জোড়াতালির চিকিৎসা সেবা কালীগঞ্জ ও অভয়নগরে

প্রকাশ: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯      

জামির হোসেন, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) ও ফারুক হোসেন, নওয়াপাড়া (যশোর)

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পদায়নকৃত চিকিৎসক ডা. সানজিদা ইয়াসমিন সম্পা। চার বছর আগে যোগদানের পরদিন থেকেই তিনি নিরুদ্দেশ। কর্মস্থলের কেউ তার সম্পর্কে কিছু জানেন না। এ ছাড়া ৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে ২১ জন চিকিৎসকের পদ থাকলেও কাগজ-কলমে কর্মরত মাত্র সাতজন ডাক্তার, যার মধ্যে ডা. সম্পাও একজন। আর যারা আছেন, তারা আসেন না সময়মতো। এদিকে, যশোরের অভয়নগর হাসপাতালে কর্মরত বেশ কয়েকজন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে সময়মতো কর্মস্থলে না আসার অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে ডা. স্বাগত দাস প্রায় দিনই দেরিতে আসেন। এ ছাড়া গাইনি বিশেষজ্ঞ নার্গিস আক্তার ও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ মারুফুজ্জামানও সময়মতো আসেন না। এরই মধ্যে জোড়াতালি দিয়ে চিকিৎসা সেবা চালিয়ে নিচ্ছেন অন্য চিকিৎসকরা। গত ২৮ ও ২৯ জানুয়ারি এবং ১১  ফেব্রুয়ারি সরেজমিন এ চিত্র দেখা যায়।

কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) :পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি, টেকনিশিয়ান ও চিকিৎসকের অভাবে কালীগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অস্ত্রোপচার করা হয় সপ্তাহে মাত্র একদিন। আর নানা অনিয়মে মুখ থুবড়ে পড়েছে চিকিৎসা কার্যক্রম। সংশ্নিষ্ট অনেকের অভিযোগ, এসব অনিয়মের পেছনে শক্ত খুঁটি হয়ে রয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের একটি অসৎ চক্র। এই চক্রের সহযোগিতায় পছন্দমতো হাসপাতালে ডেপুটেশনে চলে যান অনেকে। নিয়োগপত্রে তাদের কর্মস্থল কালীগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হলেও বাস্তবে তারা রয়েছেন বিভিন্ন জেলা শহরে। এমনকি ডেপুটেশনে যেখানে যাচ্ছেন, সেখানেও তারা শুভংকরের ফাঁকি দিয়ে প্রাইভেট প্র্যাকটিসে ব্যস্ত থাকছেন। আর যারা আছেন, তারা আসেন না সময়মতো।

এসব অনিয়মে স্বাস্থ্যসেবার বেহাল চিত্র দেখে উপজেলা স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন কমিটির আট মাস আগের কয়েকটি সভাতেই সদস্যরা সংশ্নিষ্টদের তিরস্কার করেন। ওই সময় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াসহ ডেপুটেশন বাতিলের সুপারিশ করা হয়। তবে তাতেও কাজ হয়নি। এমনকি সর্বশেষ স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকেও রেজুলেশন করে ডেপুটেশন বাতিলের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে একাধিক চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে আইনি মারপ্যাঁচে এখনও তা বাস্তবায়ন হয়নি। এ কারণে চারজন চিকিৎসক ও তিনজন নার্সের প্রেষণজনিত অনুপস্থিতির কারণে উপজেলার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। গত ৮ মাস ধরে উপজেলা স্বাস্থ্যসেবা কমিটির কোনো বৈঠকও হয় না।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কালীগঞ্জের বলরামপুর উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ডা. সানজিদা ইয়াসমিন সম্পা চার বছর নিরুদ্দেশ হলেও তার চাকরি বহাল থাকায় এ পদে নতুন কাউকে পদায়ন করা হচ্ছে না। আর কাষ্টভাঙ্গা ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ডা. আতিকুর রহমান গত দুই বছর আগে যোগদানের কিছুদিন পরই চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। সেখানেও নতুন করে কাউকে পদায়ন করা হয়নি।

উপজেলার ১১টি ইউনিয়নে ১১ জন স্বাস্থ্য সহকারীর (সেকমো) মধ্যে প্রেষণে অন্য জেলা শহরে রয়েছেন চারজন। তাদের মধ্যে জামাল ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ডা. ইয়াসমিন আরা রয়েছেন কুষ্টিয়ার মিরপুরে, কোলা ইউনিয়নের ডা. জয়নাল আবেদিন রয়েছেন কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ও সুন্দরপুর দুর্গাপুর ইউনিয়নের ডা. তাসলিমা খাতুন রয়েছেন কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে। তাদের সঙ্গে ফোনে কথা বলে জানা গেছে, প্রত্যেকেই পারিবারিক সমস্যা দেখিয়ে ডেপুটেশন নিয়েছেন। এসব অনিয়ম তুলে ধরে চার মাস আগে সমকালে খবর প্রকাশিত হয়। এর পর দুদকের প্রধান কার্যালয়ের একটি টিম কালীগঞ্জ হাসপাতালে অভিযান চালায়। সরেজমিন দুদক টিম অনিয়মের প্রমাণ পায়। এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা থাকলেও অদৃশ্য কারণে তা আটকে আছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হুসায়েন শাফায়াত জানান, তিনি যোগদান করার আগেই বিভিন্ন কারণে কয়েকজন ডাক্তার ও নার্স ডেপুটেশন নিয়ে চলে গেছেন। ডেপুটেশন বাতিলের জন্য একটি প্রস্তাব জেলা সিভিল সার্জন ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠালেও সে বিষয়ে নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে ঝিনাইদহের সিভিল সার্জন ডা. রাশেদা খাতুন বলেন, অনেক ইউনিয়নে ডাক্তারদের বসার জায়গার সংকট রয়েছে। তবে ঢাকার ডিজি অফিস থেকে ডেপুটেশন আদেশ নিয়ে আসার পর চিকিৎসকদের আটকে রাখার কোনো এখতিয়ার তার নেই।

অভয়নগর (যশোর) :যশোরের অভয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকের ২৯টি পদ থাকলেও বর্তমানে কর্মরত ১২ জন। এর মধ্যে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যশোর জেনারেল হাসপাতালে ডেপুটেশনে রয়েছেন এবং দু'জন ছুটিতে। অভিযোগ রয়েছে, অধিকাংশ চিকিৎসক সময়মতো হাসপাতালে আসেন না।

গতকাল সোমবার সকাল ৮টায় অভয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সরেজমিন দেখা যায়, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচ অ্যান্ড এফপিও) ডা. মাহামুদুর রহমান রিজভী হাসপাতালে থাকলেও অধিকাংশ চিকিৎসক উপস্থিত হননি। সকাল ৯টার পর তিনজন বাদে অন্যরা উপস্থিত হন। অনুপস্থিত তিনজন হলেন- ডা. স্বাগত দাস, গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. নার্গিস আক্তার ও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মারুফুজ্জামান। এদিন ১০টার পর হাসপাতালে আসেন ডা. স্বাগত দাস। এ হাসপাতালে যোগদানের পর গত তিন বছর ধরে তিনি সময়মতো হাসপাতালে আসেন না। অন্য দু'জন ডাক্তার ছুটিতে। এর মধ্যে গাইনি বিশেষজ্ঞ সপ্তাহে চার দিন আসেন।

গতকাল দুপুর ১২টার সময় দেখা যায়, নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ ডা. কুতুবুল আলমের কক্ষের সামনে রোগীরা বসে আছেন। চিকিৎসক তার কক্ষে নেই। সেখানে এক রোগী তাহমিনা বেগম (৩০) জানান, অনেকক্ষণ বসে আছি। ডাক্তার নেই। জানি না কখন আসবেন! পরে জানা যায়, আধা ঘণ্টা পর ডাক্তার তার কক্ষে আসেন।

কয়েকজন রোগী অভিযোগ করেছেন, হাসপাতালে এলে ডাক্তাররা নানা রকম টেস্ট দিয়ে তাদের পছন্দমতো ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠিয়ে দেন। এ অভিযোগ বিষয়ে ইউএইচ অ্যান্ড এফপিও ডা. রিজভী বলেন, মাঝেমধ্যে কেউ কেউ একটু দেরিতে এলেও সবাই উপস্থিত থাকেন। আজ (গতকাল) দু'জন ডাক্তার ছুটিতে আছেন। তবে হাসপাতালের সার্বিক চিত্র বদলেছে। পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি রোগীদের জন্য বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থাও করা হয়েছে।