া চারটি সমঝোতা স্মারকের প্রথমটি হচ্ছে- বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার (সিবিআই) মধ্যে সহযোগিতা সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক। এ সমঝোতার মাধ্যমে সিবিআইর পক্ষ থেকে দুর্নীতি ও অপরাধবিষয়ক তদন্তে দুদক কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এর পাশাপাশি সমঝোতার আলোকে অপরাধ তদন্তে যৌথ সহযোগিতাও নিশ্চিত করা হবে। দ্বিতীয় সমঝোতা স্মারকটি হচ্ছে- মোংলায় ভারতের জন্য বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন। এ সমঝোতার মাধ্যমে অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরিতে ভারতের হিরোনদানি গ্রুপ বিনিয়োগ করবে।

তৃতীয় সমঝোতা স্মারকটি হচ্ছে- বাংলাদেশের এক হাজার ৮০০ সরকারি কর্মকর্তার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। ভারতের পক্ষ থেকে কর্মকর্তাদের উন্নততর প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। চতুর্থ সমঝোতা স্মারকটি ভারতের বিকল্প চিকিৎসা ব্যবস্থাবিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়ুশ এবং বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সই হয়। এর আওতায় দু'দেশে বিকল্প চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং ওষুধ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনে যৌথ সহযোগিতা নিশ্চিত করা হবে।

দিল্লির কূটনৈতিক সূত্র জানায়, ড. মোমেন ও সুষমা স্বরাজের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল রোহিঙ্গা সংকট। ড. মোমেন রোহিঙ্গা সংকটের বর্তমান চিত্র তুলে ধরেন এবং এ সংকটের দ্রুত সমাধানে ভারতের অধিকতর সহায়তা চান। রোহিঙ্গা সংকট শুরুর পর থেকে ভারতের অব্যাহত সহযোগিতার জন্যও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন ড. মোমেন। জবাবে সুষমা স্বরাজ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি ড. মোমেনকে জানান, ভারত যত দ্রুত সম্ভব এ সংকটের স্থায়ী সমাধান প্রত্যাশা করে। এ সংকট দীর্ঘায়িত হলে কী ধরনের নেতিবাচক পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে, সে বিষয়েও ভারত সচেতন রয়েছে। ভারত চায় রোহিঙ্গারা নিরাপদে মিয়ানমারে প্রত্যাবর্তন করুক। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের মাধ্যমে সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য বাংলাদেশকে ভারত অব্যাহত সমর্থন দিয়ে যাবে বলেও জানান সুষমা স্বরাজ। দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে দু'দেশের যৌথ সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত করা এবং মানুষে মানুষে যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয় নিয়ে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলোচনা করেন। এর পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দু'দেশের যৌথ স্বার্থ-সংশ্নিষ্ট বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়। আলোচনায় আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিগত বিনিময় প্রসঙ্গও আসে।

শুক্রবার ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির বাসভবনে গিয়ে তার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ড. এ কে আব্দুল মোমেনের এটিই প্রথম ভারত সফর। গত বুধবার তিনি দিল্লি যান। আজ শনিবার তার ঢাকায় ফেরার কথা রয়েছে।