শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান নিয়োগ

ক্ষমতা হারাচ্ছে পরিচালনা কমিটি

প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০১৯

সাব্বির নেওয়াজ

ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ বেশ পুরনো। শিক্ষক নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি ঠেকাতে বেসরকারি স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটির কাছ থেকে শিক্ষক নিয়োগের একচ্ছত্র ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয় ২০১৫ সালের নভেম্বরে। বর্তমানে 'বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষে'র (এনটিআরসিএ) মাধ্যমে সারাদেশে কেন্দ্রীয়ভাবে শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ও নিয়োগ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানপ্রধান তথা অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক ও মাদ্রাসা সুপারসহ কর্মচারী নিয়োগের ক্ষমতা এখনও পরিচালনা কমিটির হাতেই আছে। প্রতিষ্ঠানপ্রধান পদেও এনটিআরসিএর মাধ্যমে কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়োগ দেওয়ার কথা ভাবছে  সরকার। এতে এসব পদে নিয়োগের স্বচ্ছতা আসবে, যোগ্য ও মেধাবীরাই নিয়োগ পাবেন বলে মনে করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

জানা গেছে, সহকারী শিক্ষক, সহকারী মৌলবি ও প্রভাষক পদের পর এবার অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষকের মতো প্রতিষ্ঠানপ্রধান পদেও কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়োগ দিতে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে একটি নির্দেশনা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তাতে উল্লেখ আছে, এ নিয়োগ কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে এনটিআরসিএর হাতে দেওয়ার জন্য।

এ পরিপ্রেক্ষিতে আগামী বছর থেকে এ নিয়োগ কার্যক্রম শুরু হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বেসরকারি মাধ্যমিক) জাবেদ আহমেদ। এ নিয়ে গত বৃহস্পতিবার (৪ এপ্রিল) এনটিআরসিএর এক সভায় বিশদ আলোচনা করা হয় বলে জানা গেছে। ওই সভার একাধিক সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠানপ্রধান পদে নিয়োগ দিতে গেলে এনটিআরসিএর বিদ্যমান আইন পরিবর্তন করতে হবে। সভায় আইন পরিবর্তনের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। জাবেদ আহমেদ এ সভায় সভাপতিত্ব করেন।

সভা সূত্র জানায়, এনটিআরসিএর বর্তমান আইন অনুসারে সারাদেশে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সহকারী শিক্ষক/সমমান পদে নিয়োগ সুপারিশ করে এনটিআরসিএ। সম্প্রতি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক সভায় শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনিও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এনটিআরসিএর মাধ্যমে অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষক নিয়োগ কার্যক্রম শুরুর প্রস্তাব করেন। শিক্ষামন্ত্রীর এ প্রস্তাবের ওপর ভিত্তি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে এ-সংক্রান্ত একটি লিখিত প্রস্তাব এনটিআরসিএতে পাঠানো হয়। এ প্রস্তাবের ওপর অতিরিক্ত সচিব জাবেদ আহমেদের সভাপতিত্বে এনটিআরসিএতে বৃহস্পতিবার সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা সূত্র জানায়, যেহেতু এনটিআরসিএর বর্তমান আইনে শুধু সহকারী শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার কথা বলা আছে, তাই আইন সংশোধন না করে প্রতিষ্ঠানের প্রধান পদগুলোতে নিয়োগ দেওয়া সম্ভব নয়। এ কারণে আইন পরিবর্তনের বিষয়ে সভায় আলোচনা হয়েছে। আইনে কী ধরনের পরিবর্তন আনা প্রয়োজন, নতুন করে কী কী সংযোগ করা দরকারসহ কোন রূপরেখায় প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ের পদগুলোতে নিয়োগ দেওয়া হবে, তা নিয়ে সভায় আলোচনা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। দ্রুত এ বিষয়ে আরও বৈঠক হবে বলে জানা গেছে।

এনটিআরসিএর কর্মকর্তারা সমকালকে জানান, প্রতিষ্ঠানপ্রধান পদের নিয়োগ নিয়ে নানা অভিযোগ আসছে তাদের কাছে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কমিটির লোকজনের আত্মীয়-স্বজনসহ নানা ধরনের অনিয়ম হয় বলে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ পাচ্ছেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে কমিটির সদস্যরা আর্থিক সুবিধা নিয়ে তাদের মনোনীত পছন্দের প্রার্থীদের নিয়োগ দেন। ফলে যোগ্য প্রার্থীরা বঞ্চিত হচ্ছেন। এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে এনটিআরসিএর মাধ্যমে শিক্ষকদের শীর্ষ পর্যায়ের পদগুলোতে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরুর নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বেসরকারি মাধ্যমিক) জাবেদ আহমেদ বলেন, 'অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে এনটিআরসিএর সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। এ সংক্রান্ত একটি বৈঠক হয়েছে। আরও বৈঠক হবে।'

তিনি বলেন, এনটিআরসিএর যে আইন রয়েছে, তা দিয়ে এসব পদে নিয়োগ কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব নয়। পাশাপাশি এ কার্যক্রম শুরু করতে এর রূপরেখা কেমন হতে পারে, সেসব নিয়ে প্রাথমিকভাবে আলোচনা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এটি নিয়ে আরও অনেক আলাপ-আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।

তবে আগামী বছর থেকে এ কার্যক্রম শুরু হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।

শিক্ষকরা জানান, বিভিন্ন এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি পদে রাজনৈতিক ব্যক্তিরা ও এমপিদের পছন্দের ব্যক্তিরা রয়েছেন। ফলে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে অনেক সময় রাজনৈতিক বিবেচনা এবং আর্থিক বিষয় মুখ্য হয়ে ওঠে। এসব পরিচালনা কমিটির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীনদের প্রভাব বিস্তার এবং টাকার ছড়াছড়িও হয়ে থাকে। গত শনিবার (৬ এপ্রিল) রাজধানীর অন্যতম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের পরিচালনা কমিটির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কয়েক বছর আগে রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের পরিচালনা কমিটির নির্বাচনে সোনালী ব্যাংকের একজন সিবিএ নেতা শুধু ভোটারদের আনা-নেওয়ার জন্য ৮০টি দামি গাড়ি ব্যবহার করে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিলেন। সম্প্রতি ভিকারুননিসা কর্তৃপক্ষও অধ্যক্ষ নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে।

সারাদেশে প্রায় ১৯ হাজার বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুল, সাড়ে তিন হাজার বেসরকারি কলেজ ও সাড়ে ৯ হাজার বেসরকারি মাদ্রাসা রয়েছে।

এনটিআরসিএর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়োগের উদ্যোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রাজধানীর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ শাহান আরা বেগম বলেন, 'নতুন এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে তুলনামূলকভাবে ভালো হবে।'

প্রবীণ শিক্ষক নেতা অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ বলেন, 'অনেক আগেই এটি করা গেলে আরও ভালো হতো। নিয়োগের ঝামেলা, তদবির ও চাপ আর সহ্য করতে হবে না। তাই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সদস্যরা এখন প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের কাজে আরও বেশি মনোযোগী হতে পারবেন।'