দুই জোটের শরিকরা কেমন আছে -৪

গুরুত্ব বাড়ানোর চেষ্টা এলডিপির

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯      

কামরুল হাসান

বিএনপি থেকে বেরিয়ে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) নামে নতুন দল গঠন করেও স্বকীয়তা ধরে রাখতে পারেননি দলটির নেতারা। একে একে বেশির ভাগ নেতাই ফিরে গেছেন পুরনো দল বিএনপিতে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও এ দলের সাফল্য শূন্যের কোঠায়।

এ অবস্থায় জোটে গুরুত্ব বাড়াতে নানা তৎপরতা শুরু করেছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলের এই শরিক। সম্প্রতি 'জাতীয় মুক্তিমঞ্চ' নামের আলাদা মোর্চা গঠন করে 'মনস্তাত্ত্বিক চাপ' বাড়াতে সচেষ্ট হয়েছে ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন এলডিপি। হাতেগোনা কয়েকজন নেতা নিয়ে ঢিমেতালে চললেও চমক দিতে আর আলোচনায় থাকতে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই ছোটখাটো যোগদান অনুষ্ঠান করছে দলটি।

তবে আলাদা প্ল্যাটফর্ম গঠনের বিষয়টি ভালোভাবে নেয়নি জোটের প্রধান দল বিএনপি। এতে মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে দু'দলের মধ্যে। এমনকি জোটের মধ্যেও দেখা দিয়েছে অস্থিরতা। অবশ্য এলডিপি সভাপতি ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ বীরবিক্রম সমকালকে বলেছেন, জনগণ বিএনপি সরকার দেখেছে। এখন আওয়ামী লীগ সরকারও দেখছে। এলডিপি একটি সৎ, যোগ্য, শিক্ষিত, দেশপ্রেমিক ও জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে। যে সরকার মুক্তিযুদ্ধের  চেতনা বাস্তবায়নে কাজ করবে। আপাতত তাদের লক্ষ্য পুনর্নির্বাচনের দাবি আদায় এবং ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি নিশ্চিত করা।

বিএনপিতে ফিরে যাওয়ার গুঞ্জন বিষয়ে প্রবীণ এই রাজনীতিবিদ জানান, প্রায় তিন বছর আগে খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে এ ধরনের প্রস্তাব নিয়ে বিএনপির সিনিয়র দু'জন নেতা তার কাছে এসেছিলেন। তখন তার সম্মতি 'হ্যাঁ-সূচক' ছিল না। আর বর্তমানে এ ধরনের কোনো কিছু আলোচনায়ই নেই।

প্রতিষ্ঠা ও নেতৃত্ব :চারদলীয় জোট সরকারের শেষ সময়ে ২০০৬ সালের ২৬ অক্টোবর বিএনপির তৎকালীন স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নেতৃত্বে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) আত্মপ্রকাশ ঘটে। এ সময়ে তার সঙ্গে বিএনপির বিভিন্ন পদধারী ১০২ জন নেতা এই দলে যোগ দেন। এর মধ্যে ৩২ জন ছিলেন সাবেক মন্ত্রী-এমপি। একই দিন সাবেক রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিকল্পধারা বাংলাদেশ বিলুপ্ত করে এলডিপির সঙ্গে একীভূত হয়। ২০০৪ সালে বিকল্পধারা বাংলাদেশ গঠিত হয়েছিল। প্রথমে কোনো দ্বন্দ্ব ছাড়াই এলডিপি পরিচালিত হলেও অল্প সময়ের ব্যবধানে মতবিরোধ শুরু হয় শীর্ষ দুই নেতা বি চৌধুরী ও অলি আহমদের মধ্যে।

এই বিরোধের সূত্র ধরে বি চৌধুরী তার দল বিকল্পধারা বাংলাদেশ আবার সক্রিয় হয়। আর এলডিপিতে কর্নেল অলি সভাপতি, সাবেক স্পিকার শেখ রাজ্জাক আলী নির্বাহী সভাপতি এবং অধ্যাপিকা জাহানারা বেগম মহাসচিব হন। ২০১২ সালে বিএনপির নেতৃত্বে তৎকালীন ১৮ দলীয় জোটে অন্তর্ভুক্তিকে কেন্দ্র করে এলডিপিতে ফের মতবিরোধ দেখা দেয়। দলের মহাসচিব অধ্যাপিকা জাহানারা বেগম এলডিপি থেকে পদত্যাগ করে বিএনপি থেকে বহিস্কৃত ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার নেতৃত্বাধীন বিএনএফে যোগ দেন। তার পদত্যাগে এলডিপির প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. রেদোয়ান আহমেদকে দলের মহাসচিব করা হয়।

ভোটের রাজনীতি ও নির্বাচন :২০০৬ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত এলডিপি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটে অবস্থান করে। কিন্তু ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে আসন সমঝোতা না হওয়ায় মহাজোট থেকে এলডিপি বের হয়ে আসে এবং স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নেয়। ওই নির্বাচনে এলডিপি ৩৮টি আসনে প্রার্থী দিয়ে একটি আসনে জয়লাভ করে। ২০১৪ সালের বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক হিসেবে এলডিপিও দশম জাতীয় নির্বাচন বয়কট করে।

একাদশ জাতীয় নির্বাচনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টসহ ২০ দলীয় জোটের মনোনয়নে পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এলডিপি। এর মধ্যে কর্নেল অলি তার দলীয় প্রতীক ছাতা এবং অন্যরা বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেন। নির্বাচনের পর লক্ষ্মীপুর-১ আসনের প্রার্থী শাহাদাত হোসেন সেলিম এলাকার বিএনপির নির্যাতিত নেতাকর্মীদের পাশে অবস্থান নেন। আইনি সহায়তাসহ আর্থিক ও অন্যান্য উপায়ে তাদের পাশে থেকে এবং নিয়মিতভাবে এলাকায় সভা-সেমিনার করে সরব ভূমিকা রেখে এলাকায় দৃঢ় অবস্থান তৈরি করেন তিনি। আসন্ন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে তিনি মনোনয়ন চাইবেন। এ ছাড়া চট্টগ্রাম-১৪ ও কুমিল্লা-৭ এলাকায়ও বিএনপি এবং এলডিপির নেতাকর্মীদের শক্ত অবস্থান রয়েছে।

ছোট হচ্ছে পরিধি :শুরুতে সারাদেশে সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করতে বিভিন্ন কর্মসূচি থাকলেও এখন আর তা নেই এলডিপির। পরিধি ছোট হতে হতে এই দল এখন অনেকটা চট্টগ্রাম বিভাগকেন্দ্রিক আঞ্চলিক দলে পরিণত হয়েছে।

এদিকে তিন নেতা সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, মহাসচিব রেদোয়ান আহমেদ ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম ছাড়া আর এলডিপিতে কোনো পরিচিত মুখও নেই। বিএনপি থেকে চলে এসে এলডিপি গঠনকারী নেতাদের মধ্যে মাত্র এই তিনজনই দলে সক্রিয় রয়েছেন। অনেকে পুরনো দল বিএনপিতে ফিরে গেছেন। অনেকে রাজনীতি থেকে নিষ্ফ্ক্রিয় হয়েছেন। আবার বেশ কয়েকজন বিএনপিতে ফেরার অপেক্ষায় আছেন। সর্বশেষ গত ২৬ জুন এলডিপি থেকে পদত্যাগ করেছেন জাতীয় সংসদের সাবেক হুইপ ও সাবেক এমপি আব্দুল করিম আব্বাসী, সাবেক এমপি আব্দুল্লাহ ও সাবেক এমপি আব্দুল গণি।

ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা :এলডিপির এমন কঠিন পরিস্থিতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর নানামুখী চেষ্টা করছেন কর্নেল অলি আহমদ। 'জাতীয় মুক্তিমঞ্চ' গঠন করে এরই মধ্যে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে কর্মসূচি পালন করেছেন তিনি। প্রায় প্রতি সপ্তাহেই যোগদান অনুষ্ঠান করতে হচ্ছে তাকে। যোগদানকারীদের মধ্যে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ইসমাইল হোসেন বেঙ্গলও রয়েছেন। তাকে এলডিপির প্রেসিডিয়াম সদস্য করা হয়েছে।

বিএনপিতে ফেরা নিয়ে গুঞ্জন :এদিকে শেষ বয়সে কর্নেল অলি বিএনপির সাবেক সতীর্থ আর অনুসারীদের সম্মান ও ভালোবাসার জন্য পুরনো দলে ফিরতে চাইছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। বিএনপির শীর্ষ নেতার কাছে তার এ-সংক্রান্ত বার্তা পৌঁছানোও হয়েছে। তবে এখনও ইতিবাচক সাড়া মেলেনি তার কাছ থেকে। বিএনপি হাইকমান্ডেও এ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব রয়েছে।

বিএনপির কেউ কেউ মনে করেন, জ্যেষ্ঠতার দিক থেকে এগিয়ে থাকা কর্নেল অলিকে দলে ফিরিয়ে আনতে চাইলে পদ-পদবি নিয়ে জটিলতা বাড়বে। অনেকে তাকে সহজভাবে নিতেও পারবেন না। তাই তারা চাইছেন খালেদা জিয়ার মুক্তির পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে। অন্যদিকে, মধ্যমসারির নেতারা চাইছেন তিন নেতাকে দলে ফিরিয়ে এনে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী হতে।

মুক্তিমঞ্চ নিয়ে বিএনপিতে অসন্তোষ :এদিকে মুক্তিমঞ্চের নতুন প্ল্যাটফর্মকে ২০ দলীয় জোটকে দুর্বল করার কার্যক্রম মনে করছে বিএনপি। নতুন প্ল্যাটফর্ম গঠন ও সমর্থন নিয়ে জোটের শরিকদের মধ্যেও রয়েছে অস্থিরতা। শুরুতে জামায়াতে ইসলামী এ প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকলেও বিএনপির নেতিবাচক মনোভাবের কারণে অনেকটাই সরে গেছে দলটি। বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি ও জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) অংশগ্রহণ নিয়েও দেখা দেয় সাময়িক বিভক্তি।

তবে এসব বিষয় মানতে নারাজ এলডিপি মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমেদ। তিনি বলেন, হয়তো অনেক নেতা মনোনয়ন রাজনীতির কারণে চলে গেছেন। আবার অনেকে এ দলে যোগও দিয়েছেন। বিএনপির সঙ্গে কোনো দূরত্ব তৈরি হয়নি।

দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, তারা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই করছেন। আগামী দিনেও জনগণের অধিকার আদায়ের যে কোনো লড়াইয়ে তারা নিজেদের যুক্ত রাখবেন।