দু'পক্ষই অনড়

ডাকসুতে পুনর্নির্বাচনের দাবি অব্যাহত উপাচার্য বললেন, সুযোগ নেই

প্রকাশ: ১৫ মার্চ ২০১৯      

সমকাল প্রতিবেদক ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক

দু'পক্ষই অনড়

বৃহস্পতিবার রোকেয়া হলের সামনে চার দফা দাবিতে অনশনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন ডাকসুর নবনির্বাচিত ভিপি নুরুল হক নুর - সমকাল

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) এবং হল সংসদের নির্বাচনের ফল বাতিল করে পুনঃভোটের দাবিতে অনশন অব্যাহত রয়েছে। রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে গতকাল বৃহস্পতিবার আমরণ অনশনের তৃতীয় দিন পার করেছেন সাত শিক্ষার্থী। রোকেয়া হলের পাঁচ শিক্ষার্থী তাদের অনশনের দ্বিতীয় দিন শেষে প্রশাসনকে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়ে রাতে কর্মসূচি স্থগিত করেছে। ভোট বর্জনকারী ও শিক্ষার্থীদের একাংশ আন্দোলন চালিয়ে গেলেও, প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, পুনর্নির্বাচনের কোনো সুযোগ নেই।

উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান সমকালকে বলেছেন, শিক্ষার্থীদের অনশনের কথা শুনেছেন। কিন্তু পুনরায় নির্বাচন দেওয়ার সুযোগ নেই। তিনি দাবি করেন, 'উৎসবমুখর, সুষ্ঠু ও সুন্দর পরিবেশে নির্বাচন হয়েছে।'

গত বুধবার রোকেয়া হলের প্রধান গেটের সামনে চার দফা দাবিতে অনশনে বসেন পাঁচ শিক্ষার্থী। তাদের দাবি- প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. জিনাত হুদার পদত্যাগ, হল সংসদে পুনঃভোট, প্রাধ্যক্ষের ওপর হামলার অভিযোগে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার এবং আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা।

গতকাল রাত ৯টার দিকে হলের শিক্ষার্থীরা অনশনকারীদের সঙ্গে যোগ দিয়ে ডাকসু নির্বাচনের কারচুপির অভিযোগ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন। এর আগে রাত সাড়ে ৯টার দিকে অনশনরত ছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলতে আসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. এ কে এম গোলাম রব্বানী, প্রাধ্যক্ষ ড. জিনাত হুদা, ডাকসুর নবনির্বাচিত ভিপি নুরুল হক নুর, জিএস গোলাম রাব্বানী ও এজিএস সাদ্দাম হোসাইন। প্রক্টর ছাত্রীদের বলেন, 'তোমাদের কথা শুনলাম। দাবিগুলো

নিয়ে আলোচনায় বসব। অনশন ভেঙে হলে ফিরে যাও। তোমাদের ডাকে সাড়া দিয়েছি। সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে আলোচনা করে সমাধান করতে হবে।'

প্রাধ্যক্ষ বলেন, 'তোমাদের অনেক ভালোবাসা দিয়েছি, তোমাদের সঙ্গে আছি। তোমরা অনশন বন্ধ করে হলে ফিরে যাও।'

ছাত্রীরা এ সময় 'ভুয়া, ভুয়া' এবং 'প্রভোস্টের পদত্যাগ চাই' স্লোগান দিতে থাকেন।

এরপর জিএস গোলাম রাব্বানী কথা বলতে গেলে অনশনকারী শেখ মৌসুমী বলেন, 'আপনার কথা শুনব না। আপনি কাল আমাদের হেনস্তা করেছেন।' তখন রাব্বানী ও সাদ্দাম সেখান থেকে চলে যান।

পরে প্রাধ্যক্ষের বাসভবনের সামনে গিয়ে বিক্ষোভ করেন হলের ছাত্রীরা। তাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পদত্যাগ দাবি করেন।

বিক্ষোভ শেষে মৌসুমী সাংবাদিকদের বলেন, তাদের পাঁচ অনশনকারীর মধ্যে দু'জন অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাই ২৪ ঘণ্টার জন্য অনশন কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে। কালকের (আজ শুক্রবার) মধ্যে প্রভোস্টকে পদত্যাগ করতে হবে। নতুন প্রভোস্টের অধীনে হল সংসদে পুনর্নির্বাচন দিতে হবে।

রোকেয়া হলের সামনে অনশনকারী পাঁচজন হলেন- ইসলামিক স্টাডিজের রাফিয়া সুলতানা, উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের সায়েদা আফরিন, একই বিভাগের জয়ন্তী রেজা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের শ্রবণা শফিক দীপ্তি এবং ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের প্রমি খিসা। রাফিয়া সুলতানা হল সংসদে ভিপি পদে কোটা সংস্কারের আন্দোলনকারীদের প্যানেল থেকে ভিপি প্রার্থী ছিলেন। শ্রবণা শফিক দীপ্তি স্বতন্ত্র জোটের প্রার্থী হয়েছিলেন। ছাত্র ফেডারেশনের সায়েদা আফরিন হল সংসদের এজিএস এবং প্রমি খিসা সদস্যপদে নির্বাচন করেন।

গতকাল বিকেলে শ্রবণা বলেন, প্রভোস্ট ফোনে বলছেন, 'অনশন করে কোনো লাভ হবে না। বরং যারা এসব করে বেড়াচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।' প্রক্টরিয়াল টিম আমাদের উঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। তিনি অভিযোগ করেন, ছাত্রলীগ কর্মীরা তাদের ঘিরে মহড়া দিয়ে যায়, রাতের বেলা অকথ্য ভাষায় গালি দেয়।

দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে রোকেয়া হলের প্রাধ্যক্ষ জিনাত হুদা বলেন, রাতে তিনি ও হাউস টিউটররা ছিলেন, প্রক্টরিয়াল টিমের সদস্যরা এসেছিলেন। অনশনকারীদের আলোচনার জন্য ডেকেছিলেন, কিন্তু তারা আসেনি।

তিনি নিজে কেন কথা বলতে যাননি- এ প্রশ্নে জিনাত হুদা বলেন, অনশনকারীররা হলের বাইরে অবস্থান করছে। হলের ভেতরে হলে তাদের কাছে যাওয়ার কথা আসত। তবে পদত্যাগের প্রসঙ্গ তিনি এড়িয়ে যান তিনি।

গতকাল দুপুর দেড়টার দিকে নুরুল হক নুর রোকেয়া হলের সামনে গিয়ে অনশনরত ছাত্রীদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন। তার সঙ্গে কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্য নেতাকর্মীরাও ছিলেন।

নুর বলেন, যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীর লাঞ্ছনা ও হেনস্তার অপসংস্কৃতি চালু করতে চায়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। এরপর সংহতি জানাতে আসেন ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, ছাত্রীদের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা আছে। ছাত্রদল অনশনকারীদের সঙ্গে সব সময় থাকবে।

এদিকে অনশনে বসা রোকেয়া হলের ছাত্রীদের বুধবার মধ্যরাতে হেনস্তা করার অভিযোগ উঠেছে। অনশনকারীরা অভিযোগ করেছেন, ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী নেতাকর্মীদের নিয়ে এসে তাদের হুমকি-ধমকি দেন।

রাজু ভাস্কর্যে অনশন চলছে :রোকেয়া হলের শিক্ষার্থীরা কর্মসূচি স্থগিত করলেও পুনর্নির্বাচনের দাবিতে গত মঙ্গলবার রাতে রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে অনশন শুরু করেন চার শিক্ষার্থী। পরে তাদের সঙ্গে যোগ দেন আরও দু'জন। তাদের একজন বুধবার অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে আরও চারজন অনশনে যোগ দিয়েছেন। গতকাল রাত ১টার দিকে এ রিপোর্ট লেখার সময়ও এই সাত শিক্ষার্থী অনশনে ছিলেন।

অনশনরতরা হলেন- ভূূতত্ত্ব বিভাগের আল মাহমুদ ত্বাহা, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শোয়েব মাহমুদ, পপুলেশন সায়েন্সের মাঈন উদ্দীন, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তাওহীদ তানজিম, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের রাফিয়া তামান্না, মীর আরাফাত মানব এবং রবিউল ইসলাম। তারা গত ১১ মার্চের ডাকসু নির্বাচনে বিভিন্ন পদে প্রার্থী ছিলেন।

অনশনে অসুস্থ হয়ে পড়লে দর্শন বিভাগের অনিন্দ্য মণ্ডলকে বুধবার হাসপাতালে নেওয়া হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার হাসপাতালে তার বাবা-মা এসে তাকে বাসায় নিয়ে যান। অনিন্দ্য সমকালকে জানান, তিনি এখনও খুব অসুস্থ।

রাফিয়া তামান্না সমকালকে বলেন, তিন দিন ধরে তারা অনশন করলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেনি। হাসপাতালে অনিন্দ্যকেও কেউ দেখতে যাননি। তবে দু'জন শিক্ষক এসেছিলেন। তারা বলেছেন, 'তোমরা তো জানোই- ভিসি কেমন। তোমরা যদি অনশন চালিয়ে যাও, তাহলে ক্ষতি তোমাদেরই হবে। ভিসি তার সিদ্ধান্তে অটল থাকবেন।' তবে আমৃত্যু অনশন চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন তামান্না।

অনশনে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী রবিউল :পুনর্নির্বাচনের দাবিতে গতকাল বৃহস্পতিবার রাজু ভাস্কর্যে আমরণ অনশনে যোগ দিয়েছেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মো. রবিউল ইসলাম। ডাকসু নির্বাচনে সমাজসেবা সম্পাদক প্রার্থী ছিলেন তিনি। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ছাত্র রবিউল নির্বাচনে কারচুপির সঙ্গে জড়িতদের পদত্যাগ দাবি করেন।