দুয়ারে কড়া নাড়ছে ঈদ

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০১৯      

সমকাল প্রতিবেদক

ঈদ আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ এমন উৎসব যা ফিরে ফিরে আসে, পুনরায় অনুষ্ঠিত হয়। তবে আবহমান কাল থেকে সবার কাছে ঈদ মানে খুশি, ঈদ মানে আনন্দ। মুসলিম জাহানের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুই ঈদের মধ্যে প্রথম আসে ঈদুল ফিতর। এক মাস সিয়াম সাধনা শেষে আকাশের কোনায় শাওয়াল মাসের নতুন চাঁদ দেখার অপেক্ষা। শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা গেলেই মন বলে ওঠে, 'ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।' শুরু হয় উচ্ছ্বাসে-আনন্দে হারিয়ে যাওয়ার পালা।

ঈদ এখন  দুয়ারে কড়া নাড়ছে। আজ মঙ্গলবার চাঁদ দেখা গেলে আগামীকাল বুধবার পবিত্র ঈদুল ফিতর। গতকাল সোমবার ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, আজ চাঁদ দেখা কমিটির বৈঠক থেকেই জানা যাবে ঈদ উদযাপনের চূড়ান্ত বার্তা। আজ চাঁদ দেখা না গেলে বৃহস্পতিবার ঈদুল ফিতর উদযাপিত হবে। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবারের ঈদে বাড়তি আনন্দ যোগ করেছে ইংল্যান্ডে ক্রিকেট বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অসাধারণ জয়। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে টাইগারদের রেকর্ড রাঙা বিজয়ের আনন্দে উদ্ভাসিত জাতি এখন অপেক্ষায় ঈদ উৎসবে মেতে ওঠার। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশবাসীকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি তার শুভেচ্ছাবাণীতে বলেন, ইসলাম শান্তি ও কল্যাণের ধর্ম। এখানে হিংসা-বিদ্বেষ, হানাহানির কোনো স্থান নেই। মানবিক মূল্যবোধ, পারস্পরিক সহাবস্থান, পরমতসহিষুষ্ণতা ও সাম্যসহ বিশ্বজনীন কল্যাণকে ইসলাম ধারণ করে। ইসলামের এই সুমহান বার্তা ও আদর্শ সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। ইসলামের মর্মার্থ ও অন্তর্নিহিত তাৎপর্য মানবতার মুক্তির দিশারী হিসেবে দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ুক, বিশ্ব ভরে উঠুক শান্তি আর সৌহার্দ্যে- পবিত্র ঈদুল ফিতরে এ প্রত্যাশা করি।

প্রধানমন্ত্রী এক বিবৃতিতে দেশবাসী ও মুসলিম উম্মাহর অব্যাহত শান্তি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি কামনা করেছেন। তিনি বলেছেন, মাসব্যাপী সিয়াম সাধনার পর খুশি আর আনন্দের বার্তা নিয়ে আমাদের মাঝে সমাগত হয় পবিত্র ঈদুল ফিতর। ঈদ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে গড়ে তোলে সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও ঐক্যের বন্ধন। ঈদ সাম্য, মৈত্রী ও সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করে সব মানুষকে। পবিত্র ঈদুল ফিতরে সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি আর ভ্রাতৃত্বের মহিমান্বিত আহ্বানে শান্তি-সুধায় ভরে উঠুক প্রতিটি মানুষের হৃদয়। গতকাল আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ড. আবদুস সোহবান গোলাপ স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমানে ফিনল্যান্ড সফরে রয়েছেন।

একই সঙ্গে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের নেতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এছাড়া তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।

ঈদ প্রতি বছর চন্দ্র বর্ষপঞ্জির রীতিতে অনন্য আনন্দ-বৈভব নিয়ে ফিরে আসে। মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসব হলেও ঈদের এ দিনটি হয়ে ওঠে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলে মানবিক ও সত্যনিষ্ঠ জীবন-যাপনের তাগিদ এবং মানবতার জয়গানের প্রতীক। কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাই রমজানের রোজার শেষে খুশির ঈদের বার্তা দিয়ে পরের লাইনেই বলেছেন, 'তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমানি তাগিদ'। উঁচু-নিচু ভেদাভেদের এই সমাজে ঈদ উৎসবের অমোঘ মর্মবাণীও ধ্বনিত হয়েছে কাজী নজরুল ইসলামের বর্ণনাতেই, 'যারা জীবন ভরে রাখছে রোজা নিত্য উপবাসী, সেই গরিব, ইয়াতিম, মিসকিনে দে যা কিছু মুফিদ'। হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে মানুষে মানুষে আত্মার অটুট বন্ধনও গড়ে দেয় ঈদ। মানবতার কবি কাজী নজরুল ইসলাম ঈদের সেই মূলমন্ত্রই মনে করিয়ে দেন ছন্দে-সুরে- 'তোরে মারল ছুঁড়ে, জীবন জুড়ে ইট পাথর যারা, সেই পাথর দিয়ে তোলরে গড়ে প্রেমেরই মসজিদ।'

এখন রোজার প্রথম দিন থেকেই শুরু হয়ে যায় ঈদের কেনাকাটা। পছন্দের জামা-জুতা কিনতে মানুষ ভিড় করে ফুটপাত থেকে শুরু করে ছোট-বড় মার্কেট, বড় বড় শপিং মল, দামি সুপারশপে। মাসজুড়ে চলেছে কেনাকাটার ধুম। শুধু নতুন কাপড়ই নয়, ঈদ আনন্দের জন্য চাই ভালো ভালো খাবার। মহানবীর (সা.) সুন্নত হিসেবে মুসলমানরা ঈদে মিষ্টি জাতীয় খাবার খান। এ জন্য ঈদের দু'তিন আগে থেকেই বাড়ি বাড়ি ঈদের রকমারি মিষ্টি খাবার তৈরির প্রস্তুতি চলে। সেই আয়োজনও শুরু হয়ে গেছে এখনই। ঈদে নাড়ির টানে মানুষ ছোটে গ্রামে। সারা বছর শহরে কর্মব্যস্ত জীবনের মাঝে ঈদের এ কয়েকটা দিন বাড়িতে প্রিয়জনের সান্নিধ্যে না কাটালেই নয়। রোজার দ্বিতীয় সপ্তাহেই শুরু হয় বাস, ট্রেন, লঞ্চের আগাম টিকিট বিক্রি। বিপুল চাহিদার কারণে যানবাহনে টিকিট সংকট দেখা দেয়। এ বছর আকাশপথে মূল্যবান টিকিট পাওয়াও হয়ে পড়েছিল দুস্কর। গত বৃহস্পতিবার সরকারি কার্য দিবসের পর শুক্রবার থেকেই মূলত শত-সহস্র মানুষের বাড়ি যাওয়ার পালা শুরু হয়। তবে অন্যান্য বারের তুলনায় এ বছর মহাসড়কে যানজট কম থাকায় যাত্রাপথে ভোগান্তি কম হয়েছে মানুষের। মহাসড়কগুলোও এবার চলাচল উপযোগী ছিল। ফলে যাত্রার ধকল, ঝুঁকিও অনেকটা কমে যায়। কিন্তু বেপরোয়া চালকদের কারণে গত তিন-চার দিনের ঈদযাত্রায় একাধিক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। ঈদের খুশির আগে হতাহতের শিকার হয়েছেন অনেক মানুষ। এ অবস্থার পরিবর্তন দরকার। সড়ক শুধু যানজটমুক্ত কিংবা চলাচল উপযোগী করাই নয়, বেপরোয়া বাস চালকদেরও নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষ যথাযথ ব্যবস্থা নেবে এটাই প্রত্যাশা।

ঈদে প্রতিবারের মতোই হাসপাতাল, এতিমখানা, শিশুসদন, ছোটমণি নিবাস, বৃদ্ধাশ্রম, ভবঘুরে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকবে বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা। রাজধানীও সাজবে নবসাজে। বনানী থেকে বঙ্গভবন পর্যন্ত প্রধান সড়ক ও সড়কদ্বীপ সাজবে জাতীয় পতাকা এবং বাংলা ও আরবিতে ঈদ মোবারক-খচিত ব্যানার দিয়ে। চিড়িয়াখানা, শিশুপার্ক দর্শনার্থীদের জন্য সাজানো হয়েছে নতুনরূপে। জাতীয় ঈদগাহসহ দেশের প্রতিটি ঈদগাহ প্রস্তুত রয়েছে ঈদের জামাতের জন্য।

আজ সন্ধ্যা সোয়া ৭টায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বায়তুল মোকাররম সভাকক্ষে চাঁদ দেখা কমিটির বৈঠক বসবে। কমিটির সভাপতি ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মো. আব্দুল্লাহর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিতব্য এ বৈঠকে ধর্ম সচিব, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপচিালক, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিবসহ জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সদস্যরা উপস্থিত থাকবেন। এদিন বাংলাদেশের আকাশে কোথাও শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা গেলে ৯৫৫৯৪৯৩, ৯৫৫৯৬৪৩, ৯৫৫৫৯৪৭, ৯৫৫৬৪০৭, ৯৫৫৮৩৩৭ নম্বরে ফোন করে অথবা ৯৫৬৩৩৯৭ ও ৯৫৫৫৯৫১ নম্বরে ফ্যাক্স করে জানাতে অনুরোধ করা হয়েছে। আজ চাঁদ দেখা না গেলে ঈদ হবে বৃহস্পতিবারে। সেক্ষেত্রে সরকারি ছুটি একদিন বাড়বে।

ইংল্যান্ড ক্রিকেট বিশ্বকাপে বাংলাদেশের পরবর্তী ম্যাচ আগামীকাল। যদি এ দিনটি ঈদের দিন হয় তাহলে ঈদের আনন্দের সঙ্গে এ ম্যাচ যোগ করবে বাড়তি মাত্রা। গত রোববার শক্তিশালী দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়ে জয় তুলেছে বাংলাদেশ। একইভাবে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে বুধবার নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে জয়ের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ আরও একধাপ এগিয়ে গেলে তা হবে এবারের ঈদে দেশবাসীর জন্য সেরা উপহার। সেই প্রত্যাশায় সবার জন্য সমকালের পক্ষ থেকে 'ঈদ মোবারক'।