মানসম্মান সবই গেল

আফগানিস্তানের কাছে ২২৪ রানের হার

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯      

আলী সেকান্দার, চট্টগ্রাম থেকে

মানসম্মান সবই গেল

এই মণিহার তারই সাজে! ট্রফি হাতে আফগান অধিনায়ক রশিদ খান - বিসিবি

দেখে মনে হচ্ছিল, মৃতবাড়ির শোক নেমে এসেছে পুরস্কার মঞ্চে। সঞ্চালকের কথাগুলোকে শোনাচ্ছিল যেন প্রিয়জন হারানো মানুষের বিলাপ। আর সেই মঞ্চে সাদা পোশাকে দাঁড়িয়ে থাকা বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের দেখাচ্ছিল শোকে ভারাক্রান্ত মৃতের আত্মীয়-পরিজনের মতোই! অথচ চট্টগ্রাম টেস্ট শুরুর আগেও সাকিব আল হাসানরা পুরস্কার প্রদানের মঞ্চকে বিয়েবাড়ির মঞ্চ বানিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। যেখানে হৈ-হুল্লোড় হবে, সেখানে উপস্থিত দেশের ক্রিকেটের কর্মকর্তাদের মুখাবয়বে থাকবে কুলীন ক্রিকেট বোর্ডের আভিজাত্যের ছাপ। কিন্তু কোথায় কি? উল্টো পুরাণ রচিত হলো সাগরিকায়। দু'দিনের আফগানরা ইতিহাস গড়ল, রশিদ খান ম্যাচ জিতিয়ে পেশি দেখিয়ে কটাক্ষ করলেন, আর তা চেয়ে চেয়ে হজম করতে হলো সাকিবদের। সন্ধ্যার আকাশও যেন বিদ্রুপের হাসি হাসছিল, যেন বলতে চাচ্ছিল, সারাদিন বৃষ্টি নামার পরও মান বাঁচাতে পারলে না তোমরা? মাত্র ৭০ মিনিটের চ্যালেঞ্জটা যারা নিতে পারে না, তাদের জন্য করুণাই প্রাপ্য। ব্যর্থতার ষোলোকলা পূর্ণ করার পর সাকিব মিডিয়ার হাতেই সমালোচনার সব অস্ত্র তুলে দিয়ে বললেন- 'খারাপের চেয়ে নিচে কোনো শব্দ থাকলেও বলতে পারেন। আপনারা নেতিবাচক যা আছে সবই বলতে পারেন।' লজ্জার মাথা খেয়ে সাকিব নিজেই বললেন- এই টেস্টের মার্কস 'জিরো'। লজ্জার হার টেস্টে বহু দেখেছে বাংলাদেশ; কিন্তু এবারের হারটা যে টেস্ট পরিবারের নতুন সদস্য আফগানিস্তানের কাছে। তাও ২২৪ রানের বিশাল ব্যবধান।

এমন একটি হারের লজ্জা থেকে বাঁচতেই হয়তো বিসিবির চেনামুখের কর্মকর্তারা পুরস্কারের মঞ্চে যেতে চাননি এবং ছিলেনও না।

দেশের মাটিতে গত বছর দুর্দান্ত টেস্ট খেলা বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড়দের জন্যও এই হার হজম করা কঠিন। যে কারণে খেলার পর মুখ লুকাতেই ব্যস্ত দেখা গেল বেশিরভাগ ক্রিকেটারকে। শুধু অধিনায়ক সাকিব আল হাসান সবকিছু থেকে দূরে থাকতে পারলেন না। কষ্ট বুকে চেপে অধিনায়কের আনুষ্ঠানিকতাগুলো সম্পন্ন করতে হলো তাকে। সংবাদ সম্মেলনে এসে তাই সতীর্থদের পক্ষ না নিয়ে সাকিব বলেই ফেললেন, চট্টগ্রাম টেস্টে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন মার্কস দেবেন শূন্য। সদ্য শেষ হওয়া একমাত্র টেস্টের প্রথম দিন থেকে স্বাগতিক দল যেভাবে খেলেছে, তাতে আফগানিস্তানের কাছে হারটা প্রাপ্য ছিল স্বাগতিকদের। গত পাঁচ দিন জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে যেটুকু সময় খেলা হলো তার প্রতিটি ঘণ্টা এবং সেশন লিড করেছে আফগানিস্তান। ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং তিন বিভাগেই দাপুটে ক্রিকেট খেলে ম্যাচটি জিতেছে তারা। বরং ম্যাচটি যে পঞ্চম দিনের শেষ বেলা পর্যন্ত মাঠে ছিল, তা বৃষ্টির কারণে। বৃষ্টি বাধা না হলে চতুর্থ দিনই শেষ হয়ে যেতে পারত ম্যাচ।

বৃষ্টির ছোঁয়া পেয়েও ম্যাচটা বাঁচাতে পারলেন না স্বাগতিক ক্রিকেটাররা। গতকাল শেষ সেশনে মাত্র ৭০ মিনিট টিকতে পারলেই ড্র হতো ম্যাচ। সাকিব আল হাসান ও সৌম্য সরকারের মতো দু'জন ব্যাটসম্যান থাকার পরও ১৮.৩ ওভার খেলতে পারেনি। ৫৯ মিনিটেই অলআউট হয় বাংলাদেশ। দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশের রান ১৭৩। শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে উইকেট হারান সৌম্য সরকার। সাকিব শুরুতেই অফ স্টাম্পের বাইরের বলে খেলতে গিয়ে ক্যাচ দেন। অধিনায়কের বিদায়ের মধ্য দিয়েই পরাজয়ের পথে এগিয়ে যায় বাংলাদেশ। এরপর মেহেদী হাসান মিরাজ এলবিডব্লিউ, আর আম্পায়ারের ভুল সিদ্ধান্তের শিকাড় তাইজুল ইসলাম। ১৫.১ ওভারেই চার উইকেট হারায় স্বাগতিকরা। বিভীষিকাময় ৫৯ মিনিট এবং পরাজয়। রেসটা ছিল ৭০ মিনিটের। ওই পথটুকু পাড়ি দিতে পারলেই মুক্তির পথের সন্ধান পাওয়া যেত। আর ওই গন্তব্যের স্পর্শে মিলত স্বস্তি ও শান্তি। সেখানে পুরো দল এখন অস্বস্তিতে। এক ঘণ্টা ১০ মিনিটের পথও পাড়ি দেওয়া সম্ভব হলো না। ১১ মিনিট আগে অলআউট হলো বাংলাদেশ। আফগানিস্তানের কাছে ২২৪ রানে পরাজয় লেখা হলো স্বাগতিকদের নামের পাশে। যার প্রতিচ্ছবি দেখা গেল সৌম্য আর নাঈম হাসানের মধ্যে। সৌম্য সরকারকে দেখে মনে হচ্ছিল বোধহীন শরীরটা টেনে আর ড্রেসিংরুমে ফিরতে পারবেন না। জগতের সব হতাশা মুহূর্তে গ্রাস করে শুষে নিয়েছে তার চলার শক্তি। তার পেছনে থাকা নাঈম হাসান আরও পেছনে পড়ে যেতে লাগলেন। রশিদ খানরা যেন তার তারুণ্যের সব শক্তি কেড়ে নিয়েছেন। বিমর্ষ বদনে সৌম্য আর নাঈম ড্রেসিংরুমে ফেরার পথে হাঁটছিলেন। অদূরে রশিদ খানরা মেতে ছিলেন বুনো উল্লাসে। বিজয় মঞ্চ প্রস্তুত করতে কুশলীরাও দৌড়ঝাঁপ করছিলেন। সব কিছুই কেমন দ্রুত গতিতে হচ্ছিল। শুধু স্বাগতিক ক্রিকেটারদের পা চলতে চাচ্ছিল না।

বাংলাদেশ এই টেস্টে যতটা হেরেছে, তার চেয়ে বেশি কৃতিত্ব দিতে হবে আফগানিস্তানকে। তারা ম্যাচটা জিতে নিয়েছে। আফগান অধিনায়ক যারপরনাই খুশি, 'বাংলাদেশের মতো দলের বিপক্ষে আমরা জিতেছি। এটা অনেক বড় কিছু। আমি কোচিং স্টাফকে কৃতিত্ব দেব। তারা যেভাবে লিড দিয়েছেন, তা দারুণ একটা ব্যাপার। আর ছেলেরাও দারুণ খেলেছে। সবাই সবার দায়িত্ব পালন করায় ম্যাচ জেতা সম্ভব হয়েছে।