তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে বহনকারী ট্রেনে বোমা হামলা ও গুলির ঘটনায় বিএনপির ৯ নেতাকর্মীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। ২৫ বছর আগে পাবনার ঈশ্বরদীতে এ হামলার ঘটনা ঘটে। এ মামলার ৫২ আসামির মধ্যে ২৫ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ১৩ জনকে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বাকি পাঁচ আসামি বিচার চলাকালীন বিভিন্ন সময়ে মারা গেছেন।

পাবনার অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালত-১-এর বিচারক রোস্তম আলী জনাকীর্ণ আদালতে এ রায় ঘোষণা করেন। দণ্ডপ্রাপ্তরা সবাই বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন- তৎকালীন ছাত্রদল নেতা বর্তমানে ঈশ্বরদী পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া পিন্টু, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও পৌরসভার সাবেক মেয়র মোকলেছুর রহমান বাবলু, পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাবেক প্যানেল মেয়র শামসুল আলম, পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি বর্তমানে জেলা বিএনপির মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক এ কে এম আখতারুজ্জামান, ঈশ্বরদী ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি রেজাউল করিম ওরফে ভিপি শাহিন, বিএনপি নেতা শহিদুল ইসলাম অটল, বিএনপি নেতা ও ঈশ্বরদী প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি আজিজুর রহমান শাহিন, বিএনপি নেতা মোস্তফা নুরে আলম শ্যামল ও মাহবুবুর রহমান পলাশ। এদের মধ্যে মামলার প্রধান আসামি জাকারিয়া পিন্টু পলাতক। বাকিরা সবাই রায়ের সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন। মোকলেছুর রহমান বাবলু, ভিপি শাহিন ও মাহবুবুর রহমান পলাশ আপন তিন ভাই।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের প্রত্যেককে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড; যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের প্রত্যেককে তিন লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্তদের প্রত্যেককে এক লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন আদালত।

যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত ২৫ জন হলেন- বিএনপি নেতা আমিনুল ইসলাম আমিন (পলাতক), আজাদ হোসেন খোকন, ইসমাইল হোসেন, আলাউদ্দিন বিশ্বাস, শামসুর রহমান শিমুয়া ওরফে ছামুয়া, আনিছুর রহমান ওরফে সেকম (পলাতক), আক্কেল আলী, মো. রবি (পলাতক), এনাম, আবুল কাশেম ওরফে হালট কাশেম (পলাতক), কালা বাবু (পলাতক), মামুন (পলাতক), মমিন ওরফে মামুন (পলাতক), সেলিম আহমেদ ওরফে কালা সেলিম, কল্লোল, তুহিন, শাহ আলম লিটন, আবদুল্লাহ আল মামুন, লাইজু (পলাতক), আবদুল জব্বার, পলাশ, আবদুল হাকিম ওরফে টেনু, আলমগীর, আবুল কালাম (পলাতক) ও এ কে এম ফিরোজুল ইসলাম পায়েল। প্রত্যেককে তিন লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

এ ছাড়া ১০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ১৩ আসামি হলেন- নেফাউর রহমান রাজু, আজমল হোসেন ডাবলু, আনোয়ার হোসেন জনি, রনো, বরকত আলী, চাঁদ আলী, এনামুল কবীর, মোক্তার, হাফিজুর রহমান ওরফে মুকুল, হুমায়ুন কবীর ওরফে দুলাল, জামরুল, তুহিন বিন সিদ্দীক ও ফজলুর রহমান প্রামাণিক। প্রত্যেককে এক লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেন আদালত। বিচার চলাকালীন মারা যাওয়া আসামিরা হলেন এহতেশাম ওরফে ন্যাটা, আলমগীর হোসেন, ওসিয়া, খোকন ও আলমগীর হোসেন।

আওয়ামী লীগপ্রধান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা মামলার রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন দলটির নেতাকর্মী ও আইনজীবীরা। তারা আনন্দ মিছিল করেন। অন্যদিকে, আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত বিএনপি নেতাকর্মীরা রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে বিক্ষোভ করেন। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।

জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান রেজাউল রহিম লাল, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হাবিবুর রহমান হাবিব, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার হাবিবুর রহমান তোতা, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নুর মোহাম্মদ মাসুম বগা ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক মাসুদ রানা আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত ছিলেন।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী গোলাম হাসনায়েন, পিপি অ্যাডভোকেট আখতারুজ্জামান মুক্তা, জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আমিনুল ইসলাম পটল, সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন প্রমুখ। আসামিপক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট নুরল ইসলাম গ্যাদা, অ্যাডভোকেট মাসুদ খন্দকার, অ্যাডভোকেট সনৎ কুমার সরকার প্রমুখ।

পাবনা জজকোর্টের পিপি আখতারুজ্জামান মুক্তা জানান, নানা কারণে নানা কৌশলে বিচার বিলম্বিত করা হয়েছে। সাক্ষ্য-প্রমাণে আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ হয়েছে। বিচারের রায়ে তারা সন্তুষ্ট।

আসামিপক্ষের আইনজীবী মাসুদ খন্দকার বলেন, আমরা ন্যায়বিচার পাইনি। উচ্চ আদালতে আপিল করব। তিনি আরও বলেন, একটি ঘটনায় মামলা দু'ভাগে বিভক্ত ছিল। একটি সাধারণ মারামারি মামলা এবং আরেকটি বিস্ম্ফোরক মামলা। ২০ বছর আগেই মারামারি মামলায় সব আসামি বেকসুর খালাস পেয়েছে। যেহেতু একই ঘটনা, একই স্থান বা একই অভিযোগ- সে ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার হলে এ মামলার সব আসামির বেকসুর খালাস হওয়ার কথা। তবে আমরা সেটা থেকে বঞ্চিত হয়েছি।

মামলার নথি ও অন্যান্য সূত্রে জানা যায়, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্রথম সরকারের সময় ১৯৯৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ট্রেনে মার্চ করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। এর অংশ হিসেবে খুলনা থেকে ট্রেনে সৈয়দপুর যাওয়ার পথে ঈশ্বরদী স্টেশনে তার যাত্রাবিরতি ও পথসভা করার কথা ছিল। ট্রেনটি ঈশ্বরদী স্টেশনে পৌঁছালে শেখ হাসিনার বগি লক্ষ্য করে গুলি ও বোমা ছোড়া হয়। এতে আওয়ামী লীগ সভাপতির কামরার জানালার কাচ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে ওই ঘটনায় বেঁচে যান তিনি। পরে পথসভার কর্মসূচি সংক্ষিপ্ত করে তিনি দ্রুত ঈশ্বরদী ত্যাগ করেন।

হামলার ঘটনায় ঈশ্বরদী জিআরপি থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম তৎকালীন ছাত্রদল নেতা ও বর্তমানে ঈশ্বরদী পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া পিন্টুসহ সাতজনকে আসামি করে মামলা করেন। পুলিশ ঘটনার এক মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। পাবনা কগনাইজিং আদালত-২-এর তৎকালীন বিচারক তোফাজ্জল হোসেন স্বপ্রণোদিত হয়ে মামলাটি পুনঃতদন্তের জন্য সিআইডিতে পাঠান।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর সিআইডি তদন্ত শেষে ১৯৯৭ সালের ৩ এপ্রিল আদালতে সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করে। এতে নতুনভাবে বিএনপি নেতা মোকলেছুর রহমান বাবলু, ঈশ্বরদীর শীর্ষস্থানীয় বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীসহ ৫২ জনকে আসামি করা হয়। পরে অভিযোগ গঠন করে আসামিদের বিচার শুরু করেন আদালত। পুলিশ এ মামলায় মোট ৩০ জনকে গ্রেফতার করলেও তাদের সবাইকে জামিন দিয়েছিলেন আদালত। গত ৩০ জুন মামলার সাক্ষ্য ও জেরা শেষ হলে বিচারক জামিন বাতিল করে তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। তাদের মধ্যে বিএনপি নেতা মোকলেছুর রহমান বাবলু ও আবদুল হাকিম টেনু গত মঙ্গলবার আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। সেদিন রাতে আরেক আসামিকে পুলিশ গ্রেফতার করে।

পাবনার অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালত-১-এর বিচারক রোস্তম আলী গতকাল রায়ে বলেন, আগামী ৩০ দিনের মধ্যে আসামিরা উচ্চ আদালতে আপিল করতে পারবে।

এ বিষয়ে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার হাবিবুর রহমান তোতা সমকালকে বলেন, রায় নিয়ে কোনো মন্তব্য নেই। কোনো কর্মসূচিও নেই। তবে আইনি প্রক্রিয়ায় মামলা মোকাবেলা করা হবে।

ঈশ্বরদীতে আনন্দ মিছিল :বহুল আলোচিত এই মামলার রায় ঘোষণার পর ঈশ্বরদীতে আনন্দ মিছিল করেছে পৌর আওয়ামী লীগ। গতকাল শহরের কলেজ রোড থেকে পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইছাহক আলী মালিথার নেতৃত্বে মিছিলটি বের হয়ে প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। পরে ঈশ্বরদী বাজারসংলগ্ন পুরনো মোটরস্ট্যান্ডে পথসভা হয়। এতে বক্তব্য দেন ইছাহক আলী মালিথা, আওয়ামী লীগ নেতা ফান্টু মণ্ডল, আবদুল খালেক মালিথা, সাহাবুদ্দিন পচা, রেজাউল করিম নান্টু, সূর্য প্রাং, ছাত্রলীগ নেতা নুরুল ইসলাম শাওন, রাজিব আহমেদ, যুবলীগ নেতা মিলন খন্দকার প্রমুখ।



মন্তব্য করুন