সরকার বাজেট বাস্তবায়নে ব্যর্থ হবে না : প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২০

সমকাল প্রতিবেদক

সরকার বাজেট বাস্তবায়নে ব্যর্থ হবে না : প্রধানমন্ত্রী

সোমবার সংসদে বাজেট আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা- পিআইডি

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যেই এবারের বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। বাজেট বাস্তবায়নে তার সরকার অতীতেও ব্যর্থ হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে না। তিনি বলেন, যতই ঝড়ঝঞ্ঝা, দুর্যোগ ও মহামারি হোক না কেন, এসবের অর্থনৈতিক প্রভাব কাটিয়ে উঠে দেশ পুনরায় উন্নয়নের অভিযাত্রায় শামিল হবে।

গতকাল সোমবার সংসদে ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব মন্তব্য করেন সংসদ নেতা শেখ হাসিনা। এর আগে সকাল ১১টায় স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হয়। বাজেট আলোচনার শেষ দিনে আরও অংশ নেন বিরোধীদলীয় উপনেতা ও জাতীয় পার্টির চেয়ারমান জি এম কাদের এবং আওয়ামী লীগের সিনিয়র এমপি ও সাবেক কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতি একটি ক্রান্তিলগ্নের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই সমস্যা শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বব্যাপী এই সমস্যা। মহামারি কভিড-১৯ মহাদুর্যোগের কারণে আজকে বিশ্ব অর্থনীতি মহামন্দার দ্বারপ্রান্তে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০২০ সালে বৈশ্বিক অর্থনীতি চার দশমিক ৯ শতাংশ সংকুচিত হবে বলে প্রাক্কলন দিয়েছে। করোনার প্রভাবে বিশ্বব্যাপী ১৯ কোটি ৫০ লাখ কর্মীর চাকরি হ্রাস, বৈশ্বিক এফডিআই প্রবাহ ৫ থেকে ১৫ শতাংশ হ্রাস এবং বৈশ্বিক রেমিট্যান্স ২০ শতাংশ হ্রাস পাবে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ঘোষণা দিয়েছে। ঠিক এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে বাজেট প্রণয়ন অত্যন্ত কঠিন ও দুরূহ কাজ ছিল।

তবে সব বাধা অতিক্রম করে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে বলে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রতি বছর ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে যুক্ত হচ্ছে। তাদের জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা সরকারের চ্যালেঞ্জ। তাই নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যেই এ বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সামনে যে সংকটই আসুক না কেন আওয়ামী লীগ সরকার তা শক্তভাবে মোকাবিলা করবে এবং দেশের কোনো মানুষকে অভুক্ত থাকতে দেবে না। আওয়ামী লীগ কখনও হতাশায় ভোগে না।

তিনি বলেন, বিশ্বের অন্য দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও কভিড-১৯-এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এসব বিবেচনায় নিয়ে চলতি অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার সংশোধন করে ৫ দশশিক ২ শতাংশ প্রাক্কলন করা হয়েছে। ২০২১ সালে বিশ্ব এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি কভিড রোগের প্রভাব থেকে ধীরে ধীরে বের হয়ে আসবে বলেও তিনি আশাবাদ বক্ত করেন। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের অর্থনীতি আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসবে ধরে নিয়ে আগামী ২০২০-২১ অথর্বছরের বাজেটে প্রবৃদ্ধির হার প্রাক্কলন করা হয়েছে ৮ দশমিক ২ শতাংশ। প্রবৃদ্ধির এই হার প্রাক্কলনের ক্ষেত্রে আগামী অক্টোবর-নভেম্বরে করোনার টিকা আবিস্কার, দেশের অর্থনৈতিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত না হওয়া, কর্মসৃজন ও ব্যক্তি আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধি ও প্রণোদনার প্যাকেজের কারণে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা মহামারির পূর্বাবস্থায় চলে আসা এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী আয়ে বর্তমান সংকট কেটে যাওয়ার সম্ভাবনার কথা জানান সরকারপ্রধান।

প্রধানমন্ত্রী তার ঘোষিত এক লাখ তিন হাজার ১১৭ কোটি টাকার ১৯টি প্রণোদনা প্যাকেজের কথা তুলে ধরে বলেন, দেশের ব্যাপক জনগোষ্ঠী যেন উপকৃত হয় সে লক্ষ্য নিয়েই পরিকল্পিতভাবে এবং আগেভাগেই প্রতিটি প্রণোদনা প্যাকেজ প্রণয়ন করা হয়েছে। প্যাকেজসমূহ বাস্তবায়ন শুরু হওয়ায় ইতোমধ্যে পাঁচ কোটি ৭০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষভাবে সুবিধা পেয়েছে এবং ১৯টি প্যাকেজ সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হলে ১২ কোটি ৫৫ লাখ মানুষ সুবিধা পাবে। এ ছাড়াও, প্রায় এক কোটি ৬০ লাখ কর্মসুরক্ষা ও নতুন কর্ম সৃজন হবে।

তিনি বলেন, করোনা-পরবর্তী পরিস্থিতিতে কোনোভাবেই যাতে খাদ্য সংকট সৃষ্টি না হয় সে জন্য এক ইঞ্চি আবাদি জমিও ফেলে রাখা যাবে না। কারণ বিশ্বব্যাপী দুর্ভিক্ষ হতে পারে। এ সময় বাংলাদেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা যেন নিশ্চিত হয় সেই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এ সময় কৃষি খামার যান্ত্রিকীকরণ, খাদ্যশস্য সংরক্ষণের স্থান বৃদ্ধি ও মান উন্নয়নের ব্যবস্থার কথা জানান। আগামী অর্থবছরে রাসায়নিক সারের বিক্রয়মূল্য অপরিবর্তিত রাখা ও কৃষি প্রণোদনা প্রদান অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

সংসদ নেতা বলেন, করোনাভাইরাসের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা সীমিত হয়ে আসায় খাদ্যশস্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট ও মূল্যবদ্ধির আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। সংকটের শুরু থেকেই এ বিষয়ে যথেষ্ট সজাগ ছিল সরকার।

তিনি বলেন, দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য খাদ্য সহায়তা অব্যাহত রাখতে তার সরকার সক্ষম হয়েছে। আগামী অর্থবছরেও খাদ্যশস্যের সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ পরিমাণ ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করা হয়েছে।

শেখ হাসিনা বলেন, গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখতে সমাজসেবা কার্যক্রমের জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। করোনা পরিস্থিতিতে ত্রাণ কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সারাদেশে দেড় কোটির বেশি পরিবারকে ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। সম্প্র্রতি ঘূর্ণিঝড় আম্পানের সময়ে আমাদের যথেষ্ট প্রস্তুতি থাকায় এবং দ্রুত ত্রাণ তৎপরতা শুরু করতে পারায় আমরা তা সফলভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হয়েছে। এবারের বাজেটে শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রমের গুণগত মান উন্নয়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। আগামী অর্থবছরের মধ্যে দেশের শতভাগ এলাকা বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় চলে আসবে বলেও জানান তিনি। ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ ও চাহিদা মেটাতে ২০৪১ সালের মধ্যে ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির কথা পুনরুল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি অব্যাহত থাকবে, এক্ষেত্রে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। দুর্নীতি সমূলে উৎপাটন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ। দেশের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে এবং আমাদের অর্জনসমূহ সমুন্নত রাখতে সরকার দুর্নীতিবিরোধী লড়াই অব্যাহত রাখবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব এবং মুদ্রাস্টম্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে এবং মুজিববর্ষের উপহার হিসেবে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা ৫০ হাজার টাকা বৃদ্ধি এবং করহার কিছুটা হ্রাস করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়াও করপোরেট ট্যাক্সের হার দুই দশমিক ৫ শতাংশ হ্রাস করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে নিম্নআয়ের মানুষের জীবনযাত্রায় স্বাচ্ছন্দ্য আসবে এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে।

করোনাভাইরাস মোকাবিলায় আরও চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীর পদ সৃষ্টি ও নিয়োগের কথা জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, শিগগিরই আরও চার হাজার নার্স নিয়োগ দেওযা হচ্ছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে এ বিষয়ে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার জন্য অল্প সময়ের মধ্যে দুই হাজার ডাক্তার ও ছয় হাজার নার্স নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আরও দুই হাজার চিকিৎসকের পদ সৃষ্টি করা হয়েছে।

সংসদ নেতা বলেন, যন্ত্রপাতি, টেস্ট কিট, সরঞ্জামাদি কেনাসহ চিকিৎসা সুবিধা আরও বাড়ানোর লক্ষ্যে দ্রুততম সময় দুই হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আরও একটি প্রকল্প চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এগুলো বাস্তবায়ন হলে করোনা মোকাবিলায় আমাদের সামর্থ্য আরও বাড়বে।

কডিড-১৯ মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বিভাগের আওতায় পাঁচ হাজার পাঁচ কোটি টাকার বিশেষ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ ছাড়া ১০ হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বাজেটে বরাদ্দের দিক থেকে স্বাস্থ্য বিভাগের অবস্থান পঞ্চম। এটি গত অর্থবছরে ছিল অষ্টম স্থানে। সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার মানুষকে সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। নিজেকে সুরক্ষিত রাখা ও সেইসঙ্গে অন্যকে সুরক্ষা দেওয়া এটা প্রত্যেকের দায়িত্ব।