কান নিয়েছে চিলে...

প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০১৯      

জাকির হোসেন

কান নিয়েছে চিলে, চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে- শামসুর রাহমানের 'পণ্ডশ্রম' কবিতার পঙ্‌ক্তি। গুজবের পেছনে দৌড়ানো বাঙালি চরিত্র উপস্থাপনের জন্য এর চেয়ে ভালো উপমা যে হয় না, তা আরেকবার প্রমাণিত হলো। 'লবণের দাম বাড়ছে, যে যত পারো কিনে রাখো'- এই গুজবে গতকাল সারাদেশে লঙ্কাকাণ্ড ঘটে গেছে। হাটে-মাঠে-ঘাটে, ফেসবুকে, মোবাইল ফোনালাপে গুজব রটল- পেঁয়াজের পর এবার লবণের দাম বাড়বে খুব দ্রুত। মানুষজন হুমড়ি খেয়ে পড়ল লবণ কিনতে। কেউ কেউ ছয় মাসের লবণ কিনে ফেলল একবারে। চাহিদা এক লাফে আকাশে উঠে গেল। দামও বাড়িয়ে দিলেন বিক্রেতারা।

শহর থেকে গ্রামে, গ্রাম থেকে শহরে ফোনের পর ফোন। সবাই বলছে 'লবণ কেনো, লবণ কেনো।' রাস্তায় একে অন্যের সঙ্গে দেখা হলেই জিজ্ঞাসা করছেন- ভাই, লবণ কিনেছেন? না কিনলে এখনই কেনেন। শহরে থাকা ব্যক্তি গ্রামের বাড়িতে ফোন করে তাড়াতাড়ি বাড়তি লবণ কিনে রাখতে বলছেন। একই কথা

গ্রাম থেকে ফোন করে শহরের নিকটজনকে বলছেন কেউ। গতকাল দেশব্যাপী সারাদিনের চিত্র এমনই ছিল। এর ফল যা হওয়ার তাই হলো। হুমড়ি খেয়ে পড়লেন ক্রেতারা। অনেক দোকানের সব লবণ দুপুরেই শেষ হয়ে গেল। দোকানের মজুদ এখন মানুষের বাড়িতে। গুজবের সুযোগ নিয়েছেন অসাধু দোকানিরা। কোথাও ১০০ টাকা, কোথাও ১৫০ টাকায় লবণ বিক্রি হয়েছে। অথচ বাজারে ভালো মানের প্যাকেটজাত এক কেজি লবণের দাম ৩৫ টাকা। প্যাকেটের গায়ে খুচরা মূল্য লেখা থাকে। এর বাড়তি এক পয়সাও বেশি নেওয়া বেআইনি। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে যা দণ্ডনীয় অপরাধ। লবণের দাম কখনও সবজি, মাছ-মাংস বা মসলার মতো ঘন ঘন বাড়ে কিংবা কমে না। কোম্পানিগুলো কালেভদ্রে দুই-এক টাকা বাড়ায়। আবার কমায়ও। যেমন এখন থেকে ছয় মাস আগে দর ছিল প্রতি কেজি ৩৮ টাকা। এখন লবণ উৎপাদনের মৌসুম। মজুদ পর্যাপ্ত। ঘাটতি হতে পারে এমন কোনো খবরও গণমাধ্যমে আসেনি। এর পরও গুজবের কাছে পরাস্ত হলো মানুষ।

আমাদের দৈনন্দিন ব্যয়ে লবণের অংশ খুবই সামান্য। ছোট একটি সংসারে মাসে বড়জোর এক কেজি লবণ লাগে। সেই হিসাবে দিনে খরচ এক টাকা। চাল অথবা পেঁয়াজ হলে কথা ছিল। পেঁয়াজের দাম খুব দ্রুত বেড়ে আবার কমতে শুরু করেছে। অবশ্য এখনও যে দাম আছে, তা অস্বাভাবিক। পেঁয়াজ ক'দিন খুব ভুগিয়েছে। এখনও ভোগাচ্ছে, তবে দাম কমে যাওয়ার প্রবণতা থাকায় উদ্বেগ কমেছে। গত সেপ্টেম্বর শেষে ভারত রপ্তানি বন্ধের পরই দর কিছুটা বাড়ে। দরবৃদ্ধির প্রবণতার মধ্যে কয়েকদিন আগে দ্রুত লাফিয়ে লাফিয়ে ২৫০ টাকায় ওঠে। পেঁয়াজ নিয়ে যা ঘটেছে, তা লবণের গুজব সৃষ্টিতে ইন্ধন জুগিয়েছে। যারা ফায়দা লুটতে চেয়েছেন, তারা পেঁয়াজের দর কমে আসার সময়টাকেই বেছে নিয়েছেন। 'পেঁয়াজ থামছে, এবার কিন্তু লবণ'- এই গুজব মানুষের চিন্তায় খুব দ্রুত প্রভাব ফেলতে পেরেছে। সরকারের বার্তায়, গণমাধ্যমের খবরে গুজব হয়তো কমে যাবে বা থাকবে না। মাঝখান থেকে পকেট কাটা গেল কিছু মানুষের।