পুলিশের দাবি

জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন মিন্নি

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০১৯

বরগুনা প্রতিনিধি

বরগুনার পুলিশ সুপার (এসপি) মারুফ হোসেন দাবি করেছেন, আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডে তার স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি জড়িত রয়েছেন বলে স্বীকার করেছেন। পুলিশ সুপার বলেন, মিন্নি এই হত্যা পরিকল্পনার একটি অংশ। হত্যার আগে-পরে আসামিদের সঙ্গে মিন্নির যোগাযোগ ছিল। হত্যা পরিকল্পনার বৈঠকেও মিন্নি উপস্থিত ছিলেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে নিজ কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে পুলিশ সুপার আরও বলেন, মিন্নি এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন বলেই তার বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করার জন্য তাকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।

এদিকে, মিন্নিকে আইনি সহায়তা না দেওয়ার ব্যাপারে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য পাওয়া গেছে। বরগুনা জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য অ্যাডভোকেট সুনাম দেবনাথ তার ফেসবুক আইডিতে রিফাত হত্যায় জড়িতদের আইনি সহায়তা না দিতে অনুরোধ করে গত ২৭ জুন একটি পোস্ট দেন। ওই পোস্টে প্রভাবিত হয়ে কোনো আইনজীবী মিন্নিকে আইনি সহায়তা দেননি, নাগরিক সমাজ ও মিন্নির পরিবারের পক্ষ থেকে এমন অভিযোগ ওঠে।

পুলিশ সুপার বলেন, আসামি টিকটক হৃদয়সহ রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা সব আসামিই এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মিন্নির সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছে। পুলিশ সুপার জানান, মামলার প্রধান আসামি নয়ন বন্ডের বাসা থেকে মিন্নির ব্যবহার্য জিনিসপত্র উদ্ধার করা হয়েছে। নয়ন বন্ডের সঙ্গে মিন্নির যোগাযোগের বিষয়টি তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে ধরা পড়েছে এবং তিনি তা স্বীকারও করেছেন।

নয়ন বন্ডদের যারা প্রশ্রয় দিয়েছেন, তাদের কী হবে- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে এসপি বলেন, 'যাদেরই এ হত্যাকাে র সঙ্গে সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, তাদেরই আইনের আওতায় আনা হবে।' পুলিশ কোনো রাজনৈতিক চাপের মধ্যে আছে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'পুলিশ কোনো চাপের মধ্যে নেই।'

পুলিশের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার দাবি, ঘটনার দিন কলেজে একটি বৈঠক হয়। সেখানে রিফাত শরীফের ওপর হামলার বিষয়টি নিয়ে সর্বশেষ আলোচনা হয়েছিল। ওই বৈঠকে মিন্নি উপস্থিত ছিলেন। তবে রিফাতকে হত্যার পরিকল্পনা ছিল না। তাকে মারধর করার কথা ছিল। কিন্তু নয়ন বন্ড ও রিফাত ফরাজী ধারালো অস্ত্র দিয়ে মিন্নির স্বামীকে খুন করে বসে। ওই কর্মকর্তা আরও দাবি করেন, ঘটনার আগের দিন মিন্নির নয়ন বন্ডের বাসায় যাওয়া ও তার সঙ্গে কথোপকথনের ব্যাপারটি নিয়ে রিফাত শরীফের সঙ্গে তার ঝগড়া হয়। এ ঘটনা নিয়ে রিফাত মিন্নিকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে রিফাত শরীফকে 'ছোট শাস্তি' দিতে চেয়েছিলেন মিন্নি। তবে পুলিশ কর্মকর্তার তথ্য অন্য নিরপেক্ষ সূত্র থেকে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

রিশান ফরাজী গ্রেফতার :রিফাত হত্যা মামলার তিন নম্বর আসামি রাশিদুল হাসান রিশান ওরফে রিশান ফরাজীকে গতকাল গ্রেফতার করেছে পুলিশ। পুলিশ সুপার মারুফ এ তথ্য জানান। তবে কোন জায়গা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ কিছুই জানায়নি। পুলিশ সুপার জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বরগুনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাহজাহান হোসেনের নেতৃত্বে অভিযান পরিচালনা করে রিশানকে গ্রেফতার করা হয়। রিশান মামলার দুই নম্বর আসামি রিফাত ফরাজীর ছোট ভাই।

এ মামলায় এখন পর্যন্ত ১৫ আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং মামলার এক নম্বর আসামি নয়ন বন্ড পুলিশের সঙ্গে 'বন্দুকযুদ্ধে' নিহত হয়েছে। এদিকে হত্যা মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি রাব্বী আকন ও সন্দেহভাজন আসামি আরিয়ান শ্রাবণ দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। গতকাল বিকেলে তাদের বরগুনার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হলে হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। এ মামলায় এখন পর্যন্ত ১২ জন আসামি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বরগুনা থানার পরিদর্শক হুমায়ুন কবির এ তথ্য জানিয়েছেন।

মিন্নির পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ নিয়ে পরস্পরকে দোষারোপ :মিন্নির পক্ষে আদালতে কোনো আইনজীবী না থাকার বিষয়ে এক পক্ষ আরেক পক্ষকে দোষারোপ করছে। মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর দাবি করেন, তিনি মিন্নিকে আইনি সহায়তা দেওয়ার জন্য অ্যাডভোকেট জিয়া উদ্দীন, গোলাম সরোয়ার নাসির ও গোলাম মোস্তফা কাদেরকে নিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু আদালতে কেউই তার মেয়ের পক্ষে কথা বলেননি। তিনি আরও কয়েকজন আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলেছেন তার মেয়েকে আইনি সহায়তা দেওয়ার জন্য। কিন্তু তারা বলেছেন, তাদের পক্ষে মিন্নিকে আইনি সহায়তা দেওয়া সম্ভব নয়। মিন্নির বাবার দাবি, কোনো প্রভাবশালী অথবা ক্ষমতাসীন লোকের কারণে তার মেয়ের পক্ষে কোনো আইনজীবী আদালতে কথা বলতে পারেননি। আইনজীবী জিয়া উদ্দীন জানান, মিন্নির বাবা তার কাছে আইনি সহায়তা চেয়েছেন, তিনি তাকে আইনি সহায়তা দেওয়ার কথাও বলেছেন। তবে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দিতে না পারায় আদালতে দাঁড়াতে পারেননি। তবে মিন্নির বাবার কাছ থেকে কোনো টাকা-পয়সা নেননি তিনি। মিন্নির বাবার দাবি, কী ধরনের কাগজপত্র লাগবে, তা তিনি জানেন না। তারা তাকে পরামর্শ দিলে সেভাবে কাজ করতেন।

বরগুনা জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাহবুবুল বারি আসলাম বলেন, আসামির পক্ষে আইনি সহায়তা দেওয়া হবে না- এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত তাদের সমিতিতে হয়নি। আইনি সহায়তা পাওয়া একজন নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। কোনো আইজীবী নিয়োগ না করেও লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে বিচারপ্রার্থী আইনি সহায়তা পেতে পারেন। মিন্নির বাবাকে কোনো আইনজীবী আশ্বাস দিয়ে পরে অনুপস্থিত থাকলে তারা অবশ্যই ব্যবস্থা নেবেন।

মিন্নিকে আইনি সহায়তা না দেওয়ার ওই পোস্ট আইনজীবীদের প্রভাবিত করেছে কি-না জানতে চাইলে সুনাম দেবনাথ বলেন, ওই স্ট্যাটাসটি দেওয়ার সময় মিন্নি মামলার এক নম্বর সাক্ষী ছিলেন। আর তিনি ঘটনায় জড়িতদের আইনি সহায়তা না দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের অনুরোধ জানিয়েছিলেন। তার মানে এই নয় যে, কেউ আসামিদের সহায়তা দিতে পারবে না বা বাধ্যবাধকতা ছিল। এটা তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রপাগান্ডা ছাড়া আর কিছুই না।

মিন্নির পক্ষে আইনজীবী না থাকার পেছনে পুলিশের কোনো বাধা ছিল কি-না, জানতে চাইলে এসপি মারুফ বলেন, মিন্নির পরিবার চাইলে আদালতের সহায়তা নিয়ে আইনজীবী নিয়োগ দিতে পারতেন। তার জানামতে, তিনি আদালতের শরণাপন্ন হননি।