জীবন তো বহতা নদীর মতো, চলতে হয়। থেমে যাওয়া মানেই পানা জমে যাওয়া! তাই সন্তাপে পোড়া মনগুলো নিয়েই গতকাল বার্মিংহাম থেকে লন্ডনে চলতে শুরু করে টাইগারদের টিম বাস। সেমির স্বপ্ন বিসর্জন দেওয়া শহর থেকে নতুন আরেকটি শহরে, যেখানে কাল খেলতে হবে পাকিস্তানের বিপক্ষে। শূন্যতার মধ্যে থাকা একরাশ বিষাদ ছাপিয়ে আবারও নতুন করে লড়াইয়ে নামতে হবে লর্ডসে; সম্মান ও সান্ত্বনার ম্যাচের জন্য। বাংলাদেশ সেমিফাইনালে যেতে না পারায় সমর্থকদের আক্ষেপে পোড়া খুবই স্বাভাবিক। হৃদয় ভাঙায় হয়তো কষ্ট পাচ্ছেন তারা; কিন্তু সবচেয়ে বেশি ভাংচুর তো ক্রিকেটারদের হৃদয়ে। চোখ বন্ধ করে লন্ডনে থাকা ১৫ ক্রিকেটারের মুখচ্ছবি সামনে নিয়ে এলেই ভেতরে-বাইরে সব দেখতে পাবেন এক নিমেষে। তবে কি জানেন, সেমিফাইনাল খেলতে না পারলেও এই বিশ্বকাপ কিন্তু বাংলাদেশের। এত ভালো ক্রিকেট আর কবে খেলতে দেখেছেন টাইগারদের? ঐতিহ্য আর মানের দিক থেকে এগিয়ে থাকা বিশ্বের বাঘা বাঘা দলের বিপক্ষে একের পর এক রেকর্ড উপহার দিয়েছে বাংলাদেশ। এর প্রমাণ স্কোরকার্ডেই লেখা রয়েছে। টাইগাররা যে ম্যাচগুলো খেলেছে, তা থেকে রেকর্ডগুলো ঘেঁটে দেখলেই উত্তর চোখের সামনে।

টাইগারদের প্রাপ্তি আর অর্জনের পাল্লাটা এত বেশি ভারী যে বিপরীত দিকে ব্যর্থতাগুলো চাপালে এতটুকুও হেলে পড়বে না। বাংলাদেশ দল বিশ্বকাপ শুরুই করেছে রেকর্ড গড়ে। ৩৩০ রান করে হারিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকাকে। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ২৪৪ রানের পুঁজি নিয়েও লড়াই করে গেছে শেষ পর্যন্ত। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটা বাদ দিলে কোথায় লড়াকু মনোভাব দেখায়নি মাশরাফি বাহিনী? ইংলিশদের বিপক্ষে বড় হারের ম্যাচেও প্রাপ্তি সাকিব আল হাসানের সেঞ্চুরি। দু'বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টাইগারদের সে কী পারফরম্যান্স। ৩২১ রান তোলা ক্যারিবীয়দের চোখরাঙানি একেবারে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছেন সাকিব আর লিটন ক্ল্যাসিক ইনিংস খেলে। সে ম্যাচে সাকিব পেয়েছেন হার-না-মানা সেঞ্চুরি (১২১ রান ৯৯ বলে)। লিটন ৬৯ বলে ৯৪ রানে অপরাজিত ছিলেন।

পাঁচবারের বিশ্বকাপজয়ী পরাক্রমশালী অস্ট্রেলিয়ার ৩৮১ রানের বিপরীতে শেষ বল পর্যন্ত লড়াই করে গেছেন মুশফিক-মাহমুদুল্লাহরা। ৮ উইকেটে ৩৩৩ রান তুলে ওয়ানডেতে নিজেদের সর্বোচ্চ স্কোরকে নতুন করে লিখিয়েছে টাইগাররা। যে ম্যাচে সেঞ্চুরি উপহার দিয়েছেন মুশফিকুর রহিম। সৌম্য সরকার শিকার করেছেন তিনটি উইকেট। আর এ বিশ্বকাপে আফগানিস্তানের বিপক্ষে সবচেয়ে দাপুটে জয় তো বাংলাদেশেরই। ভারতকে নাকানি-চুবানি দেওয়া দলটির বিপক্ষে হেসেখেলে জিতেছেন মাশরাফিরা। ম্যাচসেরা সাকিব হাফসেঞ্চুরি ও পাঁচ উইকেট নিয়ে রেকর্ড গড়েছেন আফগানদের বিপক্ষে। এজবাস্টনে মঙ্গলবার বিশ্বকাপের অন্যতম ফেভারিট ভারতের সঙ্গে তুমুল লড়াই কে না দেখেছে। আর একটু হলে তো জিতেই যেত বাংলাদেশ। মুস্তাফিজুর রহমানের স্বরূপে ফেরাও তো অর্জন। ৫০০ প্লাস রান ও ১০-এর বেশি উইকেট নিয়ে এ বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় হওয়ার দৌড়ে সবার ওপরে রয়েছেন সাকিব। এই রেকর্ডগুলোর কারণেই তো পৃথিবী নামক গোলার্ধের প্রতিটি প্রান্তে প্রশংসিত হচ্ছেন টাইগাররা। ভালো দলের সম্মানটা পাচ্ছেন আগের চেয়ে ঢের বেশি।

এর পরও হয়তো স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় কিছু কথা উঠবেই। সমালোচকরা টোটাল পারফরম্যান্স কাটাছেঁড়া করবেন নানা আঙ্গিক থেকে। মাশরাফি বিন মুর্তজা সব সময়ই বলে থাকেন- হারলে অনেক কথাই ওঠে। হয়তো সত্যি, কেননা কেবল মৃতদেহেরই যে পোস্টমর্টেম হয়! খুঁজে বের করা হয় কোন কারণে সেটা হয়েছে। দিন পার করে বিশ্বকাপের এ সন্ধ্যায় এসে তো খুঁজতেই হবে ভুলগুলো কোথায় ছিল। তিন-তিনটি হারের জন্য তিনটি সূক্ষ্ণ ভুল তো চোখের সামনেই ধরা পড়েছে। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে মুশফিকের কেন উইলিয়ামসনের রানআউট মিস করা, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে শুরুতেই সাব্বিরের ডেভিড ওয়ার্নারের ক্যাচ ফেলে দেওয়া এবং সর্বশেষ ভারতের সঙ্গে তামিমের ওই ভুল, ৯ রানের মাথায় রোহিত শর্মার ক্যাচ ফসকে দেওয়া। ইএসপিএনের একটি রিপোর্ট বলছে, তাদের তথ্যভিত্তিক একটি সফটওয়্যার থেকে বিশ্নেষণ করে দেখা গেছে যে তামিম যদি ওই ক্যাচটি নিতে পারতেন, তাহলে ৪৭টি রান কম হতো ভারতের। আসলে ব্যাটিং কিংবা বোলিং- অল্প সময়ের মধ্যে এ দুটি বিভাগে উন্নতি করার সুযোগ কম থাকে। অনুশীলনে উন্নতি করার সুযোগ থাকে বেশি ফিল্ডিংয়ে। সেই ফিল্ডিং অনুশীলনটাই হয়নি ভারত ম্যাচের আগে। পাঁচ দিনের ছুটি কাটিয়ে আসার পর এজবাস্টনের মূল স্টেডিয়ামের পাশের যে মাঠটাতে অনুশীলনের সুযোগ পেয়েছিল টাইগাররা, সেখানে ক্যাচিং প্র্যাকটিস করার জায়গা ছিল না। পরের দিন শুধু কুড়ি মিনিটের জন্য ক্যাচিং করানো হয়েছিল, তা-ও সেটা গা ঘামানোর জন্য। পাঁচ দিনের বিশ্রাম হয়তো মানসিকভাবে চাঙ্গা করেছিল সবাইকে, কিন্তু ক্রিকেটীয় প্রস্তুতির ঘাটতি থেকেই গিয়েছিল। ফিল্ডিংটাই এবারের বিশ্বকাপে জোর ভুগিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে কিছু ক্রিকেটারের ফিটনেস নিয়েও।

নিজেকে বদলে সাকিব এ বিশ্বকাপে অন্য উচ্চতায় তুলে ধরেছেন। মুশফিকও তার হার্ডওয়ার্কের কারণে এগিয়ে যাচ্ছেন। সেঞ্চুরিসহ এবারের আসরে তার রানও মন্দ নয়; কিন্তু পঞ্চপাণ্ডবের বাকিদের কাছ থেকে এখনও প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। ওয়ানডেতে তামিম তার আগের খেলা বদলে নিয়েছেন, যে কারণে শুরুতেই তার কাছ থেকে বাউন্ডারির ফুলঝুরি দেখা যাচ্ছে না। রান না পাওয়ায় তামিম নিজেই বেশ হতাশ, নেটেও সময় বাড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু ভাগ্য তার সহায় হচ্ছে না। তিন-তিনটি বিশ্বকাপ খেলে এখন পর্যন্ত সেঞ্চুরির দেখা পাননি তামিম। 'তামিম কিছুটা আনলাকি, তিনি কষ্ট করে যাচ্ছেন। পরের বিশ্বকাপে তিনি আরও পরিণত হবেন; হয়তো সেখানে তিনি রান পাবেন।' দলের কোচ স্টিভ রোডস তামিমের পাশেই থাকছেন। যেমনটি থাকছেন মাশরাফি আর মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের প্রতিও। সেই আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনাল ম্যাচের পর থেকে ডান পায়ে ব্যথা নিয়ে খেলছেন মাশরাফি। বিশ্বকাপে যে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি, তা তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন। এটাই তার শেষ বিশ্বকাপ- চেয়েছিলেন কিছু দাগ কেটে যেতে। কিন্তু সেটা করতে পারেননি মাশরাফি। আগের বিশ্বকাপে দারুণ খেলা মাহমুদুল্লাহ রিয়াদও এবার নিজের মধ্যে গুটিয়ে ছিলেন। এসব তো একদিনের ব্যবচ্ছেদ। একবার ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্নেষণ করে দেখেন, পারফরম্যান্সের যে গ্রাফটা পাওয়া যাবে অস্ট্রেলিয়া, ভারত, নিউজিল্যান্ড ও ইংল্যান্ডের পরেই ভালো খেলা দল বাংলাদেশ। পাকিস্তান, শ্রীলংকা পয়েন্টের দিক থেকে এগিয়ে গেলেও মাঠের পারফরম্যান্সে টাইগাররা এদের ওপরে। তাই পরিশেষে বলা তো যায়ই- পরের বারের শিরোপা জয়ের মহড়া হলো এবার।

মন্তব্য করুন