বেঁচে যাওয়া যাত্রীর বর্ণনা

বিকট শব্দের পরপরই ডুবে যায় মর্নিংবার্ড

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২০

কাজী সাব্বির আহমেদ দীপু, মুন্সীগঞ্জ

শতাধিক যাত্রী নিয়ে সোমবার সকালে কাঠপট্টির লঞ্চঘাট থেকে ঢাকার সদরঘাটের উদ্দেশে রওনা হয় মর্নিংবার্ড নামের লঞ্চটি। বেঁচে যাওয়া যাত্রী জাহাঙ্গীর হোসেন বলেছেন, মিরকাদিম পৌরসভার এনায়েতনগর এলাকায় তার বাড়ি। আট বছর ধরে কাঠপট্টি থেকে লঞ্চে ঢাকায় আসা-যাওয়া করে বঙ্গবাজারে কাপড়ের দোকানে কাজ করছেন। অন্যান্য দিনের মতো সোমবার সকাল পৌনে ৮টার দিকে মর্নিংবার্ড লঞ্চে করে ঢাকায় যাচ্ছিলেন। তার সঙ্গে মিরকাদিম পৌর এলাকার প্রায় ১০ যাত্রী ছিলেন। কথায় আড্ডায় তারা লঞ্চটিতে মেতে ছিলেন। লঞ্চটি ফরাশগঞ্জ ঘাট এলাকার কাছে সকাল সোয়া ৯টার দিকে পৌঁছলে ময়ূর-২ লঞ্চটি তাদের লঞ্চটিকে ধাক্কা দেয়। এই সময় লঞ্চটি একপাশে কাত হয়ে গেলে তিনিসহ পাশের সবাই ছিটকে নদীতে পড়তে থাকেন। তার ওপরে পড়েন ১০ থেকে ১২ জন যাত্রী। কিছু বুঝে ওঠার আগেই লঞ্চটি ডুবে গেল। তার চোখের সামনেই অনেক যাত্রীকে ডুবে যেতে দেখেন। এ সময় তিনি কোনো রকমে সাঁতরে তীরে উঠতে পারায় অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পান বলে জানান জাহাঙ্গীর হোসেন।

ওমর চান নামের অন্য এক যাত্রী জানান, ময়ূর-২ লঞ্চটি সামনের অংশ দিয়ে মর্নিংবার্ডকে ধাক্কা দিলে সঙ্গে সঙ্গেই উল্টে যায়। তিনি জীবন বাঁচাতে পানিতে লাফিয়ে পড়েন। ডুবে যাওয়া একাধিক যাত্রী পানির নিচ থেকে বাঁচার জন্য তাকে টেনে ধরে ছিলেন। আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে কোনো রকমে তিনি প্রাণে রক্ষা পেয়েছেন। ফকির চান নামে বেঁচে যাওয়া অন্য এক যাত্রী বলেন, আকস্মিক লঞ্চটিতে বিকট একটি শব্দ শুনতে পান এবং মুহূর্তেই সেটি পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে বুঝতে পেরে পানিতে ডুবন্ত অবস্থায় সূর্যের আলো দেখতে পাচ্ছিলেন তিনি। এ সময় পানির নিচ থেকে কোনোরকমে বেরিয়ে আসেন তিনি। তবে তার সঙ্গে থাকা অন্য যাত্রী নিখোঁজ হয়ে যায় বলেও জানান তিনি।

লঞ্চডুবিতে বেঁচে যাওয়া যাত্রী জুমকি আক্তার, কাকলী বেগম, নাজমা আক্তার, মমিন আলী, গোলাপ হোসেন জানালেন, মুহূর্তেই মর্নিংবার্ড লঞ্চটি বুড়িগঙ্গায় ডুবে যাওয়ার মর্মান্তিক মুহূর্তের কথা। এ সময় তারা খুব কাছ থেকে মৃত্যুকে দেখার এমন পরিস্থিতিতে আর কখনও পড়েননি বলেও জানান।

যাত্রী নাজমা আক্তার বলেন, চিকিৎসা নেওয়ার জন্য ঢাকায় যাচ্ছিলেন তিনি। ঘটনার সময় লঞ্চটি যে পাশ দিয়ে ডুবে যাচ্ছিল তার বিপরীত পাশের জানালা দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারায় তিনি প্রাণে বেঁচে গেছেন। চোখের সামনে পরিচিত মুখগুলো মুহূর্তের মধ্যে লাশ হওয়ার দৃশ্য এখনও চোখ বুজলেই ভেসে উঠছে।

সদর উপজেলার রামপাল ইউনিয়নের শাখারীবাজার এলাকার গোলাপ মিয়া বলেন, তার ১০ বছরের ছেলে তামিমের কিডনি সমস্যা থাকায় চিকিৎসার জন্য তাকে নিয়ে স্ত্রী ও শ্বশুর মর্নিংবার্ড লঞ্চে ঢাকায় যাচ্ছিলেন। লঞ্চডুবির খবর পেয়ে স্ত্রী ও শ্বশুরের মোবাইলে কল করে বন্ধ পাওয়া যায়। দুপুর আড়াইটার দিকে জানতে পারি, সবাই মারা গেছে লঞ্চডুবিতে। এ সময় কান্নাজড়িত কণ্ঠে গোলাপ মিয়া বলেন, যদি জানতাম ছেলেকে চিকিৎসা করাতে গিয়ে সবাইকে হারাব তাহলে কোনো দিনও পাঠাতাম না। অন্যদিকে মিরকাদিমের মো. আনোয়ার হোসেন নামে এক ব্যক্তি বলেন, তার ভাগ্নে ফাহিম, তার স্ত্রীর ভাই গোলাম হোসেন এবং আত্মীয় শাহাদাত হোসেন লঞ্চ দুর্ঘটনার পর নিখোঁজ হন। দুপুরে জানতে পারি, তারা সবাই মারা গেছে।

অন্যদিকে লঞ্চডুবিতে বেঁচে যাওয়া যাত্রী, মৃত্যবরণ করা যাত্রীদের স্বজন ও স্থানীয় এলাকাবাসীর অভিযোগ, ফিটনেসবিহীন লঞ্চ, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, অদক্ষ লঞ্চ চালক এবং ঘাতক ময়ূর-২ লঞ্চের চালকের গাফিলতির কারণেই ঢাকার বুড়িগঙ্গায় লঞ্চডুবির ঘটনা ঘটেছে।

মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. মনিরুজ্জামান তালুকদার জানান, লঞ্চটিতে কতজন যাত্রী ছিল। এর মধ্যে কতজন মারা গেছে এবং কতজন জীবিত ফিরেছে- তার সঠিক তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলমান রয়েছে। তবে লঞ্চডুবিতে মারা যাওয়া পরিবারগুলোকে সরকারি সাহায্য-সহযোগিতা করা হবে বলেও জানান জেলা প্রশাসক।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকার বুড়িগঙ্গায় লঞ্চডুবির ঘটনায় সলিল সমাধি হওয়া যাত্রীদের বেশিরভাগ মুন্সীগঞ্জের মিরকাদিম পৌরসভার পশ্চিমপাড়া, গোয়ালঘূর্ণি, রিকাবীবাজার, কাঠপট্টি, রামপাল, রামশিং, সিপাহীপাড়া, বজ্রযোগিনী ও টঙ্গিবাড়ী উপজেলার আব্দুল্লাপুর, সলিমাবাদ গ্রামসহ আশপাশের এলাকার। এ পর্যন্ত ১৯ যাত্রীকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।