মাটিতে করোনা আকাশে বজ্রপাত

প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০২০

জয়নাল আবেদীন

সবার কপালে ভয় আর আতঙ্কের ভাঁজ- করোনা। এরই মধ্যে আরও একটি অশনিসংকেত- বজ্রপাত। শুরু হয়েছে আকাশের চোখ রাঙানি। চৈত্রের শেষে আর ক'টা দিন পর কান পাতলেই শোনা যাবে আকাশ বিদীর্ণ শব্দ। তবে করোনার এই লকডাউনের মধ্যে বজ্রপাত অতীতের তুলনায় কম মৃত্যু নিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্নিষ্ট গবেষকরা।

তারা বলছেন, লকডাউনের কারণে শহর থেকে গ্রাম- সর্বত্রই নানা পেশার মানুষ এখন ঘরবন্দি। খুব কম সংখ্যক মানুষ মাঠেঘাটে অবস্থান করছেন। ফলে চলতি মৌসুমে বজ্রপাতে মৃত্যুর হার কিছুটা হলেও কমতে পারে। তবে সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে মানুষের অসচেতনতা। বিশেষ করে চর ও হাওর এলাকায় জীবিকার তাগিদে কেউ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলে বজ্রপাতের কবলে পড়তে পারেন। ইতোমধ্যে দু'দিনে তিন জেলায় ছাত্র, কৃষকসহ আটজনের মৃত্যুর ঘটনা সেই সতর্কবার্তা দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দক্ষিণ এশিয়ার যে দেশগুলো বজ্রপাতের সবচেয়ে ঝুঁকিতে, বাংলাদেশ তার একটি। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দেশের আকাশে ঠাণ্ডা ও গরম বাতাসের সংমিশ্রণ ঘটছে।

এতে সৃষ্টি হচ্ছে প্রাণঘাতী বজ্রপাত। হাওরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে গাছপালা না থাকায় সেখানে মৃত্যুঝুঁকিও বেশি। তারা আরও বলছেন, সাধারণত এপ্রিল, মে ও জুন মাসকে বজ্রপাতের মৌসুম বিবেচনা করা হয়। গত দুই-তিন বছরে বজ্রপাতে প্রাণহানির সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। বরাবরের মতো এবারও এপ্রিলের শুরু থেকে তাপমাত্রায় ঊর্ধ্বগতি। ভূপৃষ্ঠে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং পরিবেশ দূষণের কারণে বজ্রপাতের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, গত ৯ বছরে বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন এক হাজার ৯৫৮ জন। এর মধ্যে ৮৭৮ জন মারা যান শেষের তিন বছরে। গত বছর মারা যান ১৯৮ জন। এবার মৌসুমের প্রথম ঘটনা কক্সবাজারের মহেশখালীতে। গত শনিবার বিকেলে বজ্রপাতে প্রাণ হারান ওই এলাকার তিন লবণচাষি। পরের দিন ফুটবল খেলতে গিয়ে বজ্রপাতে মারা যান কুমিল্লার এক তরুণ। একই দিন পটুয়াখালীর তিন উপজেলায় পৃথক ঘটনায় প্রাণ হারান চারজন।

বাংলাদেশ ও ভারতের বজ্রপাত নিয়ে গবেষণা করছেন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির জ্যেষ্ঠ প্রভাষক সাকিয়া শবনম কাদের। তিনি বলেন, 'শুধু প্রাণহানি নয়, বছর বছর বজ্রপাতের সংখ্যাও বেড়ে চলেছে। এর বড় কারণ তাপমাত্রার ঊর্ধ্বগতি। বায়ুমণ্ডলীয় ঠাণ্ডা বাতাসের সঙ্গে ভূপৃষ্ঠ থেকে যাওয়া গরম বাতাসের সংমিশ্রণ বজ্রপাতের মেঘ তৈরি করে। পরিবেশ দূষণও অন্যতম কারণ। বিশেষ করে স্বাস্থ্যগত অন্যান্য ঝুঁকির পাশাপাশি বজ্রপাতের ঝুঁকিও বাড়িয়ে চলেছে দেশের ক্রমবর্ধমান বায়ুদূষণ। এই ঝুঁকি নিরসনের জন্য প্রথমেই ভূপৃষ্ঠের বাতাস ঠাণ্ডা রাখার উদ্যোগ নিতে হবে।' ব্যাপক বৃক্ষরোপণের মধ্য দিয়ে তাপমাত্রার ওপর নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে।

উপকূলীয় এলাকায় বজ্রপাত বেশি হয় জানিয়ে সাকিয়া বলেন, পটুয়াখালী, বরিশাল ও চট্টগ্রামের উপকূলীয় এলাকায় তাপমাত্রা সবসময় তুলনামূলক বেশি থাকে। ফলে এসব এলাকায় বজ্রপাতের সংখ্যাও বেশি। তবে বৃক্ষ আচ্ছাদিত হওয়ায় এসব এলাকায় মৃত্যুর হার কম থাকে। সেদিক থেকে হাওরাঞ্চলে বজ্রপাত সংখ্যায় কম হলেও প্রভাব বেশি। মৃত্যুর হারেও হাওর এগিয়ে থাকে।

দেশে ক্রমান্বয়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধির কথা বলছেন আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ ড. মো. আবদুল মান্নান। এই জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ বলেন, 'প্রতিবছর বজ্রপাতের প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত পাঁচ দশকে দেশের তাপমাত্রা পৌনে এক ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। সাধারণত জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাড়তি এক ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার বিপরীতে বজ্রপাতের ঝুঁকি বেড়ে যায় ১২ শতাংশ। খোলা স্থানে বজ্রপাত হলে প্রাণহানির ঝুঁকি বেশি হয়।'

ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সের গবেষক প্রকৌশলী মনিরুল ইসলাম বলেন, 'আমরা বজ্রপাত প্রতিরোধের বৈজ্ঞানিক উপায় উদ্ভাবনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে অন্তত এক ঘণ্টা আগে পূর্বাভাস জানা সম্ভব। বিশেষ করে হুইসেল পদ্ধতিতে বজ্রপাত নিরোধে সফলতা পাচ্ছে জাপান। বাংলাদেশেও সেটি অনুকরণ করা যেতে পারে।'

তিনি জানান, কৃষকরা সাধারণত দীর্ঘ সময় মাঠে অবস্থান করেন। এ জন্য তাদের ঝুঁকির আশঙ্কাও বেশি। তাদের জন্য কিছু 'নিরাপদ অঞ্চল' ঘোষণা করতে হবে। আধা ঘণ্টা বা এক ঘণ্টা আগে পূর্বাভাস পেয়ে হুইসেল বাজানো হলে তারা নিরাপদ অঞ্চলে আশ্রয় নিতে পারবেন। বজ্রপাতের মৌসুম ইতোমধ্যে হাজির। এ জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়কে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।