বরগুনায় রিফাত হত্যা

মিন্নির সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করছেন আইনজীবীরা

আইনজ্ঞদের মত

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০১৯

আবু সালেহ রনি

মিন্নির সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করছেন আইনজীবীরা

আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি

বরগুনায় চাঞ্চল্যকর রিফাত শরীফ হত্যা মামলার প্রধান সাক্ষী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নিকে গ্রেফতারের পর আদালতে হাজির করা হলেও তাকে আইনি সহায়তা দেননি কোনো আইনজীবী। মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন অভিযোগ করেছেন, প্রভাবশালী মহলের চাপে বরগুনার কোনো আইনজীবী তার মেয়ের পক্ষে লড়তে রাজি নন। এমন প্রেক্ষাপটে বিশিষ্ট আইনজীবীরা বলছেন, আদালতে মিন্নির পক্ষে কোনো আইনজীবী না দাঁড়ানো সাংবিধানিক ও নাগরিক অধিকারের লঙ্ঘন। এমনকি বরগুনার সংশ্নিষ্ট আইনজীবীরা পেশাগত অসদাচরণ করেছেন বলেও তাদের অভিযোগ।

নাগরিকের আইনগত সহায়তা পাওয়ার বিষয়ে সংবিধানের ৩৩ (১) অনুচ্ছেদে বলা আছে, 'গ্রেফতারকৃত কোনো ব্যক্তিকে যথাসম্ভব শীঘ্র গ্রেফতারের কারণ না জানিয়ে তাকে প্রহরায় আটক রাখা যাবে না এবং ওই ব্যক্তিকে তার মনোনীত আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শের ও তার দ্বারা আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার হতে বঞ্চিত রাখা যাবে না।' এর পরও বুধবার মিন্নির পক্ষে আদালতে কোনো আইনজীবী না দাঁড়ানোর ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকসহ বিভিন্ন মহলে সমালোচনা শুরু হয়। এমনকি বিশিষ্ট আইনজ্ঞরাও সমকালের সঙ্গে আলাপচারিতায় বরগুনার আইনজীবীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা বলেছেন, মিন্নির পরিবার চাইলে প্রয়োজনে উচ্চ আদালতের আইনজীবীরা বরগুনায় গিয়ে তাকে আইান সহায়তা দেবেন।

সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, কেউ যদি আইনগত সহায়তা চায়, তাহলে তার পক্ষে আদালতে আইনি সহায়তা দেওয়া আইনজীবীর নৈতিক দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে আইনি সহায়তা চাওয়ার পরেও যদি কোনো আইনজীবী মিন্নিকে তা দিতে অস্বীকৃত হন, তাহলে মিন্নি বা তার পরিবার সংশ্নিষ্ট আইনজীবীর বিরুদ্ধে বার কাউন্সিলের ট্রাইব্যুনালের শরণাপন্ন হতে পারেন বা আদালতকেও বিষয়টি জানাতে পারেন। আদালত অবশ্যই যথাযথ আদেশ দেবেন। নয়তো মিন্নির পরিবার আদালতের অনুমতি নিয়ে উচ্চ আদালতের আইনজীবীদেরও তার পক্ষে নিয়োগ দিতে পারেন। তার মতে, যদি মিন্নির বিরুদ্ধে বিচার শুরু হয় এবং তখন তার পক্ষে আইনজীবী না পাওয়া গেলে আদালত অবশ্যই রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী নিয়োগ করবেন; এটাই আইনের বিধান।

বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদ অনুসারে প্রত্যেক নাগরিকের আদালতে আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করা বা সহায়তা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। তাই মিন্নিরও আইনজীবীর পাওয়ার অধিকার রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বরগুনার আদালতের আইনজীবীরা যদি একাট্টা হয়ে মিন্নির পক্ষে আইনি সহায়তা দিতে অস্বীকৃতি জানান, তাহলে তা হবে সংশ্নিষ্ট আইনজীবীদের পেশাগত অসদাচারণ। ওই আইনজীবীদের বিরুদ্ধে মিন্নি বা তার পরিবারে কেউ বার কাউন্সিলের ট্রাইব্যুনালে আবেদন করলে তাদের পেশাগত আইনজীবী সনদ ট্রাইব্যুনালের রায়ে বাতিলও হতে পারে। এমন নজির অতীতে রয়েছে। তার মতে, মিন্নিকে আইনি সহায়তা না দিয়ে তার সাংবিধানিক অধিকার যেমন আইনজীবীরা ক্ষুণ্ণ করছেন, তেমনি আইনজীবী পেশাগত অসদাচরণের দায়েও অভিযুক্ত হতে পারেন। শাহদীন মালিক আরও বলেন, আইনজীবীদের এমন অবস্থানের মধ্যেই যদি রিফাত হত্যা মামলার বিচার শেষ হয়, তাহলে মিন্নি আদালতে দোষী হলেও তা উচ্চ আদালতে বাতিল হওয়ার শঙ্কা তৈরি হতে পারে। কারণ তখন মিন্নির পক্ষে ন্যায়বিচার ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ আনা হবে।

জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সাবেক নির্বাহী পরিচালক সালমা আলী বলেন, কোনো কারণে একজন নাগরিক আইনগত সহায়তা না পেলে তার জন্য আইনগত সহায়তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এটি যেমন আমাদের সংবিধানে আছে, সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্টের অনেক রায়ে রয়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিক আইনের অনেক ধারাতেও স্পষ্ট বর্ণিত রয়েছে। এখন চাঞ্চল্যকর রিফাত হত্যা মামলায় মিন্নির পক্ষে কোনো আইনজীবী না থাকলে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য বা স্বচ্ছ বিচার হিসেবে গৃহীত হবে না। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে মিন্নির পক্ষে আদালতে আইনজীবীরা দাঁড়াচ্ছেন না- মিন্নির বাবার এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে সালমা আলী বলেন, এ অভিযোগ যদি সত্য হয় তাহলে সুশাসন ব্যাহত হবে। গণতান্ত্রিক দেশে এমন অভিযোগও হতাশাজনক। সরকার অবশ্যই ন্যায়বিচারের স্বার্থে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেবে।

মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বলেন, আইনজীবী পাওয়ার অধিকার সবারই আছে। সে ক্ষেত্রে মিন্নিকে এ অধিকার পেতে বাধা দেওয়া হচ্ছে কিনা, তা দেখতে হবে। যদি এমন হয়, তাহলে অবশ্যই আদালতকে ন্যায়বিচারের জন্য মিন্নির পক্ষে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী নিয়োগ দিতে হবে। তার মতে, মিন্নির পক্ষে আইনজীবী না পাওয়ার দুটি কারণ হতে পারে। এক. রিফাত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জনগণের মধ্যে নিহতের বিষয়ে ব্যাপক সহানুভূতি দেখা দিয়েছে। এই সহানুভূতির বিরুদ্ধে গিয়ে আইনজীবীরা হয়তো মিন্নির পক্ষে যেতে চাইছেন না। দুই. মিন্নিকেই হয়তো বিচারের আগে দোষী হিসেবে দায় দিচ্ছেন আইনজীবীরা। এর পেছনে স্থানীয় প্রভাবও থাকতে পারে। তবে বিচার শেষ হওয়ার আগে মিন্নিকে কোনোভাবেই অপরাধী বলা উচিত নয়। তিনি বলেন, পুলিশি তদন্ত ও বিচারেই প্রমাণ হবে- রিফাত হত্যাকাণ্ডে অপরাধী কারা।