দুর্নীতির ১১ উৎস ওয়াসায়

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০১৯

সমকাল প্রতিবেদক

ঢাকা ওয়াসায় দুর্নীতির ১১ উৎস চিহ্নিত করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ওয়াসায় অনিয়ম, দুর্নীতি নিয়ে কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবেদন বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী (এলজিআরডি) মো. তাজুল ইসলামের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেন দুদক কমিশনার (অনুসন্ধান) ড. মো. মোজাম্মেল হক খান।

ওইসব অনিয়ম, দুর্নীতি দূর করতে প্রতিবেদনে ১২টি সুপারিশ করা হয়েছে। ধারাবাহিকভাবে সরকারের সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্নীতি-সংক্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবেদন পেশের অংশ হিসেবে গতকাল ঢাকা ওয়াসার প্রতিবেদন পেশ করা হয়।

প্রতিবেদন হস্তান্তর শেষে দুদক কমিশনার সাংবাদিকদের বলেন, তারা ওয়াসা নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক অনুসন্ধানে দেখতে পান, এই সংস্থার ১১টি পর্যায়ে দুর্নীতি হওয়ার সুযোগ রয়েছে। সম্ভাব্য ওইসব দুর্নীতি বন্ধে ১২টি সুপারিশ পেশ করা হয়েছে। দুদক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে দুর্নীতির উৎসগুলো চিহ্নিত করে থাকে। ওইসব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদন তৈরি করা হয়।

তিনি আরও বলেন, এলজিআরডি মন্ত্রীকে দুর্নীতির উৎসগুলো অবহিত করা হয়েছে। এতে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা নজরদারি জোরদার করতে পারবেন। উল্লিখিত দুর্নীতির উৎসগুলোর দিকে নজর দেওয়া হলে সম্ভাব্য দুর্নীতি করার সুযোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।

দুর্নীতির ১১ উৎস :প্রকল্প কাজে অনিয়ম-দুর্নীতি করার লক্ষ্যে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না করে বিভিন্ন অজুহাতে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা ও ব্যয় বাড়ানো হয়। এক্ষেত্রে প্রকল্প পরিচালকসহ প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট প্রকৌশলী ও ওয়াসার ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সংশ্নিষ্ট থাকে না। অন্তর্বর্তীকালীন পানি সরবরাহ প্রকল্পে অনিয়ম, দুর্নীতি সম্পর্কে বলা হয়, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না করে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা ও প্রকল্প ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রকল্প পরিচালকসহ প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট প্রকৌশলী ও ওয়াসার ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সংশ্নিষ্ট। এই প্রকল্পের ক্ষেত্রে ডিজাইন ও স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন হয়নি মর্মে অভিযোগ রয়েছে।

সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার (ফেইজ-৩) প্রকল্পে ভূ-উপরিস্থ পানি শোধনের মাধ্যমে ঢাকা মহানগরীর পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য ৪ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৫ সালের জুলাই থেকে ২০২০ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা। প্রকল্পের কাজের তেমন কোনো অগ্রগতি নেই।

পদ্মা (যশলদিয়া) পানি শোধনাগার নির্মাণ (ফেজ-১) প্রকল্পের অধীনে পানি শোধন করে ৪৫০ এমএলডি সুপেয় পানি সরবরাহের জন্য ৩ হাজার ৫০৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০১৩ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে প্রকল্প কাজ শেষ করার কথা থাকলেও আজ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি।

এছাড়া প্রতিবেদনে কয়েকটি প্রকল্পে দুর্নীতির কথা বলা হয়েছে। এগুলো হলো ঢাকা এনভায়রনমেন্টালি সাসটেইনেবল ওয়াটার সাপ্লাই প্রকল্প, দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগার প্রকল্প, ঢাকা মহানগরীর আগারগাঁও এলাকায় বৃষ্টির পানি নিস্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্প ও ঢাকা পানি সরবরাহ নেটওয়ার্ক উন্নয়ন প্রকল্প। এখাতে দুর্নীতি হয়েছে পরামর্শক ও ঠিকাদার নির্বাচনে, ব্যক্তি মালিকানাধীন গভীর নলকূপ স্থাপনে, মিটার রিডিং ও রাজস্ব আদায় ও ওয়াসা কর্মচারীদের ওভারটাইম বিলিংয়ের ক্ষেত্রে।

দুর্নীতি প্রতিরোধে ১২ সুপারিশ ওইসব দুর্নীতি প্রতিরোধে ১২ দফা সুপারিশ পেশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- ওয়াসা কর্তৃপক্ষ ও ঠিকাদারদের প্রকল্প কাজ যথাসময়ে যথাযথভাবে বাস্তবায়নে মনোযোগী হতে হবে, প্রকল্পের প্রাক্কলন তৈরির সময় কাজের যথার্থতা ও উপযোগিতা আছে কি-না তা ওয়াসা কর্তৃপক্ষকে নিশ্চিত হতে হবে। বাজেট বরাদ্দের চেয়ে প্রকল্প ব্যয় যাতে না বাড়ে সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখতে হবে। দরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে মূল্যায়ন কমিটিতে দাতা সংস্থার প্রতিনিধিসহ টেন্ডার ও ক্রয়কার্য যথাযথ হচ্ছে কি-না তা মনিটরিংয়ের জন্য মন্ত্রণালয়ভিত্তিক শক্তিশালী টিম গঠন করতে হবে। প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নের সময় ওয়াসার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার প্রকল্প পরিদর্শনসহ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন করতে হবে। ঠিকাদারকে বিল পরিশোধের আগে এ মর্মে সুনিশ্চিত হতে হবে যে, দরপত্রের শর্তানুযায়ী ঠিকাদার প্রকল্প কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন করেছে। ঠিকাদার যতটুকু কাজ করছে তার গুণগত মান যাচাইয়ের ওপরই তার বিল পরিশোধ করতে হবে। ব্যক্তি মালিকানাধীন গভীর নলকূপ স্থাপন, মিটার রিডিং ও রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে ওয়াসার ম্যানুয়াল পদ্ধতির ব্যবহার পরিহার করে সহজতর ডিজিটাল পদ্ধতির মিটার রিডিংয়ের ব্যবস্থা চালু করতে হবে।

এ ছাড়া সুপারিশে অবৈধ ওভারটাইম বিল রোধকল্পে ঢাকা ওয়াসার কর্মচারীদের জনবল কাঠামো সুনির্দিষ্ট করতে হবে। প্রকল্পকাজ বাস্তবায়নের জন্য ঢাকা ওয়াসার কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য প্রতিষ্ঠান যেমন- ঢাকা সিটি করপোরেশন, সওজ, বিদ্যুৎ বিভাগ ইত্যাদির সঙ্গে সুষ্ঠু সমন্বয়সাধন করতে হবে। ঢাকা ওয়াসার কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আনার লক্ষ্যে গণমাধ্যম, দুদক, অডিট ডিপার্টমেন্টসহ নজরদারি আরও বাড়াতে হবে। দুর্নীতি প্রতিরোধের লক্ষ্যে সেবাগ্রহীতাদের নিয়ে ঢাকা ওয়াসায় মাঝে মাঝে গণশুনানির আয়োজন করা যেতে পারে। ঢাকা ওয়াসার বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নাধীন অবস্থায় বিভিন্ন প্রকৌশলী সংস্থার বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে গঠিত সার্ভিলেন্স টিম আকস্মিক অভিযান পরিচালনা করতে পারে। বিভিন্ন প্রকার ক্রয়ে প্রতিযোগিতামূলক প্রকাশ্য/ই-টেন্ডারিং, দরপত্র আহ্বান থেকে শুরু করে কার্যাদেশ প্রদান ও প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় অভিজ্ঞ সিনিয়র কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন কর্মকর্তা/কর্মচারীদের দায়িত্ব প্রদান করা, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় বুয়েটসহ অন্যান্য পেশাদার সংস্থাকে সম্পৃক্ত করার কথা বলা হয়েছে।