করোনা পরীক্ষার অনুমতি স্থগিত করা হয়েছিল। এর পরও তা করা হচ্ছিল রাজধানীর গুলশান-২-এ সাহাবউদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এ ছাড়া অনুমতি না নিয়েই অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করে আসছিল র‌্যাপিড কিট দিয়ে। এসব অভিযোগে গতকাল রোববার বিকেল পৌনে ৩টায় র‌্যাব-১ অভিযান চালিয়েছে হাসপাতালটিতে।

এ সময় হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. আবুল হাসনাত ও ইনভেন্টরি অফিসার শাহরিজ কবির সাদিকে আটক করা হয়েছে। জব্দ করা হয়েছে কিছু কিট এবং সার্জিক্যাল সামগ্রী। অভিযানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর অংশ নেয়। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন র‌্যাব সদর দপ্তরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারওয়ার আলম।

এর আগে করোনাভাইরাস কেলেঙ্কারিতে উত্তরার রিজেন্ট হাসপাতাল ও জেকেজিতে অভিযান চালায় র‌্যাব। গ্রেপ্তার করা হয় রিজেন্ট হাসপাতালের কর্ণধার সাহেদ ওরফে সাহেদ করিম এবং জেকেজির আরিফ চৌধুরী এবং ডা. সাবরিনা চৌধুরীকে।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই অভিযান পরিচালনা করা হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কোনো নিয়ম না মেনেই তারা করোনা পরীক্ষা করছিল।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম বলেন, সরকারের অনুমোদন ছাড়াই সাহাবউদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল করোনা টেস্ট শুরু করে। তাদের কোনো আরটিসিআর ল্যাব নেই। ডিভাইসের মাধ্যমে টেস্ট করেছে। টেস্টের নামে মানুষের কাছ থেকে সাড়ে চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা নিয়েছে তারা প্রতিজনের কাছ থেকে। ডিভাইসের খরচ মাত্র ২০০ টাকা। এ ছাড়া অনেক টেস্ট না করিয়েও রিপোর্ট দিয়ে টাকা আদায় করেছে। পরে তারা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছ থেকে অনুমোদন নিয়েছিল করোনা টেস্টের জন্য। কিন্তু তাদের আরটিসিআর ল্যাব নেই, যে কারণে .পাঁচ-ছয় দিন আগে করোনা টেস্টের অনুমোদন বাতিল করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এরপরও পরীক্ষা চালিয়ে আসছিল। কভিড নেগেটিভ রোগীকে পজিটিভ সার্টিফিকেট দিয়ে ভর্তি করে আইসিইউ এবং কেবিনে ভর্তি করে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করেছে। একজন রোগীর আগের দিন এসেছে পজিটিভ। কিন্তু তার সন্দেহ হওয়ায় অন্য জায়গা থেকে পরীক্ষা করে দেখেন নেগেটিভ। তাকে করোনার ওষুধ না দিয়েও ফাইলে ওষুধ লিখে যাচ্ছে এবং বিল করছে। এক রোগী গত ২৪ জুন ভর্তি হন এবং ২৫ জুন ছাড়পত্র নেন। একদিনে বিল হয়েছে এক লাখ ৩৯ হাজার টাকা। একই পরীক্ষার বিল তিনবার ধরা হয়েছে। সব রোগীর ক্ষেত্রেই একই ঘটনা ঘটেছে।

সারওয়ার আলম আরও বলেন, অপারেশন থিয়েটার থেকে বিপুল পরিমাণ মেয়াদোত্তীর্ণ সার্জিক্যাল আইটেম পাওয়া গেছে। তাদের ল্যাবে অনেকগুলো নমুনা পাওয়া গেছে। এগুলোর কিছু তারা বাইরে থেকে পরীক্ষা করছে। অন্যগুলো তারা শুধু বিল করার জন্য ভুয়া রিপোর্ট তৈরি করছে। এখানে অনুমোদনহীন ওষুধ পাওয়া গেছে। এসব ওষুধ বাংলাদেশের আইনে বিক্রি এবং রোগীকে দেওয়া নিষেধ।

এই হাসপাতালের এক বছর ধরে কোনো লাইসেন্স নেই। এখানে স্পর্শকাতর কিছু রোগী রয়েছেন। তাদের অন্যত্র সরানোর পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যেহেতু হাসপাতালের লাইসেন্স নেই এবং অনেকগুলো অপরাধ করেছে, সেহেতু হাসপাতালটি সিলগালা করা হবে। হাসপাতালের ফার্মেসিতে অনুমোদনহীন ওষুধ পাওয়ায় দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মেডিকেল অফিসার দেওয়ান মেহেদী হাসান বলেন, এক সপ্তাহ আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি টিম অভিযানে আসে। সে সময় র‌্যাপিড টেস্টের বিষয় এবং পরীক্ষা না করেই রিপোর্ট প্রদানের বিষয়টি তাদের বলা হয়। পরে র‌্যাবের সহযোহিতা নিয়ে অভিযানটি চালানো হয়।

র‌্যাব জানিয়েছে, হাসপাতালটির করোনাভাইরাস অ্যান্টিবডি পরীক্ষারও অনুমতি নেই। অথচ সেখানে অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করা হচ্ছে।

সাহাবউদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক মনসুর আলী অনুমতি স্থগিতের বিষয়টি স্বীকার করে জানান, নিজেদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অ্যান্টিবডি নির্ণয়ের জন্য বিদেশ থেকে শ'খানেক কিট আনা হয়। এখনও পরীক্ষা করা হয়েছে কিনা তা জানা নেই তার।

র‌্যাব সূত্র জানিয়েছে, এ হাসপাতালের মেয়াদ ছিল ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত। এরপর এক বছর পেরিয়ে গেলেও এর কর্তৃপক্ষ নবায়ন করার জন্য কোনো আবেদন করেনি। রিজেন্ট হাসপাতালে অভিযানের পর চলতি মাসের ১৩ জুলাই নবায়নের আবেদন করে এ হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ। তবে সেটি এখনও নবায়ন হয়নি। অ্যান্টিবডি পরীক্ষার নামে রোগীদের কাছ থেকে তিন থেকে ১০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে হাসপাতালটির বিরুদ্ধে। অ্যান্টিবডি পরীক্ষার জন্য কিট কোথা থেকে আনা হয়েছে, তাও বলতে চাইছে না কর্তৃপক্ষ। তারা র‌্যাবের অভিযানের শুরু থেকেই বলে আসছে, এ ধরনের কোনো কিট তারা ব্যবহার করছে না। তাদের কাছে কোনো কিট বা ডিভাইস নেই। হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারেও অভিযান চালায় র‌্যাব। সেখানে ২০০৯ সালের মেয়াদোত্তীর্ণ সার্জিক্যাল সামগ্রী পাওয়া গেছে, যা অ্যানেস্‌থেসিয়া করার সময় গলায় দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটি শুধু ভুয়া পরীক্ষা করছে না, যেসব মেডিকেল ইকুইপমেন্ট একবারের বেশি ব্যবহার করা যায় না, সেগুলোও একাধিকবার ব্যবহার করছে। দেখা গেছে, তারা এসব সামগ্রী হাঁড়ি-পাতিলে পাউডার মিশিয়ে স্যানিটাইজ করছে, যা একটি বড় অনিয়ম।

র‌্যাবের হাতে আটক হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. আবুল হাসনাত বলেন, তারা শুধু একটি অ্যান্টিবডি টেস্ট করেছেন। ডা. নারায়ণ ভৌমিক এই কিট নিয়ে এসেছেন তার অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করানোর জন্য। প্লাজমা দেবেন বলেই তিনি এই পরীক্ষা করিয়েছিলেন। করোনার নমুনা পরীক্ষার কোনো রিপোর্ট দেওয়া হয়নি।

মেয়াদোত্তীর্ণ সার্জিক্যাল সামগ্রী :র‌্যাবের অভিযানের সময় হাসপাতালটির অপারেশন থিয়েটারে মেয়াদোত্তীর্ণ পাঁচটি সার্জিক্যাল সামগ্রী পাওয়া গেছে। যেগুলো অপারেশনের সময় রোগীদের অজ্ঞান করার কাজে ব্যবহূত হতো। এগুলো যাচাই করে দেখা গেছে, কোনোটির মেয়াদ ২০০৯ সালে, আবার কোনোটির ২০১১ সালেই শেষ হয়ে গেছে। হাসপাতালের বাকি চারটি অপারেশন থিয়েটার তালাবদ্ধ। অভিযানে উপস্থিত ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, এসব সার্জিক্যাল সামগ্রী অপারেশন করার সময় রোগীর গলার ভেতর ঢোকানো হয়। তবে এই সামগ্রীগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় 'রোগীর মৃত্যুঝুঁকি' রয়েছে। রাত সাড়ে ১০টায় অভিযান শেষ হয়।

মন্তব্য করুন