চ্যাম্পিয়ন কুমিল্লা নায়ক তামিম

বল ৬১ রান ১৪১

প্রকাশ: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯      

সিয়াম আনোয়ার

চ্যাম্পিয়ন কুমিল্লা নায়ক তামিম

শুক্রবার মিরপুরে ঢাকার বিপক্ষে তামিমের সেঞ্চুরি উদযাপন - বিসিবি

সকালের সূর্য দেখেই নাকি সারাদিন কেমন যাবে আঁচ করা যায়। ভুল, অন্তত বিপিএল ফাইনাল বলে গেল তেমনটাই। ভুল বলেই টুর্নামেন্টজুড়ে সবচেয়ে বেশি তিনবার শূন্য রানে আউট হওয়া তামিম ইকবাল প্রথমবার ফাইনালে নেমেই সেঞ্চুরি করে ফেলেন; প্রথম বলে আউট হতে হতে বেঁচে যাওয়ার পর ৬১ বলে ১০ চার ও ১১ ছক্কায় খেলেন ১৪১ রানের টর্নেডো ইনিংস। প্রবাদের ভাষ্য ভুল প্রমাণ হবে বলেই হয়তো ৫ ওভারে ২৫ রান তোলা কুমিল্লা ২০ ওভারে জমা করে ফেলে  ১৯৯। আবার রানের আগে উইকেট হারিয়ে ফেলা ঢাকা ১১ ওভারে ২ উইকেটে ১২০ রান তুলেও পথ হারায় আচমকা, আটকে যায় ১৮২ রানে। সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য সম্ভবত এটিই যে, টুর্নামেন্টের সর্বনিম্ন ৬৩ রানে অলআউট হওয়া দলটিই এখন শেষবেলায় এসে চ্যাম্পিয়ন! তামিমঝড়ের ফাইনালে ঢাকাকে ১৭ রানে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিপিএল শিরোপা জিতে নিয়েছে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স। আগের ফাইনালে রংপুরের কাছে হারার পর সাকিবের ঢাকার এটি টানা দ্বিতীয় ফাইনাল-হার। তবে দলগত সাফল্য ঝুলিতে না পুরলেও ব্যক্তিগতভাবে সেরার খেতাব পেয়েছেন সাকিবই। ব্যাটে-বলে অলরাউন্ড নৈপুণ্য দেখিয়ে টুর্নামেন্টসেরার পুরস্কার উঠেছে ঢাকার ক্যাপ্টেনের হাতে।

মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের হাইভোল্টেজ এ ফাইনালে ঢাকার সম্ভাবনা ছিল ততক্ষণ, যতক্ষণ রনি তালুকদার আর উপুল থারাঙ্গারা খেলছিলেন। ইনিংসের দ্বিতীয় বলে সাইফুদ্দিনের ক্ষিপ্রগতির এক থ্রোতে বল না খেলেই আউট হন সুনিল নারিন। তারপরই রনি ও থারাঙ্গার ওই দারুণ জুটি। মাত্র ৫২ বলে তারা জোগাড় করে ফেলেন ১০২ রান, জয়ের লক্ষ্য নেমে আসে দশ থেকে আটের ঘরে। কিন্তু সহজ হয়ে যাওয়া ওই লক্ষ্যই কঠিন হয়ে ওঠে জুটির ভাঙনে আর তামিমের দারুণ দুটি ক্যাচে। প্রথমে থিসারা পেরেরাকে ওড়াতে গিয়ে আউট হন ২৭ বলে ৪৮ রান করা থারাঙ্গা। এরপর একে একে একই পথের যাত্রী সাকিব, রনি, রাসেল, পোলার্ডরা। এর মধ্যে ওয়াহাব রিয়াজের বলে সাকিব ও পোলার্ডের চমৎকার দুটি ক্যাচ ধরেন তামিম। অধিনায়ক ইমরুলকে ছাপিয়ে ব্যাটিংয়ে যেমন ছিলেন সর্বেসর্বা, তেমনি ফিল্ডিংয়ের পর নেতৃত্বেও দৃশ্যমান তৎপর হতে দেখা যায় জাতীয় দলের এ ওপেনারকে। আর তাতেই অলআউট না হলেও ২০ ওভার ব্যাট করে ঢাকা থমকে যায় ৯ উইকেটে ১৮২ রানে। দল-সর্বোচ্চ হয়ে থাকে রনি তালুকদারের খেলা ৩৮ বলে ৬৬ রানের ইনিংসটি। তবে তামিমময় দিনে এমন ইনিংসে আর কী হয়, সাগরের বদলে বড়জোর নদী!

কখনও বিপিএল ফাইনাল না খেলা তামিম কিন্তু আউট হয়ে যেতে পারতেন প্রথম বলেই। আন্দ্রে রাসেলের অফস্টাম্পের বাইরের বল ডাইভ করতে গিয়ে অল্পের জন্য ব্যাটের স্পর্শ থেকে বাঁচে। প্রথম বলে পরাস্ত হওয়ার ছাপ পড়ে পরের বলগুলোতেও। প্রথম ১০ বল খেলে দেশসেরা এ ওপেনার নিতে পারেন মাত্র ৪ রান। ইনিংসের পঞ্চম ওভারে প্রথম বড় শট খেলেন নারিনকে, ওয়াইড-লং অন দিয়ে হাঁকান ছক্কা। পরের ওভারে সাকিবকে টানা দুই বলে মারেন চার। ব্যক্তিগত রান ততক্ষণে ২০ পেরিয়ে গেলেও ঠিক ছন্দ ছিল না ব্যাটে। একবার কাজী অনিকের বল তার গ্লাভস ছুঁয়ে চলে যায় ঝাঁপিয়ে পড়া উইকেটকিপারের আঙুল ঘেঁষে। আরেকবার রুবেলের বলকে ওড়াতে গিয়ে ক্যাচমতো উঠিয়ে ফেলেন লং অনে। রাসেল এসে বল হাতে জমান মাটিতে স্পর্শ করার মিলি সেকেন্ডের মধ্যে। ৫ চার ২ ছক্কায় ৩১ বলে ফিফটি করেও তাই তামিম ছিলেন কিছুটা ছন্নছাড়া। কিন্তু আসল তামিমের দেখা তখনও পুরোটাই বাকি। ফিফটির পরের ওভারে সাকিবকে ছয় দিয়ে শুরু ইনিংসের নবযাত্রা। রুবেলের করা ইনিংসের ১৫তম ওভারে দুই চার দুই ছয় সমেত ২৩ রান এক ঝটকায় পৌঁছে যান নব্বইয়ের ঘরে। ১৬তম ওভারে এক বলের বেশি সুযোগ পাননি। ১৭তম ওভারের প্রথম বলেই রাসেলকে ছক্কা মেরে ৯৮-এ, এক বল বাদে স্কয়ার লেগ দিয়ে চারে সেঞ্চুরি! ষষ্ঠ বিপিএলের এটি পঞ্চম শতক হলেও দেশি ক্রিকেটারদের প্রথম। প্রথম দুই ওভারে মাত্র ৫ রান দেওয়া রাসেলের ওই ওভার থেকে পরের তিন বলে নেন আরও ১২ রান, সবমিলিয়ে এক ওভারেই ২২। স্কোরবোর্ডে কুমিল্লার রান ততক্ষণে ১৬১, তামিমের একারই ১১৫। ১৮তম ওভারে সাকিবের দুই বল থেকে চার ও ছক্কায় ১০, উনিশতম ওভারে রুবেলের ৩ বল থেকে ৮ আর ২০তম ওভারে রাসেল থেকেও ৩ বলে ৮ রান নিয়ে পৌঁছে যান ৬১ বলে ১৪১ রানের চূড়ায়। ইমরুলের সঙ্গে জুটিতেও হয়ে যায় ঠিক ১০০ রান। তবে জুটি দু'জনের হলেও খেলেছেন একা তামিমই। চতুর্থ উইকেটের অবিচ্ছিন্ন জুটিতে ৪৬ বলে ১০০ রানের মধ্যে ২৫ বলে ৮০ রানই তার। বাকি ২১ বলে ইমরুলের রান ১৭! এমন নয় যে ইমরুল তামিমকে স্ট্রাইক দেওয়ায় মনোযোগী ছিলেন; কুমিল্লা অধিনায়ক বড় শট খেলার চেষ্টা চালিয়েছেন তার প্রতিটি বলেই; কিন্তু পারেননি। আর এখানেই আরও ভাস্বর হয়ে উঠছে তামিমের কীর্তির ব্যাপ্তি। তার ১০ চার আর ১১ ছক্কার ঝড়ে ঢাকার সব বোলারকেই খরচ করতে হয়েছে বড় রান। কিছুটা রান আটকাতে পেরেছেন কেবল সুনিল নারিন। তবে ২৪ বলে যে ১৮ রান তিনি খরচ করেছেন, তার মধ্যে ৯ বলে ১২ রানই তামিমের। আসলে ক'টা রান কেন, পুরো ফাইনালটাই তার। আর তামিমের ফাইনাল মানে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের। তামিমই যে দলের 'আইকন'!