আলোচনার কেন্দ্রে সাতক্ষীরার 'দাপুটে' সেই চিকিৎসক

প্রকাশ: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯      

এম কামরুজ্জামান, সাতক্ষীরা

আলোচনার কেন্দ্রে সাতক্ষীরার 'দাপুটে' সেই চিকিৎসক

ফাইল ছবি

সাতক্ষীরার সেই দাপুটে চিকিৎসক ডা. রাজীব কাওসার গতকাল সোমবার দিনভর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। সমকালে প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পরপরই স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে তার প্রভাবশালী বাবা তাকে বাঁচাতে দফায় দফায় সাতক্ষীরা জেলা বিএমএ ও স্বাচিপ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। একই সঙ্গে ছেলের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিতে অনুরোধ করেছেন সাতক্ষীরার সিভিল সার্জনকে।

ডা. রাজীবের বিরুদ্ধে অভিযোগ, সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পদায়ন করা হলেও তিনি কয়েক দিনের মধ্যে প্রেষণে জেলা সদর হাসপাতালে চলে যান। তবে সেখানেও সপ্তাহে দু'দিনের বেশি কাজ করেন না। তার বিরুদ্ধে রয়েছে আরও অভিযোগ। স্বাক্ষর করেন না হাজিরা খাতায়। ব্যস্ত থাকেন প্রাইভেট ক্লিনিকে। হাসপাতালের কেউ তার বিরুদ্ধে কথা বললে তাকে শাস্তিমূলক বদলির হুমকি দেওয়া হয়। এমনকি সিভিল  সার্জন পর্যন্ত তাকে নিয়ে তটস্থ থাকেন।

প্রভাবশালী বাবা ও শ্বশুরের ক্ষমতার দাপটে ধরাকে সরা জ্ঞান করতে পেছনে তাকান না ডা. রাজীব। তার বাবা ডা. এস এম মোখলেছুর রহমান আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি ও স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) সাতক্ষীরা জেলা শাখার সভাপতি। আর শ্বশুর এস এম শওকত হোসেন সাতক্ষীরা সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। তাদের ক্ষমতাকে দাপট দেখানোর সুযোগ হিসেবে নিয়েছেন ডা. রাজীব। কাগজে-কলমে যার বাস্তবতা রয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ডা. রাজীব তার বাবার মালিকানাধীন সাতক্ষীরা জেলা শহরের নাজমুল ক্লিনিকে প্রাইভেট প্র্যাকটিস নিয়ে ব্যস্ত থাকেন।

ডা. রাজীবের বিরুদ্ধে মাদক সেবন ও অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে। তবে তার ব্যাপারে কথা বলার সাহস নেই স্থানীয় কর্তৃপক্ষের। সিভিল সার্জনসহ স্থানীয় স্বাস্থ্য প্রশাসন তার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করে। ডা. রাজীব তার অনুপস্থিতির কথা অপকটে স্বীকার করেন।

সাবেক স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী ডা. আ ফ ম রুহুল হকের নির্বাচনী এলাকা দেবহাটা, আশাশুনি ও কালীগঞ্জ উপজেলা হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার মান বেশ নাজুক। দেবহাটা উপজেলা ৫০ শয্যাবিশিষ্ট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকের পদ রয়েছে ১৬টি। এর মধ্যে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তাসহ পদায়নকৃত চিকিৎসক মাত্র চারজন। তাদের মধ্যে দু'জন ডেপুটেশনে আছেন। এখন দু'জন দিয়েই চলছে হাসপাতালটি। ডা. রাজীব ও হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক পার্থ কুমার দে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে দুই বছরের বেশি সময় ধরে ডেপুটেশনে আছেন।

কালীগঞ্জ উপজেলা হাসপাতালে চিকিৎসকের পদ রয়েছে ২১টি। পদায়নকৃত চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র চারজন। ডা. অসীম কুমার সরকার ডেপুটেশনে সদর হাসপাতালে আছেন। মাত্র তিনজন দিয়েই চলছে চিকিৎসাসেবা।

আশাশুনি উপজেলা হাসপাতালে চিকিৎসকের পদ রয়েছে ২১টি। পদায়নকৃক চিকিৎসক রয়েছেন সাতজন। এর মধ্যে ডা. ইসকেন্দার আলম ডেপুটেশনে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ও ডা. সাউদ বিন খায়রুল আলম ঢাকায় দুই মাসের প্রশিক্ষণে রয়েছেন। ফলে পাঁচজন চিকিৎসকই চালাচ্ছেন হাসপাতাল।

শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩৩ জন চিকিৎসকের পদ রয়েছে। বর্তমানে পদায়নকৃত চিকিসক পাঁচজন। গত ২৮ জানুয়ারি সরেজমিন গিয়ে তাদের সবাইকে কর্মস্থলে পাওয়া যায়।

তালা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকের পদ রয়েছে ৩৩টি। পদায়নকৃত চিকিৎসক রয়েছেন সাতজন। এর মধ্যে ডা. জাহিদ ফেরদৌস দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার কুর্মিটোলা হাসপাতালে ডেপুটেশনে রয়েছেন। ডা. আবু মাহমুদ তালহাদ ডেপুটেশনে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কর্মরত। গত ২৯ জানুয়ারি মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা যায়, পাঁচজন চিকিৎসকই কর্মস্থলে উপস্থিত আছেন।

কলারোয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক পদ রয়েছে ৩৩টি। পদায়নকৃত চিকিৎসক রয়েছেন চারজন। এর মধ্যে ডা. শফিকুল ইসলাম ঢাকায় দুই মাসের ফাউন্ডেশন ট্রেনিংয়ে আছেন। এখন তিনজন চিকিৎসক দিয়ে হাসপাতালটি চলছে।

১০০ শয্যার সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার চিত্র আরও ভয়াবহ। এখানে চিকিৎসকের পদ রয়েছে ২৭টি। পদায়নকৃত চিকিৎসক রয়েছেন অর্ধেকের কম- ১৩ জন। এর মধ্যে প্রায় দুই বছর ধরে ডা. ফয়সাল আহমেদ ডেপুটেশনে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্মরত। ১০০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ইনডোরে ৩০০ রোগী ভর্তি থাকে। আর আউটডোরে প্রতিদিন রোগীর সংখ্যা ৫০০ থেকে ৬০০ জন। মাত্র ১২ জন চিকিৎসক দিয়ে এসব রোগীর চিকিৎসাসেবা চলছে।

সাতক্ষীরা সিভিল সার্জন ডা. রফিকুল ইসলাম বলেন, জেলার সাতটি উপজেলায় চিকিৎসকের পদ রয়েছে মোট ২০৭টি। এর মধ্যে মাত্র ৫৫টি পদে চিকিৎসক আছেন। দীর্ঘদিন ধরে ১৫২টি পদে চিকিৎসক নেই। তিনি বলেন, বর্তমানে ৭৪ দশমিক ৫ শতাংশ চিকিৎসক পদই শূন্য রয়েছে। এ ছাড়া কর্মরত ৫৫ জনের মধ্যে তিনজন সাতক্ষীরার বাইরে ডেপুটেশন অথবা প্রশিক্ষণে আছেন। আগামী মার্চ মাসে আরও তিনজন চিকিৎসক প্রশিক্ষণে যাবেন বলে ছুটির আবেদন করেছেন।

সিভিল সার্জন বলেন, বর্তমান স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী ডেকে সাফ বলে দিয়েছেন, চিকিৎসা খাতে দুর্নীতি ও অনিয়ম সহ্য করা হবে না। ঢাকা থেকে ফিরে চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে সেই বার্তা পৌঁছে দিয়েছে।