খালেদা জিয়া মুক্ত

প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২০

সমকাল প্রতিবেদক

খালেদা জিয়া মুক্ত

মুক্তির পর বুধবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল থেকে গুলশানের বাসায় পৌঁছান খালেদা জিয়া - সমকাল

দুর্নীতি মামলায় দুই বছরের বেশি কারাভোগের পর শর্তসাপেক্ষে ছয় মাসের জন্য ছাড়া পেয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস প্রতিরোধে দেশজুড়ে প্রায় অবরুদ্ধ অবস্থা শুরুর প্রাক্কালে পরিবারের আবেদনে মানবিক বিবেচনায় সরকারের নির্বাহী আদেশে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। আইনি প্রক্রিয়া শেষে গতকাল বুধবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের কেবিন থেকে বের করা হয়। প্রায় এক বছর তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাকে ছোট ভাই শামীম ইস্কান্দারের জিম্মায় মুক্তি দেওয়া হয়। হাসপাতাল থেকে সরাসরি গুলশানের বাসভবন ফিরোজায় যান খালেদা জিয়া। মুক্তির শর্তানুযায়ী আগামী ছয় মাস তাকে সেখানেই থাকতে হবে। বিদেশ যেতে পারবেন না। খালেদা জিয়ার চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ফিরোজায় হোম কোরারেন্টাইনে থাকবেন বিএনপি চেয়ারপারসন।

এদিকে করোনা প্রতিরোধে জনসমাগম নিষিদ্ধ করা হলেও খালেদা জিয়াকে হাসপাতাল থেকে বের করার সময় বিএনপির বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী সেখানে জমায়েত হন। তাদের সরাতে পুলিশ ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বারবার অনুরোধ জানালেও তা কাজে আসেনি। পরে লাঠিপেটা করে পুলিশ।

এতে কয়েকজন আহত হন। এর পরও খালেদা জিয়ার গাড়ি বহরের সঙ্গে কয়েকশ নেতাকর্মী ছিলেন।

হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার সময় খালেদা জিয়ার পরনে ছিল গোলাপি জামা, চোখে সানগ্লাস, আর মুখে মাস্ক। তার বাঁ হাত কাপড়ে মোড়ানো ছিল। শামীম ইস্কান্দার নিজে গাড়ি চালিয়ে তাকে বাড়ি পৌঁছে দেন। শামীমের স্ত্রী কানিজ ফাতেমাও ছিলেন ওই গাড়িতে। খালেদা জিয়ার সঙ্গে হাসপাতাল ছেড়েছেন তার গৃহকর্মী ফাতেমা বেগমও। তিনি খালেদা জিয়ার দেখাশোনায় গত দুই বছর তার সঙ্গে কারাগার ও হাসপাতালে ছিলেন।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় পাঁচ বছর কারাদ মাথায় নিয়ে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি কারাগারে যান খালেদা জিয়া। পরে হাইকোর্টে এ মামলায় তার সাজা বেড়ে ১০ বছর হয়। আরেকটি মামলায় সাত বছর কারাবাসের সাজা হয়েছে তার। শুরুতে পুরান ঢাকার পরিত্যক্ত কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হলেও গত বছরের ১ এপ্রিল থেকে বিএসএমএমইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন খালেদা জিয়া।

খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর থেকেই বিএনপি নেতারা তাকে আন্দোলনের মাধ্যমে মুক্ত করার কথা বলছিলেন। কিন্তু দলীয় প্রধানের মুক্তির দাবিতে বিএনপির কর্মসূচি মানববন্ধন, প্রতিবাদ সভা আর অনশনেই সীমাবদ্ধ ছিল। আন্দোলন গড়ে তুলতে না পারায় ক্ষোভ ছিল বিএনপিতেও।

একাদশ নির্বাচনের আগে ক্ষমতায় গিয়ে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছিলেন বিএনপি নেতারা। নির্বাচনে অভাবনীয় বিপর্যয় হয় বিএনপির। এরপর গত ১৫ মাসে আইনি লড়াইয়েও খালেদা জিয়ার মুক্তির পথ খোলেনি। এর মাঝে কয়েকবার প্যারোলে খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি আলোচনায় আসে। তখন বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, প্যারোল আবেদন খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। কিছুতেই খালেদা জিয়াকে কারামুক্ত করার পথ না খোলায় চলতি মাসের শুরুতে তার পরিবারের সদস্যরা সরকারের কাছে সাজা স্থগিত করে মুক্তির আবেদন জানান। মানবিক বিবেচনায় মুক্তির আর্জি জানিয়ে তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও দেখা করেন।

গত মঙ্গলবার চমক দিয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানান, বয়স বিবেচনা করে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১(১) ধারা অনুযায়ী সাজা স্থগিত করে খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেওয়ার 'সদয় সিদ্ধান্ত' নিয়েছে সরকার। তবে তাকে ঢাকার বাসায় থেকে চিকিৎসা নিতে হবে। যেতে পারবেন না বিদেশ।

এ ঘোষণার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে খালেদা জিয়ার মুক্তির আদেশের নথি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও কারা কর্তৃপক্ষের হাত ঘুরে গতকাল বিকেল পৌনে ৩টায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে পৌঁছে। এর আগে খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিতে আইন মন্ত্রণালয় সুপারিশ পাঠায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। তা পরে যায় গণভবনে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল নিজেই গতকাল সকালে গণভবনে যান। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পর গতকালই খালেদার জিয়ার মুক্তির প্রজ্ঞাপন জারি করে কারাগারে পাঠায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এরপর খালেদা জিয়ার মুক্তির কাগজ নিয়ে একজন কারা কর্মকর্তা বিএসএমএমইউতে আসেন।

হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার মাহবুবুল হক জানিয়েছেন, খালেদা জিয়াকে বিকেল ৩টার দিকে ডিসচার্জ সার্টিফিকেট দেওয়া হয়। সোয়া ৪টার দিকে তিনি হাসপাতাল ছেড়ে গেছেন।

এর আগে দুপুরে সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, খালেদা জিয়ার ছোট ভাই শামীম ইস্কান্দারের ব্যক্তিগত অনুরোধ এবং তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী শর্তসাপেক্ষে খালেদা জিয়ার সাজা ছয় মাসের জন্য স্থগিত করে মুক্তি-সংক্রান্ত ফাইল অনুমোদন করেছেন।

খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেওয়ার আগে হাসপাতালের বাইরে রাখা হয় তার গাড়িসহ ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনীর গাড়িবহর। তবে তিনি তার ব্যক্তিগত গাড়িতে উঠতে অক্ষম হওয়ায় ছোট ভাইয়ের গাড়ি আনা হয়। খালেদা জিয়াকে তার ভাই শামীম ইস্কান্দার, বোন সেলিনা ইসলাম ও ছেলে তারেক রহমানের স্ত্রী জোবাইদা রহমানের বড় বোন শাহিনা খান জামান আনতে যান। ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ কয়েকজন সিনিয়র নেতা। খালেদা জিয়ার পরিবারের কয়েকজন সদস্যও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাকে আনতে নতুন একটি হুইলচেয়ার ছয়তলার ৬২১ নম্বর কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়।

খালেদা জিয়ার মুক্তির খবরে দলের নেতাকর্মীরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিড় করেন। বিএনপিপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন ড্যাবের সদস্য ও অন্যান্য সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরাও দুপুর থেকে জমায়েত হতে শুরু করেন। এর মধ্যে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল, সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ, আন্তর্জাতিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাসুদ আহমেদ তালুকদার, ড্যাব সভাপতি ড. হারুন আল রশিদ, আবু নাসের মোহাম্মদ রহমাতুল্লাহ, ছাত্রদল সভাপতি ফজলুর রহমান খোকনসহ ঢাবি শাখা ছাত্রদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

করোনাভাইরাস প্রতিরোধে জমায়েত না হতে বিএনপির পক্ষ থেকে অনুরোধ জানালেও তা কাজে আসেনি। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার নির্দেশনা থাকলেও খালেদা জিয়া বেরিয়ে আসার পরপর হাসপাতালের ভেতরে তার গাড়িকে কেন্দ্র করে নেতাকর্মীদের প্রচ ভিড় জমে। খালেদা জিয়াকে বহনকারী গাড়ির সঙ্গে নেতাকর্মীদের কেউ কেউ মোটরসাইকেলে এবং একটি বড় অংশ হেঁটে এগোতে থাকে। কারও কারও হাতে ছিল হাতে লেখা প্লাকার্ড। নেতাকর্মীদের ভিড়ের কারণে খালেদা জিয়াকে বহনকারী গাড়ি ধীরগতিতে এগোতে থাকে। বিকেল সোয়া ৫টায় দুই বছর এক মাস ১৬ দিন পর ভাড়া নেওয়া দলীয় নেতা মেজর (অব.) কামরুল ইসলামের ছেলের মালিকানাধীন বাড়ি ফিরোজায় ফেরেন খালেদা জিয়া। ভগ্নিপতি রফিকুল ইসলাম, প্রয়াত সাইদ ইস্কান্দারের স্ত্রী নাসরিন ইস্কান্দারসহ পরিবারের সদস্যরা তাকে ফুল দিয়ে স্বাগত জানান। বোন ও ছোট ভাইয়ের স্ত্রীর হাতে ভর করে গাড়ি থেকে নেমে হুইলচেয়ারে বাসায় প্রবেশ করেন খালেদা জিয়া।

এ সময় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, মির্জা আব্বাস, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, ভাইস চেয়ারম্যান এজেডএম জাহিদ হোসেন, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল, ঢাকা সিটি করপোরেশনের গত নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল ও ইশরাক হোসেন উপস্থিত ছিলেন।

বাসভবনে খালেদা জিয়া প্রবেশের পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ম্যাডাম খুবই অসুস্থ। তার সুস্থতার বিষয়ে চিকিৎসকদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এর আগে সকাল ১১টার দিকে খালেদা জিয়ার বাসভবন ফিরোজার প্রস্তুতি দেখতে আসেন বিএনপি মহাসচিব।