ভারতকে বাড়ি পাঠিয়ে ফাইনালে নিউজিল্যান্ড

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০১৯

সঞ্জয় সাহা পিয়াল ম্যানচেস্টার থেকে

ভারতকে বাড়ি পাঠিয়ে ফাইনালে নিউজিল্যান্ড

টানা দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত। কিউইদের উল্লাস থামছিল না ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে - সংগৃহীত

রোমান্সে ভরা বলিউডি বিশ্বকাপ চিত্রনাট্যই সাজিয়ে রেখেছিল ভারত। সেখানে হিন্দি সিরিয়ালের মতো কিছু অতিনাটক ছিল বটে; কিন্তু অ্যাকশন থ্রিলারের জায়গা ছিল না! লর্ডসের বারান্দায় বিরাট কোহলি কাপ হাতে তিরাশির কপিল হবেন, বিশ্বকাপ জিতে দেশে ফিরবেন- সাজানো এসব সেটে হঠাৎ করেই হলিউডি অ্যাকশন দেখিয়ে দিল কিউইরা। ওল্ড ট্র্যাফোর্ডের সকালে ম্যাট হেনরিই হয়ে উঠলেন ওয়েস্টার্ন ছবির রাসেল ক্রো! তার হাত থেকে বেরোনো গোলাতেই রোহিত শর্মা, কে এল রাহুল আর দিনেশ কার্তিকরা তখন আহত ও বিধ্বস্ত। এর আগে কোহলির বরফশীতল পায়ে পেরেক ঠুকে দিয়েছিলেন ট্রেন্ট বোল্ট। ৫ রানে ৩ আর ২৪ রানে ৪ উইকেট- বলিউডি সেটে তখন হরর মুভি! নীল-আকাশি গ্যালারি তখন যেন এক কালো আয়না! শেষদিকে অবশ্য রবীন্দ্র জাদেজার ৭৭ রানের ইনিংসের সঙ্গে ব্যাটকে তলোয়ার বানিয়ে নাচানোর দৃশ্য উপভোগ করেছিল ভারতীয় গ্যালারি। লড়াকু ধোনির সংগ্রামটাও প্রশংসিত হয়েছিল। একটা সময় ১৮ বলে ৩৭ রানের আইপিএলের হিসাবও চলে এসেছিল! কিন্তু সবকিছুর পরে এটা আইপিএল নয়, ছিল বিশ্বমঞ্চের সেমিফাইনাল। যেখানে স্নায়ু আর মস্তিস্কের লড়াইয়ে কিউইরাই জয়ী। তাদের ২৪০ রানের লক্ষ্য আর তাড়া করতে পারেনি ভারত, ১৮ রানের হার নিয়েই ম্যানচেস্টার থেকে আজ মুম্বাই ফিরছেন কোহলিরা। আর টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলার গৌরব সঙ্গে করে লন্ডন যাচ্ছেন উইলিয়ামসনরা।

কিউইদের কাছে এভাবে নকআউটে এসে যে পাঞ্চ খেতে হবে, তা বোধহয় ঘুণাক্ষরেও ভাবেননি কোহলিরা। বরং ভারতীয় সাংবাদিকদেরই কেউ কেউ কানাঘুষা করেন, সেমিতে এই কিউইদের পেতেই ইংল্যান্ডের সঙ্গে ম্যাচটি কৌশলী হয়ে খেলেছিলেন কোহলিরা। এবারের আসরে ওই একটি ম্যাচই হেরেছিল ভারত। রোহিত শর্মা একাই ভারতের জয়রথ ছুটিয়ে যাচ্ছিলেন। একটা ভ্রম তৈরি করে রেখেছিলেন তিনি। বিশ্বকাপের ম্যাচগুলোতে কখনও ভারতের মিডল অর্ডারকে পরীক্ষায় পড়তে হয়নি রোহিতের কারণে। সে কারণে গতকাল যখন রোহিত শর্মা ১ রান করে আউট হয়ে যান, পরের ওভারে বিরাট কোহলিও ১ রানে এলবিডব্লিউ; তখন ভেতরের হতবিহ্বল ভারতীয় মিডল অর্ডারের পা কাঁপা শুরু হয়। আগের দিন বৃষ্টিতে আট ঘণ্টা ঢেকে থাকা পিচ, তার সঙ্গে কিউই পেসারদের ঘণ্টায় ১৪৬ কিলোমিটার বেগে করা বল, সঙ্গে সুইং- ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের পাতে এসব চিরকালই উচ্ছের মতো তেতো! চলতি বিশ্বকাপে এ অবস্থায় এর আগে সেভাবে কখনও পড়তে হয়নি তাদের। এক রোহিত শর্মাই শুরুর পঁচিশ-ত্রিশ ওভার খেলে দিয়েছেন। কিন্তু এদিন সেই রোহিত দ্বিতীয় ওভারেই ক্যাচ তুলে দেন উইকেটের পেছনে। অ্যাঙ্গেল করে বোলিং করায় সুবিধাটা পান হেনরি। এরপর স্লিপ বাড়িয়ে দেন তিনি। ফলও পেয়ে যান কে এল রাহুলকে আউট করে। গত বছর ঠিক একইভাবে বাংলাদেশের বিপক্ষেও ঘরের মাঠে অনেক উইকেট পেয়েছিলেন এই হেনরি। এদিন তার বোলিং দেখে ওই স্মৃতিগুলোই মনে পড়ছিল।

এই বিশ্বকাপে ভারতের টপ অর্ডারের তিনজন ছাড়া মিডল অর্ডার যেন 'তিলে খাজা'র মতো- মজা করেই বলে থাকেন কলকাতার সাংবাদিকরা। সেমিফাইনালের স্নায়ুর লড়াইয়ে সে কথাটিই প্রমাণ হলো। পঞ্চম উইকেটে ঋষভ পান্থ আর হার্দিক পান্ডিয়া মিলে ৪৭ রানের জুটি গড়েছিলেন বটে; কিন্তু বিশ্বকাপে এমন একটি ডু অর ডাই ম্যাচ উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়ার মতো অভিজ্ঞতার ঘাটতি ছিল ঋষভের, কিউই স্পিনারের বাউন্ডারির লোভে পা দিয়ে ৩২ রানে আউট হয়ে যান ঋষভ। আর আইপিএল তারকা হার্দিক পান্ডিয়াও একই ভুল করে আউট হয়ে যান ওই ৩২ রান করেই।

এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে মহেন্দ্র সিং ধোনিকে ৭ নম্বরে নামানোয় ভারতীয় সাংবাদিকদের কেউ কেউ কোচ রবি শাস্ত্রীকে দুষেছেন। কঠিন পরিস্থিতিতে মাথা ঠাণ্ডা রেখে বহুবার দলকে উদ্ধার করেছেন, এটাই তার শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ- নায়ক হওয়ার সুযোগ ছিল এই ধোনির সামনেও। কিন্তু ওই যে রবি শাস্ত্রীর বলিউডি স্ট্ক্রিপ্ট- শুরুতে রোহিত শর্মা আর কোহলিকে দিয়ে মিষ্টি মিষ্টি গল্পের শুরু, মাঝে ঋষভ-পান্ডিয়াদের দিয়ে গল্প টেনে যাওয়া এবং শেষদিকে জাদেজা আর ধোনির ধামাকা! দু'জনের এ জুটিতে ১১৬ রান এসেছিল। চারপাশ থেকে আসা চাপ জাদেজা ডাউন দ্য উইকেটে এসে বাউন্ডারির বাইরে পাঠিয়ে দিচ্ছিলেন। লংঅন আর লংঅফের দিকটাতে বেশ সাবলীল ছিলেন তিনি। সঙ্গে মহেন্দ্র সিং ধোনি ছিলেন সতর্কভাবে। আগের মতো সেভাবে আর স্লগে এসে বাউন্ডারি হাঁকাতে পারেন না সদ্য আটত্রিশে পা রাখা ধোনি। তার পরও ফার্গুসনকে যেভাবে ছক্কা হাঁকিয়েছিলেন তিনি, মনে হচ্ছিল ২০১১ ফাইনালের সে দৃশ্যটিই না আবার রিপ্লে চলে আসে। ৪৫ থেকে ৪৭ ওভারে ২৫ রান নিয়েছিলেন দু'জনে মিলে। ওই জুটি ভাঙাই ছিল কিউইদের শেষ চ্যালেঞ্জ। শেষ পর্যন্ত বোল্টকে এনেই জাদেজাকে ফিরিয়ে নেন উইলিয়ামসন। ১৪ বলে ৩৩ রানের প্রয়োজন- ছক্কা মারতেই হতো তাকে এবং তাতেই ৫৯ বলে ৭৭ রানের ইনিংসটি শেষ হয়ে যায় জাদেজার। বাকি ছিলেন কেবল ধোনি; ভুবনেশ্বরকে নিয়ে সিঙ্গেলটাই ডাবলস বানাতে চেয়েছিলেন। স্ট্রাইক নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু গাপটিলের ত্বরিত থ্রোতে রান আউট হয়ে যেতে হয় ধোনিকে। ব্যাট হাতে কিছু করতে না পারলেও এই রান আউটটা দিয়েই দলকে যেন সেমিতে পৌঁছে দেন গাপটিল। ধোনির বিদায়ের পরই নিশ্চিত হয়ে যায় ১৪ জুলাইয়ের ফাইনালে নিউজিল্যান্ডই যাচ্ছে।

কিন্তু ভারতকে খুব গভীরভাবে পর্যালোচনা করেই এবারের সেমিফাইনাল খেলতে নেমেছিল কিউইরা। তারা জানত, বোলিংয়ের যে বারুদ আছে তাদের হাতে, তা দিয়ে ভারতকে ঘায়েল করা সম্ভব। এ জন্য কোনোভাবে আড়াইশ'র কাছাকাছি যেতে পারলেই হলো। তাদের সেই সেমির রণকৌশলের সঙ্গে বৃষ্টিও যেন আশীর্বাদ হয়ে এসেছিল। আগের দিন যে মেজাজে ভারত শুরু করেছিল, সেই মেজাজটাই নাকি হারিয়ে যায়- কেউ কেউ তো ম্যানচেস্টারকে 'রেইনস্টার' বলেও ব্যঙ্গ করছেন। বিশ্বকাপজুড়ে সাফল্যের যে আস্টম্ফালন ভারতীয় সমর্থকদের, তাতে সায় দেওয়া ছাড়া বাকিদের খুব বেশি কিছু করারও ছিল না। বাকিদের বিদায়ের যন্ত্রণাটা এতদিন হয়তো অনুভব করেননি কোহলিরা; গতকাল কিন্তু ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে গ্যালারির দিকে হাত বাড়াতে বাড়াতে বেরিয়ে যাওয়ার সময় কোহলিকে বিষণ্ণতা আর গ্লানির মধ্যে ঘুরপাক খাওয়া এক উদ্‌ভ্রান্তের মতো মনে হয়েছে। অথচ ম্যাচ শুরুর আগেও যিনি হাসতে হাসতে বলেছিলেন, আর তো দুটো ম্যাচ! দুটো নয়, আরও চার বছর অপেক্ষা করতে হবে ভারতকে। নিজেদের দেশের বিশ্বকাপের জন্য।