ভেজালের 'মহোৎসব'

প্রকাশ: ১৬ মে ২০১৯      

বকুল আহমেদ

ফুটপাতের ওপর একটি বড় কড়াইয়ে পেঁয়াজ কাটা। পাশেই ইস্পাতের একটি বড় পাত্রে সিদ্ধ ছোলা। এগুলো পেঁয়াজু আর ছোলার উপকরণ হিসেবে রাখা হয়েছে। পাশের কড়াইয়ে কালো মবিলের মতো তেল। এসব পাত্রের একটিতেও ঢাকনা নেই। উন্মুক্ত এসব খাবারের ওপর মশা-মাছি উড়ছে মনের খুশিতে। খাবার পাত্র ঘেঁষেই পথচারীর হাঁটাচলা। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কেউ থুথু ফেলছেন, কেউ হয়তো হাঁচি দিচ্ছেন। উড়ছে ধুলোবালি।

এ দৃশ্য রাজধানীর কারওয়ান বাজারের আম্বরশাহ মসজিদ মার্কেটের 'মধুবন নাস্তা ঘর' নামে একটি রেস্তোরাঁর। এখানে তৈরি হচ্ছিল ইফতারসামগ্রী। গত সোমবার প্রায় ৪০ মিনিট সেখানে অবস্থান করে এসব দৃশ্য দেখা যায়।

শুধু মধুবন নয়, রমজান মাসে এ দৃশ্য পুরো রাজধানীর, বলতে গেলে সারাদেশের। রোজা এলেই যেন ভেজালের মহোৎসবে মেতে ওঠেন এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী। নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি ইফতার সামগ্রী এবং ভেজাল খাদ্যে সর্বত্র সয়লাব। অসচেতন ক্রেতারা সবকিছু দেখেও নিবৃত্ত হচ্ছেন না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভেজাল খাদ্য ধীরে ধীরে মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, কিডনি বিকল হওয়াসহ নানান কঠিন রোগ বাসা বাধে শরীরে।

সংশ্নিষ্টরা বলছেন, নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ইফতারসামগ্রী তৈরি এবং খাদ্যে ভেজাল কোনোভাবেই রোধ করা যাচ্ছে না। দিন দিন খাদ্যে ভেজালের প্রবণতা বেড়েই চলেছে। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে বাজারে ভেজালমুক্ত খাদ্য পাওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে।

রাজধানীর ইফতারসামগ্রী তৈরির একাধিক হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও দোকান ঘুরে দেখা গেছে, ভেজাল ছাড়া ইফতারসামগ্রী তৈরির কথা যেন ভাবতেই পারেন না ব্যবসায়ীরা। পোড়া তেলের সঙ্গে নতুন তেল মিশিয়ে ভাজাপোড়া চলছে দিনের পর দিন। বাসি-পচা খাবার তো আছেই। ক্রেতারাও এসব ভেজাল খাদ্য খেয়ে জীবন ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছেন।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, সিটি করপোরেশন, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) চলমান ভেজালবিরোধী অভিযানের মধ্যেও ভেজাল ও নোংরা পরিবেশে খাদ্য তৈরি বন্ধ হচ্ছে না।

রমজান মাসের শুরু থেকেই ভ্রাম্যমাণ আদালত রাজধানীর শতাধিক হোটেল-রেস্তোরাঁয় অভিযান চালাচ্ছেন। এ সময় বিপুল অর্থ জরিমানা ও খাবার অনুপযোগী পণ্য জব্দ করা হয়েছে। তবে ভেজালের জাল থেকে মুক্তি মিলছে না।

গত সোমবার ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল্লাহ আল মামুন গুলশান-২-এর অভিজাত রেস্টুরেন্ট ধানসিঁড়িতে ঢুকেই একটি ফ্রিজ খোলেন। তা থেকে বের করেন একটি আস্ত হাঁসের ফ্রাই, যা থেকে দুর্গন্ধ বের হচ্ছিল। হাঁসটির গায়ে ছত্রাক বাসা বেঁধেছে। শুধুই হাঁসই নয়, পচা দুর্গন্ধ রূপচাঁদা, রুই, কোরাল, পাবদা মাছের ফ্রাইও জব্দ করা হয় সেখান থেকে। এ অপরাধে দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয় প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজারকে।

ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনায় নিয়োজিত একাধিক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বলেছেন, ইফতারসামগ্রীর রঙ উজ্জ্বল করতে কাপড়ে ব্যবহূত রঙ মেশানো হয়, যা স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এ ছাড়া পোড়া তেল দিনের পর দিন ব্যবহার করা হচ্ছে ভাজাপোড়ায়। খাবার সঠিকভাবে সংরক্ষণও করেন না ব্যবসায়ীরা। তিন-চার দিনের পচা-বাসি খাবারও বিক্রি করা হচ্ছে। মেয়াদোত্তীর্ণ খেজুরে এক ধরনের সিরাপ স্প্রে করে নতুন করে প্যাকেটজাত করে বাজারে ছাড়া হচ্ছে।

কারওয়ান বাজারে 'ইটিভি গলির' উত্তর প্রান্তে পথের ওপরেই রয়েছে ইফতারসামগ্রী বিক্রির দোকান। কাপড় ও বস্তা দিয়ে ঘেরা এ দোকানটি দীর্ঘদিনের। সোমবার সকাল সোয়া ১১টায় সরেজমিনে দেখা যায়, একজন কর্মচারী বুন্দিয়া ভাজছে, আরেকজন সিরাই ভেজাচ্ছে। অন্য কর্মীদের কেউ চপ, পেঁয়াজু ও বেগুনি তৈরির জন্য বেসন মাখাচ্ছেন, কেউ বেগুন কাটছেন। হাঁড়ি-পাতিলের পাশে শুয়ে আছে কুকুর। দোকান ঘেঁষে গাড়ি ও মানুষের চলাচল। বুন্দিয়া ভাজা তেলের রঙ কালো কেন জানতে চাইলে এক কর্মচারী বললেন, প্রতিদিন তেল শেষ হয় না। একটু থেকে যায়। সেটির সঙ্গে নতুন তেল মিশিয়ে বুন্দিয়া ভাজা হচ্ছে। এতে কোনো সমস্যা হয় না বলে দাবি করেন তিনি। তবে চিকিৎসকরা বলছেন, এ ধরনের তেলে তৈরি খাদ্য শরীরের জন্য ভয়াবহ ক্ষতিকর।

ভেজাল খাবার কিনে প্রতারিত হওয়ার পর অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। গত সোমবার পুরান ঢাকার ওয়ারীর এক বাসিন্দা তার ফেসবুক আইডিতে লিখেছেন, 'সারাদিন রোজা রেখে ভাবলাম, চকবাজারের ঐতিহ্যবাহী ইফতার করব। অবশেষে গেলাম চকবাজারে। বিভিন্ন দোকান ঘুরে রকমারি ইফতার কিনলাম। বড় বাপের পোলায় খায় কিনলাম। কিন্তু দুঃখের কথা অধিক মুনাফালোভী চকবাজারের ইফতারির দোকানদার আমাদের পরিবারের ১০ জনের ইফতারি খাওয়া বাতিল করে দিল। প্রতিটি খাবারই ছিল বাসি, পচা। কেউ দেখলে বুঝতেই পারবে না এত সুন্দর খাবার বাসি-পচা হয় কীভাবে।'

ভেজাল খাদ্যদ্রব্য জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব সমকালকে বলেন, ভেজাল খাদ্য ধীরে ধীরে মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, কিডনি বিকল হওয়াসহ যতসব কঠিন রোগ আছে, সেগুলোর বেশিরভাগেরই সৃষ্টি ভেজাল খাদ্য গ্রহণের কারণে। রোগ-ব্যাধি শুধু একজন ব্যক্তিকে মৃত্যুর মুখে ধাবিত করে না, আক্রান্ত ব্যক্তির পুরো পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে নিঃস্ব করে দেয়। সুতরাং কঠোর হাতে খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধ করতে হবে। ভেজাল কারবারিদের কোনো ছাড় নয়। তাদের সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান করতে হবে। একইসঙ্গে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ সংশ্নিষ্ট সবাইকে ভূমিকা পালন করতে হবে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. মজিবুর রহমান সমকালকে বলেন, ভেজাল খাদ্য খাওয়ার কারণে মানুষ নানাবিধ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। পচা-বাসি খাদ্যে তাৎক্ষণিকভাবে পেটের পীড়া, ডায়রিয়া, গ্যাস্ট্রিক হতে পারে। অতিরিক্ত তেলে হার্টের সমস্যা হয়। দীর্ঘমেয়াদি রোগের মধ্যে ক্যান্সারের মতো দুরারোগ্য ও ব্রেইনে সমস্যা হতে পারে। ভেজাল খাদ্য গ্রহণের কারণে সম্প্রতি মানুষের কিডনিতে অনেক জটিলতা দেখা দিচ্ছে বলে জানান তিনি।

গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মশিউর রহমান, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মরত থাকাকালে রাজধানীতে একাধিক ভেজালবিরোধী ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন। তিনি সমকালকে বলেন, ক্রেতার কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতে খাবারে বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর রঙ মেশানো হয়। আগের দিনের পচা-বাসি খাবার নতুন খাবারের সঙ্গে বিক্রি করেন ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীদের অধিক মুনাফার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

ভুক্তভোগী মানুষের অভিযোগ, বিভিন্ন সংস্থার অভিযান সত্ত্বেও ভেজাল সমস্যার দৃশ্যমান উন্নতি হচ্ছে না। তবে র‌্যাব সদর দপ্তরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম বলেন, ভ্রাম্যমাণ আদালত অব্যাহত থাকায় পরিবেশ কিছুটা ভালো হয়েছে। অবশ্য এটা এখনও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে আসেনি।

খাদ্যে ভেজাল রোধে উচ্চ আদালতে একের পর এক রিট হচ্ছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সরকারকে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন হাইকোর্ট। খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেছেন, খাদ্যে ভেজাল রোধে প্রয়োজনে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে আইন সংশোধন করার কথা ভাবছে সরকার।