সায়মা ধর্ষণ ও হত্যা

শিশুটিকে ছাদ দেখানোর কথা বলা হয়েছিল

গ্রেফতারের পর অভিযুক্ত হারুনের স্বীকারোক্তি

প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০১৯

সমকাল প্রতিবেদক

প্রতিবেশী পারভেজের মেয়ের সঙ্গে খেলত ছোট্ট শিশু সামিয়া আফরিন সায়মা। ঘটনার দিনও সে অষ্টম তলার ওই বাসায় যায়। তবে খেলার সাথি ঘুমিয়ে থাকায় ফিরে আসতে হয় তাকে। এ সময় লিফটে পারভেজের খালাতো ভাই হারুন অর রশিদের সঙ্গে দেখা হয় তার। ছাদ দেখানোর কথা বলে শিশুটিকে নয়তলার নির্মাণাধীন ফ্ল্যাটে নিয়ে যায় সে। সেখানে ধর্ষণের সময় চিৎকার করলে তার মুখ চেপে ধরা হয়। শ্বাসরোধের ফলে মেয়েটি নিস্তেজ হয়ে পড়ার পরও তার ওপর চালানো হয় পাশবিক নির্যাতন। পরে তাকে মৃত ভেবে গলায় রশির ফাঁস দিয়ে টেনে-হিঁচড়ে রান্নাঘরের সিঙ্কের নিচে ফেলে রাখা হয়। রাজধানীর ওয়ারীর বনগ্রামে ৬ বছরের ফুটফুটে শিশু সায়মাকে ধর্ষণের পর হত্যার এমনই রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছে হারুন।

এর আগে গতকাল রোববার কুমিল্লার তিতাসের ডাবরডাঙ্গা থেকে তাকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পরে তার স্বীকারোক্তির বরাত দিয়ে এসব তথ্য সাংবাদিকদের জানানো হয়। একই দিনে হারুন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। পরে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। হারুনকে গ্রেফতারের বিষয়ে জানাতে গতকাল দুপুরে  রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) আবদুল বাতেন বলেন, 'ছোট্ট শিশুটির সঙ্গে নির্দয়ভাবে, পশুর মতো আচরণ করে হারুন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে সবকিছু স্বীকার করেছে। এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত অমানবিক, বিকৃত রুচির পরিচায়ক ও মানবতাবিরোধী অপরাধ। দ্রুততম সময়ে এ মামলার চার্জশিট দেওয়া হবে এবং বিচার যেন নিশ্চিত হয়, সে লক্ষ্যে কাজ করবে পুলিশ।'

ডিবির এই শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, বনগ্রামের যে ভবনে সায়মা থাকত, সেই ভবনের অষ্টম তলায় থাকেন ব্যবসায়ী পারভেজ। দুই মাস ধরে তার রঙের দোকানে কাজ করে আসছিল হারুন। ওই বাসাতেই সে থাকত। এ কারণে তাকে চিনত শিশুটি। তাই সে যখন প্রলোভন দেখায়, শিশুটি তার সঙ্গে যায়।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আবদুল বাতেন বলেন, 'হারুন একাই এ ঘটনা ঘটিয়েছে। এতে অন্য কারও সংশ্নিষ্টতা নেই। আগে থেকে কোনো পরিকল্পনাও ছিল না। এখানে অন্য কোনো বিষয় থাকার সম্ভাবনা নেই।'

হঠাৎ করেই কেন নারী-শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো ঘটনা বেড়ে গেছে? এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, 'কেন ঘটছে- সমাজবিজ্ঞানীরা তার ভালো ব্যাখ্যা দিতে পারবেন। এটা নিয়ে গবেষণা হওয়া উচিত। তবে অপরাধবিজ্ঞান বলে, এ ধরনের ক্ষেত্রে ধর্ষণের পর যখন সেই ব্যক্তি বিষয়টি জানাজানি হওয়ার কথা চিন্তা করে, বুঝতে পারে- সে বাঁচতে পারবে না; সামাজিক ও আইনগতভাবে তাকে বিরাট চ্যালেঞ্জ ও শাস্তির মুখে পড়তে হবে, তখন সে হত্যার কথা চিন্তা করে। হত্যা বা হত্যার চেষ্টা চালায়। ধর্ষকদের মধ্যে এটি একটি সাধারণ প্রবণতা।'

এখন কেন এত ঘটনা ঘটছে- তার ব্যাখ্যা দিতে পারবেন না জানিয়ে ডিবির এ কর্মকর্তা বলেন, 'প্রত্যেক ঘটনায় নির্দিষ্ট ব্যক্তি এর জন্য দায়ী। শিক্ষা ব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা বা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো দুর্বলতার সুযোগে এমন ঘটছে, তা নয়।'

শুক্রবার সন্ধ্যায় খেলার কথা বলে বাসা থেকে বের হয়েছিল সিলভারডেল প্রিপারেটরি অ্যান্ড গার্লস হাই স্কুলের কেজির ছাত্রী সায়মা। এর পর অনেক সময় গড়ালেও সে আর ফিরে আসেনি। খোঁজাখুঁজির এক পর্যায়ে রাত সাড়ে ৮টার দিকে স্বজনরা গলায় ফাঁস দেওয়া অবস্থায় তার মৃতদেহ পান। এ ঘটনায় শিশুটির বাবা আবদুস সালাম বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে ওয়ারী থানায় মামলা করেন।

সহপাঠীদের মানববন্ধন, হত্যাকারীর শাস্তির দাবি :সায়মাকে ধর্ষণ-হত্যার প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছে তার সহপাঠীরা। গতকাল বেলা ১১টার দিকে স্কুলের সামনে অনুষ্ঠিত এ কর্মসূচিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ছাড়াও ছিলেন অভিভাবক ও স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটির নেতারা। পরে তারা স্কুলের চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন বাদলের নেতৃত্বে পুলিশের ওয়ারী বিভাগের উপ-কমিশনার বরাবর স্মারকলিপি দেন। এর আগে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ সভায় বক্তব্য দেন সায়মার বাবা আবদুস সালাম, স্কুল কমিটির সদস্য জাকির হোসেন, স্কুলের মাধ্যমিক শাখার প্রধান শিক্ষক সাইদুর রহমান সরকার, প্রাথমিক শাখার প্রধান শিক্ষক সামা আফরোজ প্রমুখ।

এদিকে নারীপক্ষ গতকাল এক বিবৃতিতে সায়মার হত্যাকারীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে নারী-শিশু সুরক্ষায় প্রতিটি বহুতল আবাসিক ভবনের বাসিন্দাদের নিয়ে বিশেষ কমিটি গঠন এবং যৌন হয়রানি নিরসনে হাইকোর্টের ২০০৯ সালের নির্দেশনা অনুযায়ী পৃথক আইন প্রণয়নের দাবি জানান নেতৃবৃন্দ।

এ ছাড়া সায়মার হত্যাকারীর শাস্তির দাবি জানিয়েছে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ ও নারী অধিকার আন্দোলন। গতকাল বনানীতে সংগঠনের কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সভায় এ দাবি জানানো হয়। সংগঠনের আহ্বায়ক রেহানা সালামের সভাপতিত্বে সভায় বক্তব্য দেন যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদা ফেরদৌস, নাজনীন সুলতানা লুনা, সদস্য সচিব নাসরিন সুলতানা, সদস্য সায়মা সুলতানা রিনি, প্রভাতী রানী রবিদাস, ফারহানা জান্নাত, প্রতিমা রানী রবিদাস, অধ্যাপক জাহানারা এস রাজিয়া, দেওয়ান মাসুদা সুলতানা, দিতি শীল চৈতী, তানিশা মাহমুদ সালাম, সেলিমা বেগম, শামীমা হ্যাপী, মোহাম্মদ জিলানী মজুমদার, মো. বাবলুর রশিদ, বাংলাদেশ ভূমি অধিকার সংরক্ষণ জাতীয় কমিটির আহ্বায়কের বিশেষ সহকারী মৃধা মো. আল-আমিন, বাংলাদেশ রবিদাস ফোরামের (বিআরএফ) মহাসচিব শিপন রবিদাস প্রাণকৃষ্ণ প্রমুখ।