ধর্ষকদের গুলি করে হত্যার দাবি সংসদে

প্রকাশ: ১৫ জানুয়ারি ২০২০      

সমকাল প্রতিবেদক

কোনো রকম বিচার ছাড়াই চিহ্নিত ধর্ষকদের গুলি করে হত্যার দাবি উঠেছে দেশের আইনসভা জাতীয় সংসদেও। প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির দুই সদস্যের এ দাবিতে সমর্থন জানিয়েছেন সরকারি দলের সিনিয়র সদস্য তোফায়েল আহমেদ। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের আরেক শরিক তরীকত ফেডারেশনের এমপি নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী বলেছেন, ধর্ষকদের 'ক্রসফায়ারে' দিলে বেহেশতে যাওয়া যাবে।

গতকাল মঙ্গলবার সংসদের বৈঠকে মাগরিবের বিরতির পর পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে এসব দাবি জানানো হয়। এর আগে বিকেল সোয়া ৪টায় স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হয়।

আলোচনায় জাতীয় পার্টির সদস্য মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, সারাদেশের মানুষ উদ্বিগ্ন। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গেল বছর ১৭ হাজার ৯০০ নারী নির্যাতনের মামলা হয়। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছে পাঁচ হাজার ৪০০ জন। এদের মধ্যে ১৮৫ শিশু। ২০১৮ সালে ধর্ষণের সংখ্যা ছিল ৭২৭ জন। গেল বছর ধর্ষণের পর ১২ শিশু ও ২৬ নারীর মৃত্যু হয়। এ বছর ধর্ষণের শিকার হয়ে মারা যায় ১৪টি শিশু। বিগত বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২০১৯ সালে ধর্ষণ হয়েছে। মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, এই বিষয়কে গুরুত্ব না দিলে জাতির সামনে কোনো প্রশ্নের জবাব দেওয়া যাবে না। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীকে ধর্ষণ করার ঘটনায় আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এরপরও জনমনে গ্রেপ্তার নিয়ে প্রশ্ন আছে। এর পরপরই সাভারে আরেক ঘটনায় ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। ধামরাইতে একই ঘটনা ঘটেছে। তিনি বলেন, যে হারে ধর্ষণের ঘটনা বাড়ছে, তাতে সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। এটাকে মৃত্যুদণ্ডের ব্যবস্থা নিতে হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশে মুজিবুল হক বলেন, মাদকের জন্য এত ক্রসফায়ার হচ্ছে, সমানে বন্দুকযুদ্ধে মারা যাচ্ছে; ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের জন্য কেন কেউ কোনো বন্দুকযুদ্ধে মারা যায়নি?

জাতীয় পার্টির আরেক সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, ছাত্রী, শিশু, নারী শ্রমিক, এমনকি প্রতিবন্ধী নারী ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ধন্যবাদ, কারণ তারা অনেক ক্লু-লেস ধর্ষককে অ্যারেস্ট করতে পেরেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ধর্ষককে গ্রেপ্তার করেছে। প্রত্যেক জায়গায় ধর্ষকদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। তাহলে বিচার হচ্ছে না কেন? বিচার যখন হয়, তখন আর কেউ মনে রাখেন না। ১৫ বছর, ২০ বছর পর একটা বিচার হয়। তিনি বলেন, বহুল আলোচিত শাজনীন হত্যার পর ১৬ বছর লেগেছে তার বিচার করতে। তার পিতা এ দেশের স্বনামধন্য একজন শিল্পপতি। তার মেয়ের এই ধর্ষণ হত্যার বিচার নিয়ে কোর্ট-কাচারি করতে করতে ১৬ বছর পার করেছেন। আট কোটি টাকা খরচ হয়েছে। একজনের মাত্র ফাঁসি হয়েছে।

তিনি বলেন, ধামরাইয়ে বাসে ধর্ষণ করে হত্যা করা হলো। বাসের চালককে গ্রেপ্তার করা হলো। কী বিচার হবে? কোনো সাক্ষী নেই। এখন পুলিশের কাছে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেবে। যখন মামলায় যাবে, সাক্ষী থাকবে না।

কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, এই ধর্ষকদের কী আইন আপনি করবেন? তাদের কোনো ফাঁসি হবে না, জেলও হবে না। একসময় একবছর পর বেরিয়ে যাবে, কেউ খবরও রাখবে না। যদি এই সমাজকে ধর্ষণমুক্ত করতে চান, তাহলে এনকাউন্টার নিশ্চিত করতে হবে। তাকে গুলি করে মারতে হবে।

এমপি কাজী ফিরোজ বলেন, আইন লাগে না। পুলিশের আইন আছে। মাদকের আসামি পরশু দিনও মারা হয়েছে, কোন আইনে মারা হয়েছে? এই যে বাসে ধর্ষণ করে যে মেয়েটিকে মেরে ফেলা হয়েছে, তার ধর্ষক ধরা পড়েছে। তাকে কী করব আমরা? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষককে বিচারের আওতায় আনেন, দেখা যাবে কোনো সাক্ষী নেই। এই মেয়েকে কাঠগড়ায় আনা হবে। সাক্ষী দিতে হবে কীভাবে ধর্ষণ করা হলো। কীভাবে ঘটনা ঘটেছে। এর চেয়ে লজ্জাজনক কিছু নেই। সারাজীবন তাকে এই জ্বালা সহ্য করতে হবে।

এমপি রশীদ বলেন, মানবাধিকার কর্মীদের বলব, যদি ধর্ষণের শিকার হতেন, আপনার স্ত্রী, আপনার মা, আপনার বোন, আপনার কেউ যদি ধর্ষণের শিকার হতো, কী হতো? আমরা কী চাই? এই সংসদে আমরা মনে করি যে, এদের ত্বরিত বিচার হওয়া দরকার। ত্বরিত বিচারে কোনো আইন হবে না। এক মাসের মধ্যে বিচার করা যাবে না। রূপাকে ধর্ষণ করে ঘাড় মটকে মেরে ফেলল। পুলিশ সবাইকে গ্রেপ্তার করল। সেদিন যদি এই পাঁচজনকে গুলি করে মধুপুরে নিয়ে মারা হতো তাহলে পরে বাসে টাঙ্গাইলের পথে কেউ ধর্ষিত হতো না।

তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে স্পষ্ট বলতে চাই, ধর্ষণ করা হলো। আসামি ধরা পড়েছে, মেয়ে বলছে যে সেই আসামি। জিজ্ঞাসাবাদের নামে ধর্ষককে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হোক, নিয়ে গুলি করে মারা হোক। সবাই দেখুক, তার লাশ পড়ে আছে।

কারও যদি ফাঁসি হয় কেউ খবর রাখে না। ১০টা ২০টা মারা হোক, ধর্ষণ বন্ধ হয়ে যাবে। স্পষ্ট বলতে চাই, একমাত্র ওষুধ পুলিশ ধরার পর ওখানে নিয়ে গুলি করে মেরে ফেলা।

আওয়ামী লীগের সিনিয়র সদস্য তোফায়েল আহমেদ বলেন, মুজিবুল হক চুন্নু সুন্দর প্রস্তাব এনেছেন। কাজী ফিরোজ তিনিও সুন্দরভাবে বলেছেন।

তোফায়েল আহমেদ বলেন, ভারতে একজন ডাক্তার মেয়ে বাস থেকে নামার পর চারজন তাকে নিয়ে গণধর্ষণ করে। দু-তিন দিন পর ক্রসফায়ার দিয়ে তাদের হত্যা করা হয়। এ ঘটনার পর ভারতে আর কোনো ঘটনা ঘটেনি। কাজী ফিরোজের সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করে তোফায়েল আহমেদ বলেন, আইনকানুন আছে, তার মধ্যেও একটা চিহ্নিত লোক, ওয়ারীর একটা বাচ্চা মেয়ে, ছয় বছর বয়স, তাকে ধর্ষণ করে হত্যা করেছে। আমাদেরও ছোট নাতি-নাতনি আছে। এটা হতে পারে না। তিনি বলেন, এখানে দরকার কঠোর আইন করা। এই কাজ করেছে তার আর এই পৃথিবীতে থাকার কোনো অধিকার নেই।

নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী বলেন, চুন্নু এবং কাজী ফিরোজ যাদের কথা বলেছেন, আমি টুপি দাড়ি মাথায় নিয়ে আল্লাহকে হাজির নাজির জেনে বলছি, এদের ক্রসফায়ার করলে বেহেশতে যাওয়া যাবে, কোনো অসুবিধা নেই।