ওদের ঘরে বিষাদের ছায়া

প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২০

জয়নাল আবেদীন

সাত মাসের শিশু মাহিয়া কিছুই বোঝে না। তবে ঈদ বোঝে সাত বছরের মাইশা। ঈদের আগে সে নতুন জামার বায়না ধরেছে মায়ের কাছে। মা রিজিয়া সুলতানার সাধ্য নেই ছোট্ট মেয়েটির বায়না পূরণ করার। তার স্বামী ডা. মহিউদ্দিন পারভেজ মারা গেছেন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে। তবে এই শোক গেঁথে আছে ১০ বছরের মেয়ে মালিহার মনে। বিষণ্ণ মনে সারাক্ষণ চুপচাপ থাকে সে।

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নের আবদুল্লাহপুর গ্রামে তাদের বাড়ি। গত ১৮ জুন রাজধানীর মালিবাগে প্রশান্তি হাসপাতালে মারা যান মহিউদ্দিন পারভেজ। সুবর্ণচরে পশু চিকিৎসক হিসেবে কাজ করতেন তিনি। তাকে হারিয়ে দিশেহারা পরিবারটি এখন পথে বসার উপক্রম। তাদের কোনো ঈদ নেই, আছে শুধুই শূন্যতা।

শুধু পারভেজ নন, করোনা ট্র্যাজেডির শিকার হয়ে দেশে ও প্রবাসে মৃত্যুর মিছিলে হারিয়ে গেছেন সাড়ে চার হাজারের বেশি বাংলাদেশি। আগামীকাল শনিবার পবিত্র ঈদুল আজহা। করোনা পরিস্থিতিতে দেশে দ্বিতীয়বারের মতো শোকের পরিবেশে পালিত হচ্ছে ঈদ। বৈরী পরিবেশেও ঘরে ঘরে ঈদের আনন্দ কিছুটা হলেও দেখা যায়। তবে এর ছিটেফোঁটাও নেই করোনার ভয়াল ছোবলের শিকার পরিবারগুলোতে। উল্টো ঈদ এলে তাদের পরিবারে আনন্দের বদলে শোকটাই বেশি ফুটে ওঠে। উচ্ছ্বাসের পরিসমাপ্তি ঘটে অশ্রুপাতে। স্বামীকে বাঁচানোর প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন রিজিয়া। হাসপাতালে কয়েকদিনের চিকিৎসায় দুই লাখ টাকার বেশি ব্যয় হয়ে

গেছে। স্বামীকে হারানোর পর তিন কন্যাকে নিয়ে অকূলপাথারে আছেন তিনি। গতকাল বৃহস্পতিবার মুঠোফোনে আলাপকালে রিজিয়া সমকালকে বলেন, 'আমাদের তো ঈদ নেই। তিন মেয়েকে নিয়ে সামনের দিনগুলোয় খেয়ে-পরে কীভাবে বেঁচে থাকব, সেই চিন্তায় ঘুম আসে না। কত আশা ছিল মেয়েদের শিক্ষিত করব। সব আশাই দুরাশা হয়ে গেছে। কেমন করে মেয়েদের বড় করব, পড়াশোনা করাব! কখনও ভাবতেই পারিনি এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হবে।'

করুণ শোকের আবহ কেরানীগঞ্জের বাসিন্দা জাকির হোসেন পাঠানের পরিবারেও। ৭ মে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান জাকির। পুরান ঢাকার একটি মুদি দোকানে চাকরি করতেন। স্ত্রী ও চার সন্তানকে নিয়ে কোনোমতে কেটে যেত। কিন্তু জাকিরের মৃত্যুর পর ভীষণ হতাশ হয়ে পড়েন তার স্ত্রী শাহনাজ বেগম। স্বামীর মৃত্যুর কয়েকদিন পরই এসেছিল ঈদুল ফিতর। সন্তানরা খুব মন খারাপ করেছিল সেদিন। এবারও ঈদ এসেছে। আবারও তাদের ঘরে নতুন করে জিইয়ে উঠেছে প্রিয়জন হারানোর শোক।

শাহনাজ বলেন, 'বড় তিন ছেলেমেয়ে সবই বোঝে। ওরা লুকিয়ে কাঁদে। ঈদ এলে বাবার সঙ্গে গিয়ে কেনাকাটা করত নিজেদের পছন্দমতো। এখন থেকে তা আর সম্ভব না। দুই বছরের ছেলেটি তো ঈদ বোঝে না। তবে বাবা-বাবা করে সারাক্ষণ ঘরটা মাতিয়ে তোলে। তখন আরও বেশি খারাপ লাগে। কোনো সঞ্চয় নেই। আত্মীয়স্বজনের সহায়তায় কোনোমতে চলে যাচ্ছে। কিন্তু এভাবে কতকাল যাব। চার সন্তানকে নিয়ে কীভাবে বেঁচে থাকব, এটাই বড় চিন্তা।'

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দেশে করোনাভাইরাসে প্রাণ হারিয়েছেন তিন হাজার ৮৭ জন। এ পর্যন্ত দুই লাখ ৩৪ হাজার ৮৮৯ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে এক লাখ ৩২ হাজার ৯৬০ জন সুস্থ হয়েছেন। দেশে এখনও ৯৮ হাজার ৮৪৬ জন করোনাভাইরাসের সঙ্গে লড়ছেন। অনেকেই আছেন আইসোলেশনে কিংবা কোয়ারেন্টাইনে। তাদের ঘরেও ঈদের কোনো আমেজ নেই।

এদিকে, করোনাভাইরাসে মৃত্যুর মিছিলে যুক্ত হয়েছে অনেক খ্যাতিমানও। রাজনীতিবিদ, কবি-সাহিত্যিক, শিক্ষক, চিকিৎসক, ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেক সদস্য এ তালিকায় রয়েছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য- শিক্ষাবিদ জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ, সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী আনোয়ারুল কবির, সাবেক সাংসদ মকবুল হোসেন, যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম বাবুল, ফারইস্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ড. নাজমুল করিম, সানবিম স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ নিলুফার মঞ্জুর, ইবনে সিনা হাসপাতালের চিকিৎসক মেজর জেনারেল (অব.) আবুল মোকারিম প্রমুখ। তাদের ঘরেও ঈদের আমেজের বদলে শোকের আবহ।

অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। এ পর্যন্ত অন্তত দেড় হাজার প্রবাসী করোনায় মারা গেছেন বলে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান নিশ্চিত করেছেন। এদের প্রায় অর্ধেকই সৌদি আরব প্রবাসী। প্রবাসীদের ঘরে ঘরেও বিরাজ করছে স্বজন হারানোর শোক আর শূন্যতা।

গত ২৫ জুন সৌদি আরবে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান কুমিল্লার শাহপরাণ ভূঁইয়া (৪৮)। মনোহরগঞ্জ উপজেলার কেয়ারী গ্রামের ভূঁইয়া বাড়ির শাহপরাণকে হারিয়ে তার পরিবার এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি। তার ছোটভাই বাবলু জানান, শাহপরাণের দুই ছেলে এক মেয়ে। ছোট ছেলের বয়স পাঁচ বছর। দূরে থাকায় ছোট ছেলেটি বাবার সঙ্গে প্রতিদিন ভিডিওকলে কথা বলত। গত ঈদুল ফিতরেও তাদের ঘরে আনন্দের সীমা ছিল না। পরিবারের সবাই ভিডিওকলে কথা বলেছিলেন। এই ঈদেও তেমনই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু করোনা ট্র্যাজেডি তা হতে দিল না। শাহপরাণকে ঘিরে ছিল তাদের সুখস্বপ্ন। সবই কেড়ে নিয়েছে করোনাভাইরাস।