মাদক মামলার ভয় দেখিয়ে ঘুষ বাণিজ্য

কামরাঙ্গীরচরের ঘটনায় তিন পুলিশ ক্লোজড

প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০১৯      

বকুল আহমেদ

মাদক মামলার ভয় দেখিয়ে ঘুষ বাণিজ্য

ফাইল ছবি

রানা নামের এক কিশোরকে মাদক মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে পাঁচ হাজার টাকা ঘুষ নেন রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর থানার তিন পুলিশ সদস্য। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পর্যন্ত গড়ানোয় পরবর্তী সময়ে ঘুষের টাকা ফেরত দেন অভিযুক্তরা। তবে তাদের বিরুদ্ধে গতকাল রোববার দুপুর পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সমকালের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান চালানোয় নড়েচড়ে বসে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। এরপরই গতকাল বিকেলে অভিযুক্তদের থানা থেকে ক্লোজ করা হয়েছে। তারা হলেন- এসআই মাহফুজুর রহমান, এএসআই রুবেল রানা ও কনস্টেবল ইমাম।

সাদা পোশাকে থানা পুলিশের অভিযান চালানোয় ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কিন্তু সেই নির্দেশনা অমান্য করে গত ২২ জুন বিকেলে সাদা পোশাকে কামরাঙ্গীরচরের সিলেটি বাজারের আহসানবাগ এলাকার রানাদের রিকশা গ্যারেজে অভিযান চালানো হয়। অভিযানের আগে পুলিশের এক সোর্স গ্যারেজে রানার কক্ষের বিছানার নিচে ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম রেখে আসে। এরপরই সাদা পোশাকে পুলিশ যায় সেখানে। বিছানার নিচ থেকে সেই সরঞ্জাম উদ্ধার, রানার হাতে হ্যান্ডকাফ পরানো, তাকে মারধর এবং সর্বশেষ পাঁচ হাজার টাকা ঘুষ নেওয়ার দৃশ্য ধরা পড়ে গ্যারেজে থাকা সিসি ক্যামেরায়।

ফুটেজে দেখা যায়, টিনের ঘেরা ছোট কক্ষে পাতা খাটে বসে আছে কিশোর রানা। এক তরুণ (সাইদুর) সেখানে ঢুকে তার পাশে বসে। কিছুক্ষণ পরই সে চলে যায়। এর পর সেখানে ঢোকেন টি-শার্ট ও জিন্সপ্যান্ট পরিহিত এএসআই রুবেল ও কনস্টেবল ইমাম (ড্রাইভার)। এএসআই রুবেল কোথাও তল্লাশি না চালিয়ে প্রথমেই বিছানার চাদর উল্টিয়ে ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম বের করেন। এরপরই কোমরের পেছন থেকে হাতকড়া বের করে রানার হাতে লাগিয়ে দেন কনস্টেবল ইমাম। ফুটেজে দেখা যায়, হাতকড়া না পরতে রানা পীড়াপীড়ি করছে। হাতকড়া পরাতে বাধা দেওয়ায় রানার দুই গালে ইমাম থাপ্পড় মারেন। পরে এএসআই রুবেলও মারধর করেন রানাকে।

শনিবার রানাদের রিকশা গ্যারেজে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, গেটের বাঁ পাশে একটি ছোট কক্ষ টিন দিয়ে ঘেরা। রানা জানায়, গ্যারেজের মালিক তার বাবা তানজিল। বাবার অনুপস্থিতিতে সে-ই দেখাশোনা করে। ২২ জুনের ঘটনা জিজ্ঞাসা করতেই তার চেহারায় আতঙ্কের ছাপ দেখা যায়। মোবাইল ফোন বের করে একটি ভিডিও দেখায়, যেখানে সিসি ক্যামেরায় ধারণ করা হয়েছিল। ফুটেজটি সে মোবাইল ফোনে সংগ্রহে রেখেছে। তাতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, এএসআই রুবেল ঘুষের টাকা হাতে নিচ্ছেন। রানা জানায়, তাকে আটক করার বিষয়টি রুবেল এসআই মাহফুজুর রহমানকে ফোনে জানান। মাহফুজ আসার আগ পর্যন্ত তারা রানাকে নিয়ে গ্যারেজে অপেক্ষা করেন। এ সময় রুবেল ও ইমাম বলেন, বিকেল ৩টা থেকে ৫টার মধ্যে কক্ষে বসে রানা ইয়াবা সেবন করেছে। তখন রানা পুলিশকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। সে কখনও ইয়াবা সেবন করে না। এরই মধ্যে আশপাশের লোকজন জড়ো হয় গ্যারেজে। রানা বলে, মাগরিবের নামাজের পর এসআই মাহফুজ আসেন। পরে পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে পুলিশ আমাকে ছেড়ে দিয়ে চলে যায়।

ঘটনার পর রানার বাবা তানজিল কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে সিসি ক্যামেরার ফুটেজসহ পুলিশের লালবাগ বিভাগের উপকমিশনারের (ডিসি) কার্যালয়ে অভিযোগ করেন তিন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে। তানজিল সমকালকে বলেন, ডিসি অফিসে অভিযোগ করার পর তারা সেই ঘুষের পাঁচ হাজার টাকা ফেরত দিয়েছেন। শুক্রবার স্থানীয় লোকজনের উপস্থিতিতে তার গ্যারেজে বৈঠক হয়। বৈঠকে সোর্স রহমান উপস্থিত ছিল। পুলিশ ডেকে রানাকে মিথ্যাভাবে ধরানোর বিষয়ে রহমান স্বীকার করে বৈঠকে। বিষয়টি স্থানীয়ভাবে মিটমাট হয়ে গেছে জানিয়ে তানজিল বলেন, এ নিয়ে তিনি আর বাড়াবাড়ি করতে চান না। কারণ, আবার পুলিশি হয়রানির শিকার হতে পারেন এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গতকাল দুপুর পর্যন্ত অভিযুক্ত তিন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তারা বহাল তবিয়তে থানায় কর্মরত। বিকেল ৩টার দিকে অভিযুক্তদের বিষয়ে পুলিশের লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার মো. ইব্রাহিম খান বলেন, বিষয়টির তদন্ত করছেন লালবাগ জোনের এডিসি। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সোয়া ৩টার দিকে এডিসি নাজির আহমেদ খান বলেন, সিসি ক্যামেরার ফুটেজ তিনি হাতে পেয়েছেন কয়েক দিন আগে। সে সময় তিনি রিকশা গ্যারেজের মালিক তানজিলকে লিখিতভাবে অভিযোগ দিতে বলেছিলেন, কিন্তু দেননি। তিনি আরও বলেন, ফুটেজ পর্যালোচনা করে মনে হয়েছে, অভিযোগটি সত্য। বাদী লিখিত অভিযোগ না করলেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছেন বলে জানান এডিসি।

ডিসি ও এডিসির সঙ্গে সমকালের কথা হওয়ার কিছুক্ষণ পরই এসআই মাহফুজ, এএসআই রুবেল ও কনস্টেবল ইমামকে থানা থেকে ক্লোজ করে ডিসি অফিসে যুক্ত করা হয়েছে।

এসআই রুবেল শনিবার বলেছিলেন, 'ভুল হয়েছিল। সোর্স রহমান ইয়াবা খাওয়ার একটা ভুল ইনফরমেশন দিয়েছিল। ভাসমান সাইদুর তথ্য দিয়েছিল আরেক সোর্স রহমানকে। রহমান আমাদের ফোন দিয়ে বলছিল, রিকশা গ্যারেজের মালিকের ছেলে (রানা) ইয়াবা খায়। সেখানে গেলে ইয়াবার সরঞ্জাম পাইবেন। আমরা গিয়ে সরঞ্জাম পাইছিলাম।' পাঁচ হাজার টাকা ঘুষ নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'মাহফুজ স্যারের সঙ্গে আলোচনা করেন। দারোগা মাহফুজ, উনি আমাদের সঙ্গে গিয়েছিলেন।'

এসআই মাহফুজ বলেন, 'এটাও একটা ভুল ইনফরমেশন।' ফুটেজে টাকা নেওয়ার বিষয় স্পষ্ট- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, 'ভিডিও ফুটেজে যেটা দেখছেন, সেটা আসলে ওরাই এটা ইয়ে করছে, বুঝছেন।'

কামরাঙ্গীরচর থানার ওসি শাহীন ফকির বলেন, থানা থেকে অভিযানে গেলে তার অনুমোদন লাগে। কিন্তু ২২ জুন রিকশা গ্যারেজে অভিযান সম্পর্কে তিনি জানেন না। সাদা পোশাকে অভিযান করায় নিষেধাজ্ঞা আছে বলেও জানান তিনি।