বিশিষ্টজনের অভিমত

বিচার এমনই হওয়া উচিত

প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০১৯      

সমকাল প্রতিবেদক

বিচার এমনই হওয়া উচিত

বৃহস্পতিবার রায় ঘোষণার পর ফেনীর আদালত থেকে অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাকে কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হয় - এএফপি

ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে নৃশংসভাবে হত্যার মামলায় অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাসহ ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন বিচারিক আদালত। আলোচিত এ ধরনের হত্যা মামলার 'রায় এমনই হওয়া উচিত' বলে জানিয়েছেন সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্টজন। স্বল্প সময়ে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিতে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন তারা। তাদের প্রত্যাশা, সব মামলার রায় যেন এ রকম হয়। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের জঘন্য হত্যাকাণ্ড যেন না ঘটে সেদিকে প্রশাসনসহ সবাইকে আরও সচেতন হওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন বিশিষ্টজন। সমকালের কাছে তাদের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তারা এসব কথা বলেন। তাদের মন্তব্য নিচে তুলে ধরা হলো।

সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, 'সংশ্নিষ্ট বিচারক স্বল্প সময়ের মধ্যে সাক্ষীদের সাক্ষ্য নিয়েছেন। আসামিপক্ষ ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর যুক্তি তর্ক শুনেছেন। সত্যিকার অর্থেই দ্রুত এ বিচারকাজ শেষ হয়েছে। তবে হাইকোর্টে আইনি সব প্রক্রিয়া তাড়াতাড়ি শেষ করে এখন ফাঁসি কার্যকর করতে হবে। তা হলে এটা যুগান্তকারী হয়ে থাকবে।'

রায়ের প্রতিক্রিয়ায় বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহ্‌দীন মালিক বলেন, 'দ্রুত বিচারের মাধ্যমে আসামিদের দোষ প্রমাণের মধ্যে দিয়ে শাস্তি হয়েছে। এটি সুখবর। আরও সুখবর হলো, রাষ্ট্রযন্ত্র তৎপর হলে বিচারকাজ যে দ্রুত শেষ হয়, এটি তার দৃষ্টান্ত। অর্থাৎ বিচারের গতি নির্ভর করে রাষ্ট্রপক্ষের তৎপরতার ওপর। তবে একটি নৃশংস হত্যার জন্য ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি কখনও উজ্জ্বল করবে না। কারণ. বিশ্বের দেড়শরও বেশি দেশে মৃত্যুদণ্ড নেই।' তিনি বলেন, 'মৃত্যুদণ্ড থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো নুসরাত হত্যার বিচারের মতো দ্রুত অন্যান্য মামলায়ও আসামিদের শাস্তি নিশ্চিত করা। এভাবে বিচারকাজ দ্রুত হলে বিচার ব্যবস্থার ওপর জনগণের সম্পূর্ণ আস্থা ফিরে আসবে।'

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান বলেন, 'বিচারহীনতার সংস্কৃতির মধ্যে নুসরাত হত্যার বিচারকাজ দ্রুত শেষ হওয়া একটি ইতিবাচক সংবাদ। সাধারণত দেখা যায়, বিচার হলেও অনেক ক্ষেত্রে আসামি পলাতক থাকে কিংবা গ্রেপ্তারের পর জামিনে বেরিয়ে আত্মগোপনে চলে যায়। আবার চার্জশিটভুক্ত আসামি অপরাধী হয়েও মামলা থেকে খালাস পেয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। তবে এ মামলার সব আসামি ঘটনার পরপরই গ্রেপ্তার হয়েছে এবং আদালতে সব আসামিকে হাজির রেখে রায় দেওয়া হয়েছে। সাজাও পেয়েছে সব অপরাধী।' তিনি বলেন, 'এ মামলার রায়ে টানেলের মধ্যে আলোর দেখা মিলেছে।'

নুসরাত হত্যা মামলায় 'নিম্ন আদালতের রায় মাইলফলক'-মন্তব্য করে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, 'স্বল্প সময়ে গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোর এমনই রায় হওয়া উচিত। নিম্ন আদালতে ১৬ আসামির প্রত্যেকেরই ফাঁসির রায় হয়েছে। এখন এই রায় চূড়ান্তভাবে কার্যকরের জন্য হাইকোর্টে আসবে। তখন এ মামলায় চূড়ান্তভাবে কতজনের ফাঁসি থাকবে কি থাকবে না, তা সেখানে বিবেচ্য হবে।' রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, 'মামলার বিচারকাজ ত্বরিতগতিতে সম্পন্ন হয়েছে। এটা বিচার বিভাগের বিরাট সার্থকতা। সব বিচারকাজ যদি এ রকম ত্বরিতগতিতে শেষ হয়, বিশেষ করে খুনের মামলাগুলোর, তা হলে ন্যায়বিচারের ধারা সমাজে আরও কার্যকর হবে।'

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, 'রায় সঠিক হয়েছে। বড় কৃতিত্ব হলো, স্বল্প সময়ে এ মামলার রায় হয়েছে।' সর্বক্ষেত্রে এমন বিচারের রায় প্রত্যাশা করেন তিনি।

তবে রায়ে ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়ায় দ্বিমত পোষণ করে ফৌজদারি বিশেষজ্ঞ এ আইনজীবী বলেন, 'নুসরাত হত্যা অবশ্যই জঘন্য হত্যাকাণ্ড। তবে এই ১৬ জন সমানভাবে অপরাধী নয়। কঠিন সাজা দেওয়ার ক্ষেত্রে নিম্ন আদালতকে অপরাধীর অপরাধ অনুধাবন করে সাজা দেওয়া উচিত। অনেক বিচারে নিম্ন আদালতে অপরাধীকে ঢালাওভাবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হচ্ছে। পরবর্তী পর্যায়ে এ মামলা হাইকোর্টে এলে অনেক মৃত্যুদণ্ড থাকছে না। এসব বিষয় বিচার-বিশ্নেষণ করতে হবে।'

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান নাছিমা বেগম বলেন, 'নুসরাত হত্যা মামলার রায় অবশ্যই বাংলাদেশের ইতিহাসে মাইলফলক। এটি একটি যুগান্তকারী রায়।' তিনি বলেন, 'নুসরাত জীবন দিয়ে এ নৃশংস অপরাধের প্রতিবাদ করে গেছেন। তিনি যে সাহস দেখিয়েছেন, এর পুরো কৃতিত্বই তার। নারী জাতির জন্য তিনি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবেন।'

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এএম আমিনউদ্দিন বলেন, 'রায় খুব ভালো হয়েছে। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হয়েছে। আলোচিত হত্যা মামলাগুলোর দ্রুত বিচার শেষ করা উচিত।' উচ্চ আদালতেও এ মামলায় অপরাধীদের সাজা বহাল থাকবে বলে প্রত্যাশা করেন তিনি।

সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোহাম্মদ নুরুল হুদা বলেন, 'যারা অন্যায় করেছে তাদের সবাইকে তদন্তের সময়ই আটকানো হয়েছে। এটা একটি ভালো দিক। সব অপরাধীকে দ্রুত গ্রেপ্তার ও তদন্ত করা এবং সবাইকে সাজা দেওয়া অবশ্যই অপরাধীদের জন্য একটি সতর্কবার্তা।' সব মামলার বিচারই দ্রুত শেষ হওয়া দরকার বলে জানান তিনি।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক রায়কে স্বাগত জানিয়ে বলেন, 'নুসরাত হত্যাকাণ্ড জঘন্যতম অপরাধ, মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। এ ধরনের ঘটনায় বিচার না হলে আইনের শাসনের প্রতি মানুষের বিশ্বাস নষ্ট হয়ে যায়।' তিনি বলেন, 'নিম্ন আদালতের রায় যাতে উচ্চ আদালতেও বহাল থাকে সে ব্যাপারে রাষ্ট্রপক্ষকে তৎপর হতে হবে। রায় কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত নুসরাতের পরিবার কিংবা দেশবাসী স্বস্তি পাবে না।'

আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী সালমা আলী বলেন, 'মাত্র ৬১ কার্য দিবসের মধ্যে নুসরাত হত্যা মামলার রায় ঘোষণা সত্যিই যুগান্তকারী ঘটনা। এর তদন্তও শেষ হয়েছে মাত্র ৩৩ কার্য দিবসে। এটি নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী রায়।' তিনি বলেন, 'নুসরাত যখন নির্যাতনের শিকার হয়েছে তখন সে প্রশাসন, নিজের প্রতিষ্ঠান, সমাজের কারও কাছ থেকে সাহায্য পায়নি। কিন্তু তার হত্যার ঘটনায় প্রতিটি ক্ষেত্রে সে নিজেই সাক্ষ্য রেখে গেছে। এ হত্যা মামলার প্রতিটি অপরাধী সমান অপরাধী। কেউ পার পাওয়ার মতো নয়। আদালত এখানে আবেগপ্রবণ হয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।' তার মতে, সমাজের প্রতিবাদী ও সাহসী নারীদের জন্য নুসরাতের নামে একটা পদক চালু করা উচিত।

নুসরাতের ভিডিও প্রকাশের ঘটনায় ফেনীর সোনাগাজী থানার তৎকালীন ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ঢাকায় সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন। তিনি রায়ের পর প্রতিক্রিয়ায় সাংবাদিকদের বলেন, 'প্রাথমিকভাবে এটা কমপ্লিট জাজমেন্ট। তবে, যদি সাবেক ওসি মোয়াজ্জেমকে এ হত্যা মামলায় অভিযুক্ত করা হতো, তা হলে এটা পূর্ণতা পেতো। তবে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম জেলে আছেন। তার বিচারও শেষ পর্যায়ে। তার সাজা যদি ন্যায়বিচারের মাধ্যমে যদি নিশ্চিত করা যায়, তা হলে নুসরাত জাহান রাফির আত্মা পূর্ণ শান্তি পাবে।'