জাহালম ঘটনা

খলনায়ক সালেক দেশেই

প্রকাশ: ১৫ মার্চ ২০১৯      

হকিকত জাহান হকি

খলনায়ক সালেক দেশেই

আবু সালেক

বিনা অপরাধে নিরীহ জাহালমকে জেল খাটানোর ঘটনার মূল হোতা আবু সালেকের অবস্থান শনাক্ত করা গেছে। দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর কলকাতা থেকে দেশে আসেন এই প্রতারক। ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর সূত্রে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।

সূত্র জানায়, ইমিগ্রেশনের তথ্য অনুযায়ী সালেক এখন পর্যন্ত দেশেই আছেন। নিরপরাধ জাহালমকে তিন বছর জেল খাটানোর ঘটনায় নেপথ্যের এই খলনায়ককে গ্রেফতারে সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

জালিয়াতি করে সোনালী ব্যাংকের মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট শাখা থেকে ১৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে সালেকের বিরুদ্ধে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এ-সংক্রান্ত ৩৩টি মামলার চার্জশিট আদালতে পেশ করেছে। সংশ্নিষ্ট ব্যাংকার, গ্রাহক ও জাহালমের গ্রামের বাড়ির এলাকার দু'জন ইউপি চেয়ারম্যানের সাক্ষ্য অনুযায়ী ২৬টি মামলায় সালেকের পরিবর্তে জাহালমকে আসামি করে আদালতে চার্জশিট দিয়েছিল কমিশন। ওই ২৬ মামলায় তিন বছর বিনা অপরাধে কারাভোগ করেছেন তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সালেকের বিদেশ যাওয়াতে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে ওই ২৬ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সহকারী পরিচালক জাহিদ কালাম স্বাক্ষরিত একটি চিঠি গত বুধবার ঢাকার মালিবাগে বিশেষ পুলিশ সুপারের (ইমিগ্রেশন) কাছে পাঠানো হয়েছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে বুধবারই পুলিশের ইমিগ্রেশন শাখা থেকে সালেকের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা জারি করে বিমান ও স্থলবন্দরগুলোতে বার্তা পাঠানো হয়।

সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, সালেক দীর্ঘদিন পলাতক ছিলেন। হঠাৎই দেশে এসেছেন। এই চাঞ্চল্যকর খবরটি সংগ্রহ করেছেন জাহালমের জেল খাটার ঘটনায় দুদকের তদন্ত কমিটির প্রধান ও পরিচালক (লিগ্যাল) আবুল হাসনাত মো. আবদুল ওয়াদুদ। সালেককে গ্রেফতারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের মামলার তদন্ত কর্মকর্তার প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন।

দুদক সূত্র জানায়, সালেককে গ্রেফতারে জন্য র‌্যাব, ডিবি, সিআইডিসহ অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তা চাওয়া হয়েছে। সালেক ও তার আত্মীয়স্বজনের মোবাইল ফোন নম্বর ট্র্যাক করা হচ্ছে। দুদকের গোয়েন্দা ইউনিটও সালেকের অবস্থান জানার চেষ্টা করছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ওই ব্যাংকের অর্থ আত্মসাৎ ও জাল-জালিয়াতি করে জাহালমকে ফাঁসানোর ঘটনায় নীলনকশা প্রস্তুতকারক সালেককে গ্রেফতারের সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, সোনালী ব্যাংকের ১৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ নির্বিঘ্ন করতে ব্যাংককে জাহালমের টাঙ্গাইলের ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছিল। জাহালমের ছবি ব্যবহার করে সালেক নিজের জাল জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করেছিলেন। সালেকের সঙ্গে জাহালমের চেহারার কিছুটা মিল রয়েছে। ব্যাংকের হিসাবগুলোর নথিপত্রে নিজের ছবিই ব্যবহার করেছিলেন সালেক। তদন্ত করে প্রকৃত সত্য বের করার জন্য দুদকের কাছে সালেকের ছবিটিই ছিল একমাত্র প্রমাণ। সালেকের এই ছবি দুদকের তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছেও ছিল। এ ক্ষেত্রে সংকটের নতুন মোড় সৃষ্টি করেন সংশ্নিষ্ট চার ব্যাংকার ও দুই গ্রহক। যারা সালেকের হিসাব খোলার সময় পরিচয়দানকারী, শনাক্তকারী ও অনুমোদনকারী ছিলেন। তারা সালেকের ওইসব হিসাবের নথি দুদকের প্রধান কার্যালয়ে এনে আটক জাহালমকেই সালেক বলে দুদকের তদন্ত কর্মকর্তাদের জানান।

এরপর ২৬ মামলায় সালেকের পরিবর্তে জাহালমের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। জাহালমকে পাঠানো হয় জেলে। টানা তিন বছর জেল খাটতে হয় দরিদ্র পাটকল শ্রমিক জাহালমকে।

সূত্র জানায়, দুদকের উপপরিচালক (বর্তমানে পরিচালক) আবদুল্লা-আল-জাহিদ বাদী হয়ে সোনালী ব্যাংকের মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট শাখা থেকে ১৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে প্রতারক আবু সালেককে আসামি করে ৩৩টি মামলা করেছিলেন ২০১২ সালে। এর মধ্যে দুদকের তিনজন তদন্ত কর্মকর্তা আসামি হিসেবে সালেকের নাম বহাল রেখে সাতটি মামলার চার্জশিট আদালতে পেশ করেছিলেন। তারা চার্জশিটে বলেছিলেন, ব্যাংকে দেওয়া সালেকের ঠিকানা অস্তিত্বহীন। তাই সালেককে ভবিষ্যতে খুঁজে পাওয়া গেলে আদালতে সম্পূরক চার্জশিট পেশ করা হবে।

অন্যদিকে, ৯ জন তদন্ত কর্মকর্তা সংশ্নিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তা, গ্রাহক ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ২৬টি চার্জশিটেই আবু সালেকের নাম বাদ দিয়ে জাহালমকে অন্তর্ভুক্ত করে চার্জশিটগুলো আদালতে পেশ করেছিলেন।

বিনা অপরাধে জাহালমের কারাভোগের ঘটনায় এরই মধ্যে হাইকোর্ট জাহালমকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া ও ভুল তদন্তের সঙ্গে জড়িত তদন্ত কর্মকর্তাদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে দুদকের প্রতি রুল জারি করেছেন। হাইকোর্টের এক আদেশ অনুযায়ী গত ৩ ফেব্রুয়ারি রাত ১টার দিকে গাজীপুরের কাশিমপুরের কেন্দ্রীয় কারাগার-২ থেকে জাহালম মুক্তি পেয়েছেন।