বাজেটে কর ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রভাবে দেশের বাজারে রড ও সিমেন্টের দাম বাড়ল। গত দু'দিনের ব্যবধানে খুচরায় প্রতি টন রডে ৪ হাজার টাকা এবং প্রতি বস্তা সিমেন্টে (৫০ কেজি) ৫০ টাকা দাম বেড়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এ দুটি পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে। নির্মাণ খাতের নিত্য উপকরণ রড ও সিমেন্টের দাম বৃদ্ধিতে সার্বিক অবকাঠামো নির্মাণ খাতে ব্যয় ব্যাপকভাবে বাড়তে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্নিষ্টরা।

দেশে রড ও সিমেন্টের চাহিদা এখন স্থানীয়ভাবে পূরণ হচ্ছে। সাধারণত নভেম্বর থেকে নির্মাণ মৌসুমের শুরুতে রড-সিমেন্টের দাম একটু বাড়ে। কিন্তু এবার অনেক আগে থেকেই রড-সিমেন্টের দাম বৃদ্ধি শুরু হলো। এই বৃদ্ধি কোথায় গিয়ে থামে, সেটাই দেখার বিষয়।

গত অর্থবছরে আমদানি বা স্থানীয় পর্যায়ে সংগ্রহ করা রি-রোলিং মিলের জন্য স্ট্ক্র্যাপ থেকে তৈরি এমএস রড ও অ্যাঙ্গেল উৎপাদন পর্যায়ে প্রতি টনে স্তরভেদে ৪৫০ টাকা, ৫৪০ টাকা ও ৯০০ টাকা ভ্যাট ছিল। এবারের বাজেটে প্রতি টন রডে ভ্যাট ১ হাজার টাকা, ১ হাজার ২০০ টাকা ও ২ হাজার টাকা করা হয়েছে। এটা গত বছরের চেয়ে দ্বিগুণের বেশি ভ্যাট বলে দাবি করছেন ব্যবসায়ীরা।

দীর্ঘদিন স্থিতিশীল থাকার পর এই দুই পণ্যের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলো। রড ও সিমেন্টের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছে দেশে আবাসন খাতের কোম্পানিগুলো। তারা বলছে, এতে নির্মাণ ব্যয় বাড়বে, যা ফ্ল্যাটের দামে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

ইস্পাত ও সিমেন্ট শিল্পের সংগঠন বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএমএ) ও বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমএ) তথ্য অনুয়ায়ী, কর ও গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির কারণে রড-সিমেন্টের দাম বাড়ছে। বিএসএমএর হিসাব অনুযায়ী, প্রতি টন রডের মানভেদে ক্রেতা পর্যায়ে মূল্য ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়বে। বিসিএমএর হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বস্তা সিমেন্টে ৫৩ টাকা ব্যয় বৃদ্ধি পাবে।

রাজধানীর পীরেরবাগের রড-সিমেন্টের বড় দোকান আর এন্টারপ্রাইজ, মিরপুর-১ নম্বরে সিফাত এন্টারপ্রাইজসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার রডের দোকান ঘুরে দেখা যায়, গতকাল বুধবার বিভিন্ন ব্র্যান্ডের প্রতি টন ৫০০ টিএমটি বার বা ৬০ গ্রেড রড বিক্রি হচ্ছে ৬৬ থেকে ৬৭ হাজার টাকা। দু'দিন আগেও এসব দোকানে একই মানের রড বিক্রি হয়েছে ৬২ থেকে ৬৩ হাজার টাকায়। আর ৪০ গ্রেডের রডের দাম একই হারে বেড়ে প্রতি টন ৫৯ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। গত দু'দিনে সব ধরনের রডের দাম টনপ্রতি ৪ হাজার টাকা বেড়েছে। এ ছাড়া প্রতি বস্তা সিমেন্ট আগে ৪২০ থেকে ৪৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এখন তা ৪৭০ থেকে ৪৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর এন্টারপ্রাইজের এক বিক্রেতা বলেন, গত কয়েক দিন ধরে মিলে রড অর্ডার দিয়েও পাওয়া যাচ্ছে না। মিলগুলো রড-সিমেন্টের দাম বৃদ্ধির কথা জানিয়েছে। এদিকে চলতি মাস থেকে প্রতি টনে ২০০ টাকার স্থানে ৫ শতাংশ হারে বাড়তি ভ্যাট দিতে হবে। এ কারণে এখন দোকানে থাকা রড বাড়তি দাম দিয়ে বিক্রি করতে হচ্ছে।

গতকাল মিলগেটে প্রতি টন ৬০ গ্রেডের রড ৬৫ হাজার টাকা ও ৪০ গ্রেড ৫৭ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। এতে আগের চেয়ে মিলগেটে গড়ে ৩ হাজার টাকা বেড়েছে। পর্যায়ক্রমে দাম আরও বাড়বে বলে দোকানিদের জানিয়েছে কোম্পানিগুলো।

বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএমএ) সভাপতি ও আনোয়ার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মানোয়ার হোসেন সমকালকে বলেন, গত তিন দিন ধরে ভ্যাটের নতুন চালান বই না পাওয়ায় তাদের মিলসহ অনেক মিলে বিক্রি বন্ধ রয়েছে। আবার অনেক প্রতিষ্ঠান করনীতি বুঝে উঠতে পারছে না। তিনি বলেন, কর বৃদ্ধির পাশাপাশি গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়েছে। এ কারণে রডের দাম বেশি বাড়ছে বলে জানান তিনি।

বিএসএমএর সাবেক সভাপতি শেখ মাসাদুল আলম মাসুদ জানান, স্ট্ক্রাপ রোল করতে জ্বালানি ব্যয় বেড়েছে টনপ্রতি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা এবং রড ও বিলেট উৎপাদনে ক্যাপটিভ পাওয়ারে গ্যাসের ব্যয় বেড়েছে টনপ্রতি ১৪০০ থেকে দেড় হাজার টাকা। সব মিলিয়ে জ্বালানি দর বৃদ্ধিতে রডের টনপ্রতি উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে ১ হাজার ৭০০ টাকা। তিনি বলেন, বাজেটে ভ্যাট সমন্বয় করা হলেও এখনও গত অর্থবছরের চেয়ে দ্বিগুণ ভ্যাট রয়েছে। এর সঙ্গে অগ্রিম আয়কর আগে সমন্বয়ের সুযোগ থাকলে এখন নূ্যনতম আয় হিসেবে ৩ শতাংশ কেটে নেওয়া হবে। এর সঙ্গে আগাম কর (ভ্যাট) ৫ শতাংশ রয়েছে। এটি সমন্বয়ের সুযোগ থাকলেও রড উৎপাদনের তিন মাস আগে কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। এনবিআর আমদানির ছয় মাস পরে ভ্যাট সমন্বয় বা ফেরত পেতে আবেদন করার সুযোগ দেবে। এতে আবেদনের পরেও আরও সময় লাগবে। ফলে চলতি মূলধন প্রায় এক বছর এনবিআরের কাছে থাকবে। এই টাকার বাড়তি সুদ গুনতে হবে কোম্পানিগুলোকে। ফলে এতে ব্যয় বেড়ে যাবে। মাসাদুল আলম বলেন, জ্বালানির মূল্য ও কর বৃদ্ধিতে সব মিলিয়ে মিল পর্যায়ে ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা ব্যয় বাড়বে। এর পরে দোকান পর্যায়ে ৫ শতাংশ ভ্যাট দিলে ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৩০০ টাকা প্রতি টনে ভ্যাট দিতে হবে। গত অর্থবছরে দোকানগুলো থেকে টনে ২০০ টাকা ভ্যাট ছিল। এদিকে ইস্পাত শিল্পের মৌলিক কাঁচামাল স্ট্ক্র্যাপ আমদানিতে ভ্যাট বাড়ানো হয়েছে। তা ছাড়া দেশে এখন ভালো মানের ইংগট বা বিলেট তৈরি হচ্ছে। এর পরেও ইংগট আমদানিতে ভ্যাটে ছাড় দেওয়া হয়েছে। এটি স্থানীয় শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

ক্রাউন সিমেন্ট কংক্রিট অ্যান্ড বিল্ডিং প্রোডাক্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমএ) সভাপতি মো. আলমগীর কবির সমকালকে বলেন, সিমেন্টের কাঁচামাল আমদানিতে ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর এবং ৩ শতাংশ উৎসে কর সমন্বয় করা হবে না। এ ছাড়া ৫ শতাংশ আগাম কর আরোপ করা হয়েছে। এই বাড়তি করের কারণে ব্যয় বাড়ছে ৪২ টাকা। পাশাপাশি দোকান পর্যায়ে ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপ করায় সেখানে দাম আরও বেড়ে যাবে। তা ছাড়া চলতি মাস থেকে গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধিতে জ্বালানি ব্যয় বেড়েছে। সিমেন্টে বিদ্যুতের পাশাপাশি ক্যাপটিভ পাওয়ার রয়েছে। এতে টনপ্রতি ৭০ টাকা ব্যয় বাড়বে। সব মিলিয়ে বস্তাপ্রতি ৫৩ টাকা দাম বাড়বে। এই দাম কোম্পানিগুলো বাড়াতে শুরু করেছে।

মন্তব্য করুন