কমছে বন্যার পানি, বাড়ছে দুর্ভোগ

প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২০

সমকাল ডেস্ক

দু'এক জেলা বাদে দেশের বিভিন্ন এলাকার নদনদীর পানি কমতে শুরু করেছে। এতে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি হলেও দুর্ভোগ কমেনি দুর্গতদের। দফায় দফায় বন্যায় ৩১ জেলার প্রায় ৫০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বানভাসিরা এখনও ঘরে ফিরতে পারেনি। কারণ অধিকাংশ এলাকায় মানুষের ঘরবাড়ি পানির নিচে। রাত পোহালে ঈদ। অথচ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও উঁচু সড়কে আশ্রয় নেওয়া বানভাসিদের মধ্যে নেই ঈদের আনন্দ। একই অবস্থা ভাঙনের শিকার নদীতীরের বাসিন্দাদের। এদিকে বন্যা ও ভাঙনকবলিত এলাকায় খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির জন্য হাহাকার শুরু হয়েছে। দুর্গত এসব মানুষের জন্য সরকারিভাবে নামমাত্র দেওয়া হয়েছে ত্রাণসামগ্রী। কোনো কোনো এলাকায় তা-ও পৌঁছেনি। করোনার কারণে এবার দুর্গতদের জন্য নেই বেসরকারি ও সামাজিক উদ্যোগ। ফলে বন্যা ও ভাঙনকবলিত এলাকায় দেখা দিয়েছে মানবিক বিপর্যয়। প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর :

মুন্সীগঞ্জ :পদ্মা ও মেঘনার মতো মুন্সীগঞ্জের ধলেশ্বরী নদীতেও পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। গত এক সপ্তাহে ধলেশ্বরীতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় মুক্তারপুর এলাকাসহ কয়েকটি পয়েন্টে শহর রক্ষা বাঁধ উপচে বানের পানি প্রবেশ করার উপক্রম হয়েছে। বর্তমানে পানি বাঁধ ছুঁই ছুঁই অবস্থায় থাকায় মুক্তারপুর এলাকায় ভেঙে যাওয়া স্থানে বাঁশের কঞ্চি ও বালুর বস্তা দিয়ে শহর রক্ষা বাঁধটি ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

গাইবান্ধা :ব্রহ্মপুত্র, ঘাঘট, করতোয়াসহ সব নদীর পানি কমতে থাকায় গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি, সাঘাটা, গোবিন্দগঞ্জ, সাদুল্যাপুর ও সদর উপজেলার চরাঞ্চল থেকে পানি নেমে যাচ্ছে। এসব এলাকার বেশিরভাগ ঘরবাড়ি থেকে পানি নেমে গেলেও এখনও অনেক বাড়িঘর পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে। ফলে বাঁধসহ বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নেওয়া বন্যার্তরা ঘরে ফিরতে পারছে না। অনেকেই আবারও নতুন করে বন্যার আশঙ্কা করছে। জেলা প্রশাসনের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জেলার ৬টি উপজেলার ৪৪টি ইউনিয়ন বন্যাকবলিত হয়েছে। এসব এলাকার ২ লাখ ৫০ হাজার ৭৮৬ ব্যক্তি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

গোপালগঞ্জ :গোপালগঞ্জে মধুমতী, কুমার, ঘাঘর, বাঘিয়ারকুল, শৈলদহ নদী ও এমবিআর চ্যানেলে অস্বাভাবিকভাবে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে জেলার ৫ উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। নিম্নাঞ্চলের বাড়িঘরে পানি উঠেছে। রাস্তাঘাট পানিতে ডুবে গেছে। অনেকে মাচায় আশ্রয় নিয়েছে। এসব এলাকার মানুষ পরিবার-পরিজন, গবাদি পশু, সবজি ক্ষেত, মাছের ঘের নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছে। কাশিয়ানী উপজেলার সিঙ্গা গ্রামের বেশ কয়েকটি পরিবার সিঙ্গা স্কুলে আশ্রয় নিয়েছে।

রাজবাড়ী :পদ্মা নদীর পানি কমায় রাজবাড়ীতে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। পানি কমলেও এখনও বিপদসীমার অনেক ওপরে অবস্থান করছে। যদিও পানি আবারও বাড়তে পারে বলে আভাস দিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্মকর্তারা। রাজবাড়ী জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় রাজবাড়ী জেলার তিনটি পয়েন্টেই কমেছে পদ্মা নদীর পানি। দু-একদিন কমে আবারও বাড়তে পারে।

এদিকে বন্যা উপদ্রুত এলাকায় এখনও বিশুদ্ধ পানির সংকট রয়ে গেছে। দেখা দিয়েছে চর্মরোগসহ নানান অসুখ। কেউ কেউ খাদ্য সংকটেও ভুগছেন।

নেত্রকোনা :জেলার বিভিন্ন নদনদীর পানি কিছুটা কমতে শুরু করেছে। বাড়ছে পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ। প্রায় এক মাস ধরে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক মঈনউল ইসলাম বলেন, জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পানিবন্দি মানুষের মাঝে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নগদ টাকা, শুকনো খাবারসহ ত্রাণসামগ্রী দেওয়া হয়েছে।

লৌহজং (মুন্সীগঞ্জ) :বন্যা ও নদীভাঙনে নাকাল মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার মানুষ। অতিবৃষ্টি ও উজানের অতিরিক্ত পানিপ্রবাহের কারণে পদ্মা মাওয়া পয়েন্টে নদীর পানি বিপদসীমার ৭২ এবং ভাগ্যকূল পয়েন্টে ৭৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের সবক'টি বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। এসব ইউনিয়নের ৫৯টি গ্রামের ১৬ হাজারের বেশি পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। জেলার মাওয়া-বালিগাঁও-মুন্সীগঞ্জ সড়কের মালির অঙ্ক বাজারের পশ্চিম অংশ ভেঙে গেছে। ফলে ৭-৮ দিন ধরে উপজেলার সঙ্গে জেলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। এক সপ্তাহে ৩ শতাধিক বাড়ি পদ্মায় তলিয়ে গেছে। পদ্মার চরের বেশিরভাগ বাড়িতে পানি ঢুকে পড়েছে। ভাঙনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চরের বাসিন্দারা বাড়িঘর অন্যত্র সরিয়ে নিতে হিমশিম খাচ্ছেন।

তাড়াশ (সিরাজগঞ্জ) :গত ২৪ ঘণ্টায় তাড়াশ উপজেলা পরিষদের সরকারি আবাসিক এলাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চল হাঁটুপানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে ওই এলাকায় বসবাসকারীদের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে।

তাড়াশ উপজেলার সরকারি আবাসিক ভবনে বসবাসরত প্রাথমিক সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মাহমুদুল হক জানান, উপজেলা চত্বরের অনেক আবাসিক ভবনের নিচতলায় মেঝেতে পানি উঠে যাওয়ায় বসবাস করা পরিবারগুলো বিপাকে পড়েছে। সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) :সুন্দরগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি হলেও এখন পর্যন্ত চরের বসতবাড়ি থেকে বন্যার পানি নেমে যায়নি। যার কারণে বাড়ি ফিরতে পারছে না তারা। উপজেলার বিভিন্ন চরে বন্যার তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। জানা গেছে, দ্বিতীয় দফা বন্যায় উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের বিভিন্ন চরের কমপক্ষে ১২ হাজার পরিবারের ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি।

কমলনগর (লক্ষ্মীপুর):মেঘনা নদীর ভাঙনকবলিত লক্ষ্মীপুরের কমলনগর ও রামগতি উপজেলার সাতটি গ্রামের প্রায় ১৫ হাজার মানুষের মাঝে ঈদের আনন্দ নেই। দেশের অন্যসব গ্রামের বাসিন্দারা যখন ঈদের আনন্দে ভাসছে; ঠিক সেই সময় ওই সাতটি গ্রামের বাসিন্দারা ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজতে। ভাঙনকবলিত গ্রামগুলো হলো- কমলনগর উপজেলার নাছিরগঞ্জ, কাদির পণ্ডিতের হাট, লুধুয়া ফলকন, পাটারীরহাট এবং রামগতি উপজেলার সুজনগ্রাম, জনতা বাজার ও মুন্সীরহাট।

ইন্দুরকানী (পিরোজপুর) :অব্যাহত ভাঙনের কারণে ইন্দুরকানী উপজেলার সাঈদখালী গুচ্ছগ্রাম, খোলপটুয়া জাপানি ব্র্যাক, চাড়াখালী গুচ্ছগ্রাম, পাড়েরহাট আবাসন প্রকল্পসহ নদীতীরের প্রায় ৩ হাজার পরিবারের মাঝে নেই ঈদের আমেজ।