নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে সেই পুরনো কৌশল বেছে নিয়েছে মিয়ানমার। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে যথারীতি নেতিবাচক কূটনীতিতে ফিরে গিয়ে বাংলাদেশকেই দোষারোপ করতে শুরু করেছে দেশটি। ২২ আগস্ট নির্ধারিত তারিখে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কার্যক্রম শুরু না হওয়ার বিষয়ে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম দ্য গ্লোবাল নিউ লাইট অব মিয়ানমার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তরের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, মিয়ানমার মনে করে প্রত্যাবাসনপ্রত্যাশী রোহিঙ্গাদের মধ্যে 'ভেরিফিকেশন ফরম' বিতরণে বাংলাদেশ ব্যর্থ হওয়ার কারণেই ২২ আগস্ট থেকে প্রত্যাবাসন শুরু করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া চারশ'র বেশি হিন্দু 'শরণার্থী'কে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ করা হলেও তাতে সাড়া দেয়নি বাংলাদেশ।

মিয়ানমারের পররাষ্ট্র দপ্তরের এ ধরনের হঠকারী বক্তব্যের কঠোর প্রতিবাদ  .জানিয়েছে বাংলাদেশ। গতকাল রোববার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রত্যাবাসনে অসহযোগিতার অভিযোগ করে মিয়ানমার যে বক্তব্য দিয়েছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অসৎ উদ্দেশ্যে প্রদত্ত এবং কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে মিয়ানমার সরকার যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা যথাযথভাবে পালনে মনোযোগী হওয়া উচিত। সেইসঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সঙ্গে নিয়ে রাখাইনে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির বিষয়টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

রোহিঙ্গা সংকট শুরুর পর থেকে মিয়ানমার সরকার বিভিন্ন সময়ে প্রত্যাবাসন বিলম্বিত হওয়ার দায় বাংলাদেশের কাঁধে চাপানোর অপচেষ্টা চালিয়েছে। প্রতিবারই মিয়ানমারের এ ধরনের অপতৎপরতার কঠোর জবাব দিয়েছে বাংলাদেশ। পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে মিয়ানমারের নয়; বরং বাংলাদেশের বক্তব্যই গ্রহণযোগ্য প্রমাণিত হয়েছে।

যে অপপ্রচার চালাচ্ছে মিয়ানমার :গ্লোবাল নিউ লাইট অব মিয়ানমারে উল্লিখিত প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর এএফপিসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ওই প্রতিবেদনকে উদ্ৃব্দত করে এ ব্যাপারে সংবাদ প্রকাশ করেছে।

মূল প্রতিবেদনটিতে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি সরকারের পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন মুখপাত্রের উদ্ৃব্দতি দিয়ে বলা হয়, বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের মসৃণ প্রত্যাবাসন কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য এ সংক্রান্ত দ্বিপক্ষীয় চুক্তির প্রতি সমর্থন থাকা প্রয়োজন। প্রত্যাগমনকারীদের মধ্যে বিতরণের জন্য যে 'ভেরিফিকেশন ফরম' পূরণের জন্য পাঠানো হয়েছিল তা বিতরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ। এ ছাড়া চারশ'র বেশি হিন্দু শরণার্থীকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ করা হলেও বাংলাদেশ তাতে সাড়া দেয়নি। এর আগে চলতি মাসের শুরুতেই চীন সরকার নিশ্চিত করে যে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করতে বাংলাদেশ আগ্রহী। এ কার্যক্রমে চীনের পাশাপাশি জাপানেরও সমর্থন ছিল।

এর আগে ২০১৮ সালের ১৫ নভেম্বর প্রথম দফা নির্ধারিত তারিখে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কার্যক্রম ভেস্তে যাওয়ার জন্যও বাংলাদেশের অসহযোগিতার অজুহাত দেখিয়ে নিজেদের দায় আড়াল করার চেষ্টা করে মিয়ানমার। অথচ জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে স্পষ্ট হয়েছে, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ বসবাসের 'বিশ্বাসযোগ্য' পরিবেশ সৃষ্টিতে মিয়ানমারের ব্যর্থতার কারণেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিলম্বিত হচ্ছে। এখন পর্যন্ত মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ রাখাইনের পরিস্থিতি উন্নয়নে কী ব্যবস্থা নিয়েছে, তা স্পষ্ট করেনি এবং পর্যবেক্ষণের জন্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এমনকি জাতিসংঘের প্রতিনিধিদেরও সফরের অনুমতি দেয়নি।

'মিয়ানমারের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন' :মিয়ানমারের পররাষ্ট্র দপ্তরের অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন উল্লেখ করেছে বাংলাদেশ। রোববার এ ব্যাপারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মিয়ানমার তাদের দেশের বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের ফিরিয়ে নেবে এই মর্মে প্রস্তুতির কথা জানালে এবং গত জুলাইয়ে মিয়ানমারের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল কক্সবাজারে ক্যাম্প পরিদর্শন করার পর বাংলাদেশ ২২ আগস্ট থেকে প্রত্যাবাসন কার্যক্রম শুরুর ব্যাপারে পূর্ণ সহযোগিতার কথা জানায়। এ ব্যাপারে দ্রুত সব ধরনের কার্যকর পদক্ষেপও নেওয়া হয়। মিয়ানমারের পাঠানো তিন হাজার ৫৪০ জন রোহিঙ্গার তালিকা অনুযায়ী জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর ৩৩৯টি পরিবারের ১ হাজার ২৭৬ জনের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে ২২ আগস্ট পর্যন্ত। সাক্ষাৎকার গ্রহণের সময় মিয়ানমার সরকারের দেওয়া সব ধরনের কাগজপত্র তাদের কাছে সরবরাহ করা হয়। উপরন্তু সাক্ষাৎকারদাতা রোহিঙ্গারা যেন নির্ভয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরতে পারে, তার জন্য বিশেষ নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সাক্ষাৎকারদাতাদের একজনও মিয়ানমারে ফিরে যেতে রাজি হয়নি। তাদের প্রত্যেকেই রাখাইনে নিরাপদ বসবাসের জন্য কতটা উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, সে ব্যাপারে গভীর সন্দেহ প্রকাশ করে। রাখাইনে ফিরে যাওয়ার পর তাদের নিরাপত্তা, জমি ব্যবহারের সুযোগ, চলাফেরার স্বাধীনতা এবং নাগরিকত্বের বিষয়ে মিয়ানমার সরকারের কোনো উদ্যোগ না নেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে তারা। বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে চীন ও মিয়ানমারের প্রতিনিধিরা গত ২১ ও ২২ আগস্ট সার্বক্ষণিক উপস্থিত থেকে পুরো বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করেন।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, গত ২৭ ও ২৮ জুলাই মিয়ানমার সরকারের পররাষ্ট্র সচিবের নেতৃত্বে সে দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল কক্সবাজার ক্যাম্প পরিদর্শনের সময় রোহিঙ্গারা উত্তর রাখাইনে নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা এবং মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তার ব্যাপারে গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করলে সে সম্পর্কে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি মিয়ানমার প্রতিনিধি দলের সদস্যরা।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দ্বিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন স্বেচ্ছায় হওয়ার বিষয়টি সুনির্দিষ্ট রয়েছে। এর জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির সম্পূর্ণ দায়িত্ব মিয়ানমার সরকারের। এখন রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায় রাখাইনে ফিরতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে এবং এটা প্রমাণ করে, মিয়ানমার রাখাইনে রোহিঙ্গাদের জন্য যথাযথ পরিবেশ সৃষ্টি এবং আস্থা তৈরিতে ব্যর্থ হয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের উচিত ভিত্তিহীন অভিযোগ না করে 'অ্যাডভাইজরি কমিশন অব রাখাইন স্টেট'-এর সুপারিশ অনুযায়ী রাখাইনে উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায় ফিরে যাওয়ার মতো আস্থা তৈরিতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া। মিয়ানমার সরকারের উচিত এ কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত করা। বাংলাদেশ সবসময়ই রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান চেয়েছে এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে নিজেদের অবস্থানও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে স্বচ্ছভাবে তুলে ধরেছে। মিয়ানমারেরও উচিত রাখাইনে প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টির বিষয়টি স্বচ্ছভাবে তুলে ধরা।



মন্তব্য করুন