অল্পের জন্য রক্ষা পেলেন তামিম-মুশফিকরা

প্রকাশ: ১৬ মার্চ ২০১৯      

সামিউল টিটু, ক্রাইস্টচার্চ থেকে

ঘৃণার বিষ কতটা তীব্র হলে হত্যাকাণ্ডকেও লাইভ স্ট্রিমিং করতে পারে কেউ! কতটা পশু হলে কেউ মসজিদের মতো পবিত্র স্থানে গিয়ে মানুষ মারতে পারে! গতকাল নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে তেমনই এক 'ব্ল্যাক ফ্রাইডে'তে চমকে গেল গোটা বিশ্ব। প্রশান্তপাড়ের ছবির মতো শান্ত শহরটিকে রক্তাক্ত হতে দেখে সে প্রশ্নটিই ফিরে এলো- মানুষের জন্য পৃথিবীর কোথাও কি তবে নিরাপদ নয়? মাত্র পাঁচ মিনিটের জন্য এই হামলায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন বাংলাদেশি ক্রিকেটাররা। জুমার নামাজ পড়তে ওই মসজিদেই রওনা হয়েছিলেন তামিমরা। অধিনায়কের সংবাদ সম্মেলন দেরি হওয়াতেই যেতে বিলম্ব হয় তাদের। হয়তো সেটাই ছিল তাদের 'লাইফ লাইন'। প্রাণ হাতে হোটেলে ফিরে এলেও যে বীভৎসতা চোখের সামনে দেখেছেন ক্রিকেটাররা, এরপর ট্রমা থেকে বের হতে পারেননি কেউ। ক্রাইস্টচার্চের নভোটেল হোটেলে একসঙ্গে অনেকে এক রুমে রাত পার করেছেন। সময় গুনছেন কখন দেশে ফেরার বিমানে উঠবেন, কখন প্রিয় পরিবারের কাছে ফিরে যাবেন। নিউজিল্যান্ড সময় আজ দুপুর ১২টায় সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সে করে ক্রিকেটাররা দেশে ফিরছেন, ঢাকায় পৌঁছতে পৌঁছতে রাত ১০টা ৪০। বেঁচে ফেরা প্রিয় মুখগুলো দেখার জন্য দেশের মানুষও নিশ্চয় অপেক্ষা করে আছে।

এবারে নিউজিল্যান্ড সফরে এসে এই ক্রাইস্টচার্চেই বেশি দিন থেকেছে টাইগাররা।

এমনকি হ্যাগলি ওভাল মাঠের কাছে এই আল নূর মসজিদে আগের সপ্তাহেও জুমার নামাজ আদায় করেছেন মুশফিকরা। দূরে পাহাড় আর চারপাশে সবুজে ঘেরা এই এলাকাটি এমনিতেই বেশ নিরিবিলি। গতকাল হোটেল থেকে মাঠে এসেই বৃষ্টির সম্ভাবনার কথা শুনতে পান রিয়াদরা। একবার ঠিক হয় হ্যাগলি ওভালে অনুশীলন না করে পাশে লিঙ্কন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনডোরে গিয়ে অনুশীলন করবেন। নিউজিল্যান্ড বোর্ডের বেঁধে দেওয়া সময় অনুযায়ী স্থানীয় সময় দুপুর ২টা থেকে শুরু হওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশের অনুশীলন সেশন। কিন্তু শুক্রবার থাকায় দলের অনেকেই জুমার নামাজ পড়তে চান। তাই ঠিক করা হয়, প্রি-ম্যাচ সংবাদ সম্মেলন করে মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ এলেই টিম বাসে করে ওই মসজিদে যাওয়া হবে। এমনিতে হাঁটা পথে মাঠ থেকে মসজিদের দূরত্ব পনেরো মিনিটের মতো। কিন্তু সব মিলিয়ে ১৭ জনের দল হয়ে যাওয়ায় টিম বাসে করেই মসজিদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দলের আরেকটি গ্রুপ তখন মাঠেই থেকে যায়, কোচ স্টিভ রোডস লাঞ্চ করতে যান। সৌম্য সরকারসহ কয়েকজন তাদের সঙ্গেই বাসে ছিলেন। অবাক ব্যাপার হলো, দলের অধিকাংশ ক্রিকেটার যখন মসজিদে যাচ্ছেন তখন তাদের সঙ্গে না ছিল কোনো নিরাপত্তারক্ষী, না ছিল লিয়াজোঁ অফিসার। অবশ্য নিউজিল্যান্ডে দলের সঙ্গে সেভাবে কোনো নিরাপত্তারক্ষী থাকে না। নিউজিল্যান্ড দলের সঙ্গেও না।

এদিন টিম বাসে চড়ে দল মসজিদে রওনা দেওয়ার পর সাংবাদিকরা প্রেসবক্সেই ছিলেন। হঠাৎ তামিম ইকবালের ফোন আসে এক সাংবাদিকের মোবাইলে। তখনই প্রথম জানা যায় মসজিদে গোলাগুলি চলছে। বাংলাদেশ থেকে আসা সাংবাদিকরা দৌড়ে যান সেখানে। দেখতে পান, তামিম, মুশফিকরা দ্রুত পায়ে হেঁটে আসছেন। মুশফিক রীতিমতো কাঁদছিলেন তখন। তামিম নিচু স্বরে বলছিলেন- যা দেখেছি, তারপর আর খেলার কোনো অবস্থা নেই। আসলে বাস থেকে নেমে শুরুতে দৌড়েছিলেন তারা, কিন্তু কেউ একজন মনে করিয়ে দেন- দৌড়ালে পুলিশ তাদেরই আক্রমণকারী ভাবতে পারে। নিঃশব্দের মাঝেও তাদের মুখে তখন স্পষ্ট মৃত্যুর মুখ থেকে ফেরার আতঙ্ক। পনেরো মিনিটের ওই পথটুকুও তখন মনে হচ্ছিল জীবনের সবচেয়ে লম্বা পথ, সবচেয়ে দীর্ঘ সময়। ওভাবে দ্রুত পায়ে মাঠে ফিরেই ক্রিকেটাররা ড্রেসিংরুমে গিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে থাকেন। কেউ কেউ তখনই দেশে পরিবারকে ফোন দেন। ওভাবে ড্রেসিংরুমেই অনেকক্ষণ কেটে যায় তাদের। এরই মধ্যে নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ড থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়, সিরিজের তৃতীয় ও শেষ টেস্ট বাতিল করা হয়েছে। দেশ থেকেও তামিম-মুশফিকদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন বিসিবিপ্রধান। আশ্বস্ত করেন, দ্রুত দেশে ফেরার ব্যবস্থা করা হচ্ছে তাদের জন্য। তারা যখন মসজিদের কাছাকাছি তখনও নামাজ শুরু হয়নি, মুসল্লিরা অজু করছিলেন অনেকে।

পরে পুলিশ এসে কর্ডন দিয়ে হোটেল নভোটেলে ফিরিয়ে নিয়ে যায় খেলোয়াড়দের। এত ঘটনার পর সেই হোটেলের সামনে দুই পুলিশকে দেখা যায়। কিন্তু ততক্ষণে বাংলাদেশ থেকে আসা সাংবাদিকরা মাঠেই আটকা পড়েছিলেন। বিকেলে যখন টিম হোটেলে যান, তারপর খালেদ মাসুদ পাইলট এসে তার ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা বলেন ক্যামেরার সামনে। 'মসজিদের মাত্র পঞ্চাশ গজ দূরে ছিলাম আমরা। এক নারী আমাদের গাড়ি থামিয়ে চিৎকার করে বলতে থাকেন- ওদিকে যেও না, ওখানে গোলাগুলি চলছে। আমি ও তামিম সামনের সিটে ছিলাম। গুলির শব্দ পেয়ে কেউ কেউ কাঁদতে থাকে। সবাই আমরা সিটের নিচে মাথা লুকিয়েছিলাম, যাতে করে ওপেন ফায়ার হলেও গায়ে না লাগে। এরপর বাসের পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাই সবাই।' সন্ধ্যায় যখন দলের ম্যানেজার খালেদ মাসুদ পাইলট এসব বলছিলেন, তখনও মিটিংরুমে সব খেলোয়াড় একসঙ্গেই ছিলেন। এমন অবস্থায় কেউ একা একা থাকতে চাচ্ছিলেন না। আসলে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার আতঙ্ক তখনও তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল তাদের।