জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রধানমন্ত্রী

ঘরে থাকুন সুস্থ থাকুন

প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২০

সমকাল প্রতিবেদক

আতঙ্কিত না হয়ে সতর্কতা ও সচেতনতার সঙ্গে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা করার জন্য জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে গতকাল বুধবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সবাই যার যার ঘরে থাকুন, ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন, নিরাপদ থাকুন। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন। এ যুদ্ধে আপনার দায়িত্ব ঘরে থাকা। তিনি বলেন, বাঙালি বীরের জাতি। নানা দুর্যোগে-সংকটে বাঙালি জাতি সম্মিলিতভাবে সেগুলো মোকাবিলা করেছে। ১৯৭১ সালে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আমরা শত্রুর মোকাবিলা করে বিজয়ী হয়েছি। করোনাভাইরাস মোকাবিলাও একটা যুদ্ধ। আমরা সকলের প্রচেষ্টায় এ যুদ্ধে জয়ী হবো, ইনশাল্লাহ।

করোনা সংকটে একে অপরের প্রতি  সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছেন, দুর্যোগের সময়ই মনুষ্যত্বের পরীক্ষা হয়। এখনই সময় পরস্পরকে সহায়তা করার; মানবতা প্রর্দশনের। তিনি বলেন, 'আতঙ্কিত হবেন না। আতঙ্ক মানুষের যৌক্তিক চিন্তাভাবনার বিলোপ ঘটায়। সবসময় খেয়াল রাখুন আপনি, আপনার পরিবারের সদস্যরা এবং আপনার প্রতিবেশীরা যেন সংক্রমিত না হন। আপনার সচেতনতা আপনাকে, আপনার পরিবারকে এবং সর্বোপরি দেশের মানুষকে সুরক্ষিত রাখবে।'

মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর এই ভাষণ সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতার বাংলাদেশসহ কয়েকটি বেসরকারি টিভি চ্যানেল একযোগে সম্প্রচার করে।

করোনাভাইরাস মোকাবিলায় তার সরকারের প্রস্তুতি ও এ পর্যন্ত গৃহীত পদক্ষেপগুলো তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, 'আজ সমগ্র বিশ্ব এক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে চলছে। তবে যেকোনো কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য আমাদের সরকার প্রস্তুত রয়েছে। আমরা জনগণের সরকার। সবসময়ই আমরা জনগণের পাশে আছি। আমি নিজে সর্বক্ষণ পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছি।'

এই সংকটে কৃচ্ছ্রতা সাধনের জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আমাদের এখন কৃচ্ছ্রতা সাধনের সময়। যতটুকু না হলে নয়, তার অতিরিক্ত কোনো ভোগ্যপণ্য কিনবেন না। মজুদ করবেন না। সীমিত আয়ের মানুষকে কেনার সুযোগ দিন।

দৃঢ়কণ্ঠে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এ বছর রোপা আমনের বাম্পার ফলন হয়েছে। সরকারি গুদামগুলোতে ১৭ লাখ টনের বেশি খাদ্যশস্য মজুদ রয়েছে। এ ছাড়া বেসরকারি মিল মালিকদের কাছে এবং কৃষকদের ঘরে প্রচুর পরিমাণ খাদ্যশস্য মজুদ আছে। চলতি মৌসুমে আলু-পেঁয়াজ-মরিচ-গমের বাম্পার ফলন হয়েছে। কৃষক ভাইদের প্রতি অনুরোধ, কোনো জমি ফেলে রাখবেন না। আরও বেশি বেশি ফসল ফলান।

তিনি বলেন, এই সংকটময় সময়ে আমাদের সহনশীল এবং সংবেদনশীল হতে হবে। কেউ সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করবেন না। বাজারে কোনো পণ্যের ঘাটতি নেই। দেশের অভ্যন্তরে এবং বাইরের সঙ্গে সরবরাহ চেইন অটুট রয়েছে। অযৌক্তিকভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি করবেন না। জনগণের দুর্ভোগ বাড়াবেন না। সর্বত্র বাজার মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

করোনা সংকট নিয়ে গুজব ছড়ানোর বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বেতার-টেলিভিশন ও সংবাদপত্রসহ অন্য সামাজিক মাধ্যমে করোনাভাইরাস সংক্রান্ত জনসচেতনতামূলক প্রচার জোরদার করা হয়েছে। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে। তবে কেউ গুজব ছড়াবেন না। গুজব রটনাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নিম্নআয়ের মানুষের সহায়তায় এগিয়ে আসতে বিত্তবানদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, করোনার কারণে অনেক মানুষ কাজ হারিয়েছেন, তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। নিম্নআয়ের ব্যক্তিদের 'ঘরে-ফেরা' কর্মসূচির আওতায় নিজ নিজ গ্রামে সহায়তা, গৃহহীন ও ভূমিহীনদের জন্য বিনামূল্যে ঘর, ছয় মাসের খাদ্য এবং নগদ অর্থ দেওয়া হবে। ভাসানচরে এক লাখ মানুষের থাকা ও কর্মসংস্থান উপযোগী আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে কেউ যেতে চাইলে সরকার ব্যবস্থা নেবে। বিনামূল্যে ভিজিডি, ভিজিএফ ও ১০ টাকা কেজি দরে চাল সরবরাহ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। একইভাবে বিনামূল্যে ওষুধ ও চিকিৎসা সেবাও দেওয়া হচ্ছে।

করোনার কারণে শিল্প উৎপাদন এবং রপ্তানি বাণিজ্যের ওপর সম্ভাব্য আঘাত মোকাবিলায় সরকার গৃহীত আপৎকালীন ব্যবস্থাগুলো তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য আমি পাঁচ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করছি। এ তহবিলের অর্থ দ্বারা কেবল শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করা যাবে।'

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এবারের স্বাধীনতা দিবস ভিন্ন প্রেক্ষাপটে উদযাপিত হচ্ছে। প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে গোটা বিশ্ব এখন বিপর্যস্ত। ধনী বা দরিদ্র, উন্নত বা উন্নয়নশীল, ছোট বা বড়- সব দেশই আজ কমবেশি নভেল করোনা নামক এক ভয়ংকর ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত। আমাদের প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশও এ সংক্রমণ থেকে মুক্ত নয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে আমরা এবারের স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস ভিন্নভাবে উদযাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। জনসমাগম হয় এমনসব অনুষ্ঠানের আয়োজন থেকে সবাইকে বিরত থাকার অনুরোধ জানাচ্ছি। জাতীয় স্মৃতিসৌধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনসহ সব জেলায় শিশু সমাবেশ ইতোমধ্যে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

এই মুহূর্তে সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার মানুষকে রক্ষা করা- এমনটি জানিয়ে দেশবাসীর উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'আমি জানি আপনারা এক ধরনের আতঙ্ক ও দুশ্চিন্তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। যাদের আত্মীয়স্বজন বিদেশে রয়েছেন, তারাও তাদের নিকটজনদের জন্য উদ্বিগ্ন রয়েছেন। আমি সবার মানসিক অবস্থা বুঝতে পারছি। কিন্তু এই সংকটময় সময়ে আমাদের ধৈর্য ও সাহসিকতার সঙ্গে পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে। এই ভাইরাস প্রতিরোধে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের উপদেশ আমাদের মেনে চলতে হবে। আমাদের যতদূর সম্ভব মানুষের ভিড় এড়িয়ে চলতে হবে।'

তিনি বলেন, যারা করোনাভাইরাস আক্রান্ত দেশ থেকে স্বদেশে ফিরেছেন, সেসব প্রবাসী ভাইবোনের কাছে অনুরোধ- হোম কোয়ারেন্টাইন বা বাড়িতে সংগনিরোধসহ যেসব নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, সেগুলো অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলুন। মাত্র ১৪ দিন আলাদা থাকুন। নিজের পরিবার, পাড়া-প্রতিবেশী, এলাকাবাসী এবং সর্বোপরি দেশের মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য এসব নির্দেশনা মেনে চলা প্রয়োজন।

সরকারপ্রধান জানান, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের জন্য ঢাকায় ছয়টি হাসপাতাল প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এ ছাড়া আরও তিনটি হাসপাতাল প্রস্তুত করা হচ্ছে। জেলা-উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে আক্রান্তদের জন্য পৃথক শয্যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ঢাকায় ১০ হাজার ৫০টিসহ সারাদেশে ১৪ হাজার ৫৬৫টি আইসোলেশন শয্যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সারাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনের জন্য ২৯০টি প্রতিষ্ঠান প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এতে মোট ১৬ হাজার ৭৪১ জনকে সেবা দেওয়া যাবে।

তিনি বলেন, দেশের সব স্কুল-কলেজ ও কোচিং সেন্টার গত ১৭ মার্চ থেকে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। স্থগিত করা হয়েছে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা। সব পর্যটন ও বিনোদনকেন্দ্রও বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। যেকোনো রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সকল সরকারি-বেসরকারি অফিস বন্ধ থাকবে। তবে কাঁচাবাজার, খাবার ও ওষুধের দোকান এবং হাসপাতালসহ জরুরি সেবা কার্যক্রম চালু থাকবে। গতরাত (মঙ্গলবার) থেকে যাত্রীবাহী ট্রেন, নৌযান ও অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচল বন্ধ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সীমিত আকারে ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু রাখবে। ২৪ মার্চ থেকে বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা বলবৎ হয়েছে। এটি কার্যকর করতে জেলা প্রশাসনকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা সহায়তা করছেন।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে সুরক্ষার উপায়গুলো স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কয়েকটি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে করোনাভাইরাস প্রতিরোধ সহজ হবে। ঘন ঘন সাবান-পানি দিয়ে হাত ধুতে হবে। হাঁচি-কাশি দিতে হলে রুমাল বা টিস্যু পেপার দিয়ে নাক-মুখ ঢেকে নেবেন। যেখানে-সেখানে কফ-থুথু ফেলবেন না। করমর্দন বা কোলাকুলি থেকে বিরত থাকুন। যতদূর সম্ভব ঘরে থাকবেন। অতি প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে যাবেন না। বাইরে জরুরি কাজ সেরে বাড়িতে থাকুন। মুসলমান ভাইয়েরা ঘরেই নামাজ আদায় করুন এবং অন্যান্য ধর্মের ভাইবোনদেরও ঘরে বসে প্রার্থনা করার অনুরোধ জানাচ্ছি।

করোনা রোগীদের চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষায় সরকারি পদক্ষেপ তুলে ধরে তিনি বলেন, স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষায় পর্যাপ্ত পরিমাণ সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়েছে, যথেষ্ট পরিমাণ মজুদও আছে। ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রীরও পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। এ ব্যাপারে বিভ্রান্ত হবেন না।

করোনার বিস্তার রোধে একযোগে কাজ করায় স্বাস্থ্যকর্মীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী ও প্রশাসনের সদস্যদের ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যুগে যুগে জাতীয় জীবনে নানা সংকটময় মুহূর্ত আসে। জনগণের সম্মিলিত শক্তির বলেই সেসব দুর্যোগ থেকে মানুষ পরিত্রাণ পেয়েছে। ইতোপূর্বে প্লেগ, গুটিবসন্ত ও কলেরার মতো মহামারি মানুষ প্রতিরোধ করেছে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নিশ্চয়ই বিশ্ববাসী এ দুর্যোগ থেকেও দ্রুত পরিত্রাণ পাবে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাঙালির স্বাধীনতা অর্জনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলেন, জতির পিতা বলতেন :'আমার জীবনের একমাত্র কামনা বাংলার মানুষ যেন অন্ন পায়, বস্ত্র পায়, উন্নত জীবনের অধিকারী হয়।' তিনি বলেন, আমরা জাতির পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি।