কোচ স্টিভ রোডসকে অব্যাহতি বিসিবির

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০১৯

ক্রীড়া প্রতিবেদক

বিশ্বকাপ শেষ হতে না হতেই জাতীয় দলের প্রধান কোচ স্টিভ রোডসকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। মিডিয়া কমিটির চেয়ারম্যান জালাল ইউনুস জানান, দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেক্ষেত্রে চলতি মাসে শ্রীলংকা সফরেও থাকছেন না ইংলিশ এই কোচ।

বিশ্বকাপের লীগ পর্বের খেলা চলাকালে লন্ডনে বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন কয়েকজন বোর্ড পরিচালকের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেন। সেখানেই রোডসকে বিদায় করে দেওয়ার ব্যাপারে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয়। ২০২০ সালের টি২০ বিশ্বকাপ পর্যন্ত জাতীয় দলের প্রধান কোচ হিসেবে বিসিবির সঙ্গে চুক্তি ছিল তার। মেয়াদের প্রায় এক বছর আগেই বিদায় করে দেওয়া হলো তাকে। মূলত বাংলাদেশ দল বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনালে যেতে না পারায় এ সিদ্ধান্ত বিসিবির। এ ব্যাপারে জালাল ইউনুস বলেন, 'যেহেতু রোডসের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করা হয়েছে, সেহেতু তাকে শ্রীলংকা সফরে পাঠানো ঠিক হবে না। বিষয়টি কোচকে জানিয়েও দেওয়া হয়েছে। শ্রীলংকা সফরের জন্য নতুন কোচ কে হবেন, সে ব্যাপারে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আগামী ২০ বা ২১ জুলাই বোর্ডসভায় সেটা জানা যাবে।'

বিশ্বকাপের পরই এই ইংলিশ কোচকে ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও পাকিস্তানের বিপক্ষে লীগ পর্বের শেষ ম্যাচ খেলে ইংল্যান্ড থেকে দলের সঙ্গে রোববার ঢাকায় ফেরেন রোডস। গতকাল দুপুরে মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে জাতীয় দলের প্রধান নির্বাচক মিনহাজুল আবেদীন নান্নুর সঙ্গে শ্রীলংকা সফরের দল নির্বাচন নিয়ে বৈঠকও হয় তার। সন্ধ্যায়ই জানা যায়, কোচকে অব্যাহতি দিয়েছে বোর্ড। বিসিবির একজন প্রভাবশালী পরিচালক নাম গোপন রাখার শর্তে সমকালকে বলেন, প্রধান কোচ হিসেবে তাকে যে আর রাখা হবে না তা জানিয়ে দেওয়া হবে।' প্রশ্ন উঠেছে, দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার ভিত্তিতে হলে ইংল্যান্ড থেকে ঢাকায় ফিরবেন কেন রোডস? আগামী ২৬ জুলাই থেকে কলম্বোয় অনুষ্ঠেয় শ্রীলংকার বিপক্ষে তিন ম্যাচের দ্বিপক্ষীয় সিরিজ নিয়ে পরিকল্পনা করার কথা নয় তার। অথচ গতকাল বিকেল পর্যন্ত কোচ সবকিছু স্বাভাবিক নিয়মেই করে গেলেন।

বিসিবি পরিচালক ও জাতীয় দলের ম্যানেজার খালেদ মাহমুদ সুজনের মতে, 'বুকিশ কোচ' রোডস। কিতাবি কোচ হওয়া দোষের নয়। কিন্তু এই ইংলিশ কোচের বড় দুর্বলতা 'অতিশয় ভদ্রলোক'। তাকে কোনো বিষয়েই প্রতিবাদ বা উচ্চবাচ্য করতে দেখা যায় না; বরং সমঝোতা আর পারস্পরিক বোঝাপড়ার মধ্যেই কাজ করতে পছন্দ করেন তিনি। তবে ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ চলাকালেই রোডসের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, গেম প্ল্যানেও খুব একটা সম্পৃক্ত হন না তিনি। ভিডিও অ্যানালিস্ট শ্রীনিবাস চন্দ্রশেখরনের ওপর পরিকল্পনার দায়িত্ব ছেড়ে দেন। ভারতীয় এই ভিডিও অ্যানালিস্টের দেওয়া 'গেম প্ল্যানে' শুধু সম্মতি জানান তিনি। এই কোচকে নিয়ে ক্রিকেটাররাও দ্বিধাবিভক্ত। এজন্য তাকে বাদ দিয়ে চন্ডিকা হাথুরুসিংহের মতো একজন অভিভাবক কোচ চায় বিসিবি। নতুন কোচ নিয়োগের ক্ষেত্রে চটপটে এবং শাসক ধরনের একজনকে খোঁজা হচ্ছে। যদিও বিসিবি পরিচালক খালেদ মাহমুদ জানান, শ্রীলংকা সফরের আগেই নতুন কোচ নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে কে সেই নতুন কোচ, এ সম্পর্কে কিছু বলতে রাজি হননি তিনি। শ্রীলংকা সফরের আগে কোচ নিয়োগের জন্য ১২ দিন সময় পাচ্ছে বিসিবি। এত অল্প সময়ে নতুন কোচ নিয়োগ দেওয়া সম্ভব নাও হতে পারে। সেক্ষেত্রে আপৎকালীন কোচ দিয়ে এ সফরটি চালিয়ে নেওয়া হবে বলে জানান জালাল ইউনুস।

যদিও খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রোডসকে হঠাৎ বিদায় করে দেওয়ায় বিসিবি পরিচালকদের একটা অংশ অসন্তুষ্ট। প্রধান কোচকে আরও কিছুদিন সময় দেওয়ার পক্ষে ছিলেন তারা। এজন্য বিসিবি সভাপতিকেও তাদের কেউ কেউ অনুরোধ করেছিলেন। এক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত প্রভাবশালী পরিচালকরাই জয়ী হলেন। অথচ রোডস দায়িত্ব নেওয়ার পর ভালোই খেলছিল বাংলাদেশ। ৩০টি ওয়ানডে ম্যাচ খেলে জেতে ১৭টিতে। আটটি টেস্ট ম্যাচের তিনটিতে জেতে রোডসের দল। উইন্ডিজের বিপক্ষে দুটি টি২০ সিরিজে ছয়টি ম্যাচ খেলে তিনটি করে হার-জিত বাংলাদেশের।

২০১৮ সালের ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে তিন ম্যাচ ওয়ানডে সিরিজ ২-১-এ আর টি২০ সিরিজ ২-১ ব্যবধানে জেতে। তার অধীনে এশিয়া কাপের ফাইনাল খেলে টাইগাররা। সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনুষ্ঠিত এই টুর্নামেন্টে শ্রীলংকা ও পাকিস্তানের মতো দলকে হারিয়ে ফাইনালে উন্নীত হয়। দেশের মাটিতে গত অক্টোবরে তিন ম্যাচ ওয়ানডে সিরিজে জিম্বাবুয়েকে হোয়াইটওয়াশ করে। নভেম্বর ডিসেম্বরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে ওয়ানডে সিরিজে ২-১ ব্যবধানে জিতলেও টি২০ সিরিজ ২-১ ম্যাচে হেরে যায়। এ বছর ফেব্রুয়ারিতে নিউজিল্যান্ড সফরে তিন ম্যাচের সিরিজে হোয়াইটওয়াশ হলেও বিশ্বকাপের আগে আয়ারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত তিন জাতি টুর্নামেন্টের শিরোপা জেতে। বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে যেটি বড় অর্জন। কারণ এই প্রথম বহুজাতিক ক্রিকেট টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয় টাইগাররা। বিশ্বকাপে প্রত্যাশিত সাফল্য না পেলেও তিনটি ম্যাচ জেতে। তবে এই কোচের অধীনে গত এক বছরে টেস্ট ক্রিকেটে খুব একটা সফল হতে পারেনি বাংলাদেশ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে অ্যাওয়ে এবং হোম সিরিজ খেলে একটিতে জেতে। জিম্বাবুয়ে বিপক্ষে দুই ম্যাচের সিরিজ ১-১ ব্যবধানে ড্র হয়। আর নিউজিল্যান্ডের কাছে দুই টেস্ট হেরে যায়।

এত ভালো করার পরও গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেলেন না রোডস। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই তাকে বিদায় করে নতুন কোচের সন্ধান করছে বিসিবি। এ তালিকায় জাতীয় দলের সাবেক দুই কোচ শ্রীলংকা চান্ডিকা হাথুরুসিংহে ও জেমি সিডন্সের নাম শোনা যাচ্ছে। বিসিবি সূত্রে জানা গেছে, বোর্ডের প্রভাবশালী পরিচালকদের প্রথম পছন্দ হাথুরুসিংহে। বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল না খেলতে পারায় তাকেও লংকান ক্রিকেট বোর্ড বিদায় দেওয়ার চিন্তাভাবনা করছে। অথচ এ হাথুরুসিংহেই ২০১৭ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা সফর চলাকালে জাতীয় দলের কোচের পদ থেকে পদত্যাগ করে শ্রীলংকার চাকরিতে যোগ দেন। এই কোচকে আবার নিয়োগ দেওয়া নিয়ে বোর্ড পরিচালকরা দুই ভাগে বিভক্ত। ক্রিকেট খেলেছেন এমন পরিচালকরা চান না হাথুরুসিংহেকে নিয়োগ দেওয়া হোক। অক্রিকেটীয় পরিচালকরা চান এই কোচকে। আর তারাই বোর্ডে ক্ষমতাধর।

জাতীয় দলের কোচিং স্টাফের বিদায়ের তালিকায় রোডস ছাড়াও পেস বোলিং কোচ কোর্টনি ওয়ালশ আর ফিজিও থিহান চন্দ্রমোহনও রয়েছেন। ওয়ালশের সঙ্গে দুই বছরের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে না বিসিবি। ২০১৬ সালে আগস্টে বিসিবির চাকরিতে যোগ দেন ওয়ালশ। চুক্তির মেয়াদ ছিল ২০১৯ বিশ্বকাপ পর্যন্ত। তার ব্যাপারে বিসিবির প্রধান নির্বাহী নিজামউদ্দিন চৌধুরী রোববার জানান, ক্যারিবীয় সাবেক এ ফাস্ট বোলারের সঙ্গে নতুন করে আলোচনায় যাবেন না তারা। তবে বিসিবি পরিচালক খালেদ মাহমুদ জানান, স্পিন কোচ সুনীল যোশিকে রেখে দেওয়ার পক্ষে তারা। জাতীয় দলের সাবেক ফিজিও দক্ষিণ আফ্রিকার বিভব সিংকে নতুন করে নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। ব্যাটিং কোচ দক্ষিণ আফ্রিকার নিল ম্যাকেঞ্জি, ভারতীয় ভিডিও অ্যানালিস্ট শ্রীনিবাস ও ফিল্ডিং কোচ রায়ান কুককে রেখে দিচ্ছে বিসিবি। চুক্তি নবায়ন হলেও ম্যাকেঞ্জি ও কুক শ্রীলংকা সফরে নাও যেতে পারেন।