শ্নীলতাহানির মামলা না তোলায় ভয়ঙ্কর শাস্তি!

প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০১৯

সমকাল প্রতিবেদক, ঢাকা নিজস্ব প্রতিবেদক, ফেনী ও সোনাগাজী প্রতিনিধি

শ্নীলতাহানির মামলা না তোলায় ভয়ঙ্কর শাস্তি!

শনিবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের সামনে রাফির স্বজনের আহাজারি- সমকাল

ফেনীর সোনাগাজীতে আলিম পরীক্ষা দিতে গিয়ে চরম নিষ্ঠুরতার শিকার হতে হয়েছে নুসরাত জাহান রাফি (১৮) নামের এক শিক্ষার্থীকে। পরীক্ষা কেন্দ্রের ছাদে ডেকে নিয়ে তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে বোরকা পরা চার দুর্বৃত্ত। গতকাল শনিবার সকাল পৌনে ১০টার দিকে ওই ভয়ঙ্কর ঘটনাটি ঘটেছে নোয়াখালীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে। রাফির শরীরের ৭৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় গতকালই ফেনী সদর হাসপাতাল থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে স্থানান্তর করা হয়েছে তাকে। ওই ছাত্রীর পরিবার বলছে- শ্নীলতাহানির মামলা তুলে না নেওয়ায় স্থানীয় এক মাদ্রাসা অধ্যক্ষের অনুসারীরা ওই ঘটনা ঘটিয়েছে। বেশ কিছুদিন ধরেই মাদ্রাসার অধ্যক্ষের লোকজন মামলা তুলে নিতে চাপ দিয়ে আসছিল তাদের। বেশ কয়েকবার হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়। মামলা না তোলায় এমন ভয়ঙ্কর শাস্তি পেল রাফি। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা ওই মাদ্রাসাছাত্রী সোনাগাজী পৌরসভার চরচান্দিয়া গ্রামের  মাওলানা একেএম মুসা মিয়ার মেয়ে।

আশঙ্কাজনক অবস্থায় রাফি সমকালকে জানান, শনিবার পরীক্ষা কেন্দ্রে গেলে বোরকা পরা এক ছাত্রী তার বান্ধবী নিশাতকে ছাদের ওপর মারধর করা হচ্ছে বলে জানায়। এই তথ্য জানার পর তিনি ছাদে গেলে তার শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে বোরকা পরা কয়েকজন পালিয়ে যায়। মাদ্রাসা অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ করায় তার শরীরে আগুন লাগানো হয়েছে বলে জানান তিনি।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের আবাসিক চিকিৎসক ডা. পার্থ শংকর পাল বলেন, মুখমণ্ডল ছাড়া রাফির শরীরের প্রায় পুরো অংশই দগ্ধ হয়েছে। শ্বাসনালিও পুড়ে গেছে। তার অবস্থা সংকটাপন্ন। তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখা হয়েছে।

এ ঘটনার পর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মাদ্রাসা শিক্ষক আকতার হোসেন ও আরিফ নামের দু'জনকে আটক করেছে পুলিশ। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন ফেনীর পুলিশসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। কেরোসিন থেকেই আগুন লেগেছে, এমন আলামত ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া গেছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ফেনীর পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর আলম সমকালকে বলেন, 'মাদ্রাসাছাত্রীর দগ্ধ হওয়ার ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। যেহেতু আগে থেকেই মাদ্রাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে ওই ছাত্রীর অভিযোগ ছিল, তাই এর জের ধরে ঘটনাটি ঘটেছে কি-না সেটিকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। ছাত্রীর পরিবারও একই ধরনের অভিযোগ করেছে। এর পাশাপাশি নিষ্ঠুর এ ঘটনার নেপথ্যে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি-না, তদন্ত হচ্ছে সেটিরও। পুরো তদন্ত শেষ হওয়ার পরই প্রকৃত কারণ জানা যাবে। ঘটনাস্থল থেকে পলিথিন জাতীয় কিছু পাওয়া গেছে। ধারণা হচ্ছে, ওই পলিথিনের ভেতরেই কেরোসিন ছিল।'

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, ঘটনাস্থল থেকে কাউকে পালিয়ে যেতে দেখেননি কেউ। তাই এখনই সব কিছু পরিস্কারভাবে বলা সম্ভব নয়।

দগ্ধ ছাত্রীর ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান জানান, শনিবার সকালে আরবি প্রথমপত্র পরীক্ষা ছিল। তিনি বোনকে নিয়ে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে যান। ওই সময় কয়েকজন ছাত্র ও অফিস সহকারী মো. মোস্তফা মাদ্রাসায় ঢুকতে বাধা দেন তাকে। পরে তিনি বোনকে দিয়ে চলে যান। বোনের বরাত দিয়ে নোমান জানান, মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার পক্ষের কয়েকজন শিক্ষার্থী নুসরাতকে মাদ্রাসার ছাদে ডেকে নিয়ে যায়। তারা অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা তুলে নিতে চাপ দেয় তাকে। এ সময় তিনি কিছু না বলায় তিনজন শিক্ষার্থী তার হাত ধরে, একজন তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়। এতে তিনি মারাত্মকভাবে দগ্ধ হন। এ সময় তার আর্তচিৎকার শুনে শিক্ষক ও অন্যরা এগিয়ে গিয়ে উদ্ধার করে সোনাগাজী হাসপাতালে নিয়ে যান। এরপর নেওয়া হয় ফেনী সদর হাসপাতালে। সেখান থেকে ঢাকায় পাঠানো হয়।

গতকাল সন্ধ্যায় রাফির ভাই নোমান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জানান, রাফির গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া চার দুর্বৃত্ত ছিল বোরকা পরা। রাফি চারজনের কাউকেই চিনতে পারেনি। চারজনের মধ্যে একজন নারীকণ্ঠে কথা বলেছে তার সঙ্গে। বাকি তিনজন চুপচাপ ছিল। তারা নারীর বেশ ধরে পুরুষও হতে পারে। তাকে ছাদে নেওয়ার যে ফাঁদ পাতা হয়েছিল সেও এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত।

নোমান আরও বলেন, ২৭ মার্চ মাদ্রাসার অধ্যক্ষ নিজ কক্ষে রাফিকে ডেকে নিয়ে অনৈতিক প্রস্তাব দেন। রাজি হলে আলিম পরীক্ষার প্রশ্নপত্র আগে দেওয়ারও প্রলোভন দেখান। ওই ঘটনার জের ধরেই অধ্যক্ষের লোকজন তার বোনের শরীরে আগুন দিয়েছে।

জানা গেছে, গত ২৭ মার্চ এক পিয়নকে দিয়ে রাফিকে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় নিজের কক্ষে ডেকে নেন অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা। ওই সময় রাফি ও সিরাজ ছাড়া অন্য কেউ ওই কক্ষে ছিলেন না। ওই দিন কক্ষ থেকে বেরিয়ে রাফি তার বান্ধবীদের জানান, অধ্যক্ষ তাকে শ্নীলতাহানির চেষ্টা করেছেন। তার সঙ্গে আপত্তিকর আচরণ করেছেন তিনি। তার পরিবার এটা জানার পর অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। পুলিশের কাছে দেওয়া বক্তব্যেও রাফি অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ করেন। ওই অভিযোগের ভিত্তিতে মাদ্রাসার অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তিনি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। ওই ঘটনার পর থেকে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ অধ্যক্ষের মুক্তির দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছে। আরেকটি অংশ অধ্যক্ষের শাস্তির দাবিতে মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালন করে আসছে। এলাকার প্রভাবশালীরা দুটি পক্ষে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।

দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, তদন্তের পর মাদ্রাসা অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে ওঠা শ্নীলতাহানির ঘটনার প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ। তার অতীত রেকর্ডও ভালো নয়। এর আগে প্রায় একই ধরনের অভিযোগ ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে উঠেছিল।

সোনাগাজীর ওই পরীক্ষা কেন্দ্রে দায়িত্বরত পুলিশ কনস্টেবল রাশেদ ও মাদ্রাসার নিরাপত্তা প্রহরী মোস্তফা জানান, ঘটনার সময় ছাদ থেকে চিৎকার করতে করতে রাফি নিচে নেমে এলে দ্রুত তার শরীরের আগুন নেভানোর চেষ্টা করা হয়।

ঘটনার কিছু সময় পর ফেনীর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিকে এনামুল করিম, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোহেল পারভেজ, সোনাগাজী সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার সাইফুল আহমদ ভূঞা মাদ্রাসায় পৌঁছে পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় অগ্নিদগ্ধ নুসরাতের বান্ধবী নিশাত জানান, তাকে কেউ মারধর করেনি। নুসরাত হলে এসে তার প্রবেশপত্রসহ অন্য সামগ্রী টেবিলে রেখে গিয়ে বাইরে চলে যাওয়ার কিছু সময় পর আগুনের ঘটনা ঘটে। তবে ঘটনা কীভাবে ঘটেছে, তা জানেন না তিনি।

রাফির পরিবারের সদস্যরা জানান, ২০১৬ সালে দাখিল পরীক্ষা দেওয়ার সময়ও এলাকার দুর্বৃত্তরা রাফির ওপর হামলা চালিয়েছিল। তখন চুন মারা হয় তার চোখে। এতে তার ডান চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তবে ওই ঘটনার সঙ্গে শনিবারের ঘটনার যোগসূত্র রয়েছে কি-না, সেটি নিশ্চিত নন তারা।

রাফির আত্মীয়রা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আরও জানান, অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা নানা অপকর্ম চালিয়ে আসছিলেন। তারপরও মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটি কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।