করোনাভাইরাস

বিভিন্ন দেশে ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু ২৭৩৮

প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২০

সমকাল ডেস্ক

করোনাভাইরাসে বিশ্বের মৃতের সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছে দুই হাজার ৭৩৮ জন আর আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় ৪৫ হাজার মানুষ। এদিকে করোনাভাইরাসের কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতি মোকাবিলায় দুই লাখ কোটি ডলারের প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দীর্ঘ সময় আলোচনার পর গতকাল বুধবার হোয়াইট হাউস ও সিনেট এ আর্থিক প্যাকেজ অনুমোদনে সম্মত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এটি সবচেয়ে  বড় ভর্তুকি প্যাকেজ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রণোদনা প্যাকেজ অনুমোদনের খবরে বিভিন্ন দেশের শেয়ার মার্কেট কিছুটা চাঙ্গা হয়ে উঠেছে।

এদিকে সারাবিশ্বে করোনা মহামারির ছোবল আরও ভয়ানক হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও স্পেনে মৃত্যু বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। গতকাল স্পেনে মারা গেছেন ৭৩৮ জন। যুক্তরাষ্ট্রেও মৃত্যুর সংখ্যা ৮০০ ছাড়িয়ে গেছে। করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর সার্বক্ষণিক হিসাব রাখা ওয়ার্ল্ডওমিটারের তথ্যানুসারে গতকাল রাত ১২টা পর্যন্ত বিশ্বের ১৯৬টি দেশ ও অঞ্চলে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা চার লাখ ৫২ হাজার ৬০১ জনে পৌঁছেছে। এর মধ্যে এক লাখ ১২ হাজারের বেশি রোগী সুস্থ হয়ে উঠেছেন। মৃতের সংখ্যা ঠেকেছে ২০ হাজার ৪৯৯ জনে। আক্রান্তদের মধ্যে ৯৬ শতাংশের সংক্রমণ মৃদু এবং বাকি চারভাগের অবস্থা গুরুতর বা সংকটাপন্ন।

করোনার বিস্তার রোধে বর্তমানে বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ বা ৩০০ কোটি মানুষ এক ধরনের লকডাউনের মধ্যে বাস করছেন। এর মধ্যে ভারতেই পুরো লকডাউনে বাস করতে শুরু করেছেন ১৩০ কোটি লোক। জাতিসংঘ বলছে, করোনার কারণে পুরো মানবজাতি ঝুঁকিতে রয়েছে। দরিদ্র দেশগুলোকে সহায়তার জন্য জাতিসংঘ ২০০ কোটি ডলার সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে।

স্পেনে গতকাল আরও ৭৩৮ জনের প্রাণহানিতে মৃতের সংখ্যায় চীনকেও ছাড়িয়ে গেছে ইউরোপের দেশটি। এর আগে ইতালিও চীনকে ছাড়িয়ে যায় মৃত্যুতে। স্পেনে গতকাল পর্যন্ত মারা গেছেন তিন হাজার ৪৩৪ জন আর চীনে মোট মৃত্যু হয়েছে তিন হাজার ২৮১ জনের। স্পেনে আক্রান্ত হয়েছেন মোট ৪৭ হাজার ৬১০ জন। স্পেনের মর্গেও এখন মরদেহ রাখার স্থান নেই। ইরানে গতকাল মারা গেছেন আরও ১৪৩ জন। দেশটিতে মোট মৃত্যু হয়েছে দুই হাজার ৭৭ জনের আর আক্রান্ত হয়েছেন মোট ২৭ হাজার ১৭ জন। গতকাল আক্রান্ত হয়েছেন আরও দুই হাজার ২০৬ জন। ইতালিতে বুধবার মারা গেছেন ৬৮৩ জন। ইতালিতে মঙ্গলবার পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে মোট সাত হাজার ৫০৩ জনের এবং আক্রান্ত হয়েছেন ৭৪ হাজার ৩৮৩ জন।

ফ্রান্সে করোনাভাইরাসে মৃতের সংখ্যা এক হাজার ছড়িয়েছে। বিশ্বে মৃত্যুর এই মিছিলে এক হাজার পার করা পঞ্চম দেশে পরিণত হলো ফ্রান্স। ফ্রান্সে মঙ্গলবার করোনাভাইরাসে নতুন ২৪০ জনের মৃত্যু হয়। এ নিয়ে দেশটিতে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক হাজার ১০০ জনে। চীন, ইতালি, ইরান এবং স্পেনের পর ফ্রান্সও এবার মৃতের সংখ্যা এক হাজার পার করল। তবে এ সংখ্যা কেবল সরকারি হাসপাতালগুলোতে মৃত্যুর হিসাবে। বৃদ্ধাশ্রমে মৃত্যু এখানে ধরা হয়নি। বৃদ্ধাশ্রম থেকেও একাধিক মৃত্যুর খবর আসছে।

করোনার কারণে আয়ারল্যান্ড সব বেসরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রকে সরকারি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। করোনা সংকট শেষ হওয়া পর্যন্ত এ অবস্থা চলবে। বৈষম্য নিরসনের জন্য এটা করা হয়েছে। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদকে অবরুদ্ধ করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া মক্কা ও মদিনা নগরীতে কারফিউর মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। দেশটিতে দ্বিতীয় মৃত্যুর পর গতকাল এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সৌদিতে ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত হয়েছেন ১৩৩ জন, মোট আক্রান্ত ৯০০ জন।

যুক্তরাজ্যে মৃতের সংখ্যা ৪৩৫ জনে পৌঁছেছে। আক্রান্ত হয়েছেন আট হাজার ২২৭ জন। রাশিয়ায় প্রথমবারের মতো গতকাল দু'জনের মৃত্যু হয়েছে বলে সরকার জানিয়েছে। জার্মান সংসদ গতকাল এক লাখ ২০ হাজার কোটি ডলারের প্রণোদনা প্যাকেজ অনুমোদন করেছে। ভারতে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬০৬ জনে। গতকাল নতুন করে সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে ৮৭ জনের। গতকাল আরও দু'জনের মৃত্যু হয়েছে। ফলে মোট মৃতের সংখ্যা ১২।

করোনার কারণে ইউক্রেনে মাসব্যাপী জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। সংক্রমণ রোধে কারাবন্দিদের মুক্তির আবেদন জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। অবশ্য তার আগেই করোনাভাইরাসের সংক্রমণ মোকাবিলায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জেলখানা থেকে বন্দিদের ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ইতোমধ্যে ইরানে বহু বন্দিকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এমনকি ভারতেও কিছু বন্দিকে ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। জেলখানাগুলোতে ধারণক্ষমতার চেয়েও বেশি বন্দি থাকায় সেখানে 'সামাজিক দূরত্ব' বজায় রাখা কঠিন। এর ফলে সেখানে মানুষ থেকে মানুষে কভিড-১৯ রোগটি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বেশি।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভদ্মাদিমির পুতিনের ক্ষমতার মেয়াদ বাড়ানোর ওপর সংসদে ভোট স্থগিত করা হয়েছে। ব্রিটেনের সিংহাসনের পরবর্তী উত্তরাধিকারী প্রিন্স চার্লস করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন বলে রাজপ্রাসাদ নিশ্চিত করেছে। হল্যান্ডে গতকাল একদিনে মারা গেছেন ৮০ জন। এক কোটি ৭০ লাখ মানুষের দেশটিতে করোনায় গতকাল পর্যন্ত ৩৫৬ জন মারা গেছেন আর আক্রান্ত হয়েছেন ছয় হাজার ৪১২ জন। যুক্তরাষ্ট্র করোনাভাইরাস মহামারি ছড়ানোর নতুন বিশ্বকেন্দ্র হতে পারে বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সতর্ক করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক প্রণোদনা প্যাকেজ : করোনাভাইরাসের কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতি মোকাবিলায় দুই লাখ কোটি ডলারের প্রণোদনা প্যাকেজ পাসের কথা জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা মিচ ম্যাককোনেল এবং সিনেট ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার।

করোনা মহামারিতে চীন ও ইতালির পর তৃতীয় বড় আক্রান্ত দেশ যুক্তরাষ্ট্রে এ পর্যন্ত অন্তত আট শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছেন আরও ৫৫ হাজার। কোটি কোটি লোক চাকরিহারা হয়েছেন, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশকে ঘরবন্দি থাকার নির্দেশ দিয়েছেন বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের গভর্নররা। তবে ইস্টারের আগেই যুক্তরাষ্ট্র করোনাভাইরাসমুক্ত হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। যদিও ভাইরাসটি 'বুলেট ট্রেনের' চেয়ে দ্রুতগতিতে ছড়াচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন নিউইয়র্কের গভর্নর।

এ পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনীতি ও মানুষকে রক্ষায় ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রণোদনা প্যাকেজ অনুমোদন হয়েছে। প্রণোদনা প্যাকেজ নিয়ে হোয়াইট হাউস ও সিনেটের মধ্যে পাঁচ দিন ধরে আলোচনা হচ্ছিল। প্যাকেজের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সর্বশেষ মঙ্গলবার রাতেও সিনেটের রিপাবলিকান ও বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে তুমুল আলোচনা হয়। অবশেষে বুধবার প্রথম বেলায় দুই ট্রিলিয়ন ডলারের প্যাকেজে সম্মত হয় উভয়পক্ষ।

এ ব্যাপারে সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠ রিপাবলিকান নেতা মিচ ম্যাককোনেল বলেন, অবশেষে আমরা একটি সমঝোতায় এসেছি। এটি যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে জাতির জন্য বিনিয়োগের মতো বিশাল ভর্তুকি।

পরে সিনেটের ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার বলেন, আমরা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় উদ্ধার প্যাকেজ অনুমোদনে সম্মত হয়েছি। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের অনেক মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে, অথচ তাদের কোনো দোষ নেই। আমরা জানি না, তাদের ভবিষ্যৎ কী হতে যাচ্ছে। যাই হোক আমরা তাদের রক্ষায় সম্মত হয়েছি।