ঝুঁকিপূর্ণ ঈদযাত্রা

প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২০     আপডেট: ৩১ জুলাই ২০২০

রাজবংশী রায়

ঝুঁকিপূর্ণ ঈদযাত্রা

স্বজনের সঙ্গে ঈদ উদযাপনে রাজধানী ছাড়ছে মানুষ। করোনার সংক্রমণ ঝুঁকির মধ্যেই ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে সদরঘাট টার্মিনাল থেকে ছেড়ে যায় লঞ্চ। বৃহস্পতিবার পোস্তগোলা সেতু থেকে তোলা ছবি - কাজল হাজরা

করোনার সংক্রমণ প্রতিরোধে নিরাপদ সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে মেনে চলার ওপর শুরু থেকেই গুরুত্ব আরোপ করে আসছিলেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য বিভাগের সংশ্নিষ্ট সবাই। বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা মেনে চলা হয়নি। এবার পবিত্র ঈদুল আজহা ও কোরবানির পশুর হাটকে সামনে রেখে জনস্বাস্থ্য আরও হুমকির মুখে পড়েছে। এতদিন খুব একটা ভিড় না থাকলেও গতকাল বৃহস্পতিবার শেষ কর্মদিবসে সড়ক-মহাসড়কে ঈদে ঘরমুখী মানুষের চাপ বেড়েছে।

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদ্বার শিমুলিয়া ও পাটুরিয়া এবং মাওয়া ফেরিঘাটে গাড়ির দীর্ঘ জট লেগেছে। লঞ্চ ও বাসে যাত্রীর ভিড় বেড়েছে। লাখো মানুষের ভিড়ে সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা সম্ভব হচ্ছে না। এমনকি অনেকের মুখে মাস্কও ছিল না। লঞ্চ ও বাসে সামাজিক দূরত্ব মানা হয়নি। বাসে দুই সিটে একজন যাত্রী পরিবহনের কথা থাকলেও গতকাল তার ব্যত্যয় ঘটেছে। আজ শুক্রবার শেষ সময়ে বাড়ি ফেরা মানুষের ভিড় আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পথে করোনার ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি ফিরছে লাখো মানুষ। লাখো মানুষের এভাবে যাতায়াত করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াবে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের অভিমত, শুরু থেকেই ঈদে বাড়ি ফিরতে মানুষকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আটকানো গেল না। হাজার হাজার মানুষ বাড়ি ফিরেছেন। তারা ঈদশেষে আবার ঢাকায় ফিরবেন। এভাবে যাতায়াতের মাধ্যমে প্রত্যেকের মধ্যে করোনার ঝুঁকি তৈরি হবে। এতে আগস্টে সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এএসএম আলমগীর সমকালকে বলেন, নিরাপদ সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে মেনে না চলাই ছিল দেশে করোনা বিস্তারের মূল কারণ। স্বাস্থ্য বিভাগ শুরু থেকেই এ বিষয়টিতে সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করলেও অধিকাংশ মানুষ তা আমলে নেয়নি। এতে সংক্রমণের বিস্তার ঘটেছে। আসন্ন ঈদ সামনে রেখে আরও অন্তত দুই সপ্তাহ আগে থেকে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তা কেউ আমলে নেয়নি। স্বাস্থ্য বিভাগের সতর্কবার্তা আমলে নিলে সড়ক-মহাসড়কে এভাবে উপচেপড়া ভিড় হওয়ার কথা নয়।

ডা. আলমগীর বলেন, রাজধানীসহ দেশের কয়েকটি এলাকা থেকে কোরবানির হাটের কিছু ছবি এসেছে। তাতে লক্ষ্য করা গেছে, মানুষ নূ্যনতম সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না। অনেকে মাস্কও ব্যবহার করেননি। এটি অত্যন্ত আতঙ্কের। এতে সংক্রমণ বাড়বে। আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে নতুন করে আক্রান্ত ও মৃত্যু বাড়তে পারে। এটি মোকাবিলা করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন তিনি।

করোনার উচ্চ সংক্রমণের মধ্যে লাখো মানুষের ঈদযাত্রায় ঝুঁকি আরও বাড়বে বলে মনে করেন অন্য জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাও। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ সমকালকে বলেন, এবার শুরুর দিকে গ্রামে ফেরার ভিড় ততটা ছিল না। কিন্তু বৃহস্পতিবার থেকে ভিড় অনেকটা বেড়েছে।

বিষয়টি নিয়ে আগে থেকেই সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু মানুষ তা আমলে নেয়নি। লক্ষ্য করলাম অধিকাংশ মানুষ সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধিও মানেননি। এতে কিন্তু নিজেই ঝুঁকিতে পড়লেন। এসব মানুষ বাড়ি ফিরে পরিবারের সদস্য, প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনদের সংস্পর্শে যাবেন। এতে ওইসব ব্যক্তিও ঝুঁকিতে পড়বেন। অর্থাৎ সবার জন্য ঝুঁকি তৈরি হলো। কিন্তু সাবধানতা অবলম্বন করলে এটি থেকে আমরা রক্ষা পেতে পারতাম। অথচ সেটি সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় সবার প্রতি আহ্বান থাকবে, বাড়ি ফিরে সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন। নিজেকে ও পরিবারের সদস্যদের সুরক্ষিত রাখুন।

দেশে করোনার সংক্রমণ নিয়ে পূর্বাভাস দিচ্ছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জনস্বাস্থ্যবিদদের সমন্বয়ে গঠিত আট সদস্যের একটি দল। সর্বশেষ পূর্বাভাসে তারা বলেছিলেন, আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে করোনার সংক্রমণ নিম্নমুখী হবে। কিন্তু ঈদযাত্রায় তাদের ওই পূর্বাভাস পাল্টে যাচ্ছে।

জনস্বাস্থ্যবিদদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির প্রধান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহ মনির হোসেন সমকালকে বলেন, সংক্রামক রোগ করোনাভাইরাস প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের মূল বিষয় হলো সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা এবং স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে মেনে চলা। এর ব্যত্যয় ঘটলে সংক্রমণ বাড়বে। শুরু থেকেই তো এটি বলে আসছি। জনসাধারণকেও সতর্ক করা হয়েছে। কিন্তু ওই সতর্কবার্তা অধিকাংশ মানুষ আমলে নিয়েছেন বলে মনে হয়নি। রাস্তাঘাটে মানুষের চলাচলের দৃশ্য দেখলে মনে হয়, সবকিছু স্বাভাবিক আছে। ঢাকার সড়কে চিরচেনা যানজট। উপচেপড়া মানুষের ভিড়। অনেকের মুখে মাস্কও থাকে না। আবার ঈদকে সামনে রেখে সড়ক-মহাসড়কে হাজার হাজার মানুষের ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সেখানেও সামাজিক দূরত্ব মানা হচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে তো সংক্রমণ কোনোদিনই নিয়ন্ত্রণে আসবে না। সুতরাং আগের ওই পূর্বাভাসও কাজে আসবে না।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে শুরু থেকেই অব্যবস্থাপনা ছিল এবং সেটি এখনও অব্যাহত আছে। সুতরাং এই অবস্থায় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসার প্রসঙ্গটি অবান্তর।

তিনি বলেন, কোরবানির পশুর হাটে জনসমাগম, শেষ মুহূর্তে হাজার হাজার মানুষের গ্রামে ফেরা, এরপর কোরবানির মাংস কাটাকাটি, মাংস সংগ্রহসহ ঈদে একে অন্যের সংস্পর্শে যাবেন লাখ লাখ মানুষ। এ অবস্থায় রোগটি যে ছড়িয়ে পড়বে, তা নিশ্চিত করে বলা যায়। সুতরাং আগামী আগস্টে করোনার নিম্নমুখী সংক্রমণের যে কথা বলা হচ্ছিল, তা আর ঠিক থাকছে না। সংক্রমণ আরও বাড়বে এবং এজন্য আমাদের ব্যবস্থাপনাই দায়ী।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সমকালকে বলেন, 'নিজেকে ও প্রিয়জনকে সুরক্ষিত রাখতে সবার সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে মেনে চলা প্রয়োজন। আমরা শুরু থেকেই কিন্তু বিষয়টি বলে আসছি। গণমাধ্যমে প্রতিদিন এ সম্পর্কিত বার্তা প্রচার করা হচ্ছে; কিন্তু মানুষ সচেতন হচ্ছে না। আবার সবার প্রতি আহ্বান থাকবে, নিরাপদ সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে মেনে চলুন। নিজেকে ও পরিবারকে সুরক্ষিত রাখুন।'

ঈদের ছুটিতে জরুরি বিভাগ চালু :এবার ঈদের ছুটিতে জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সার্বক্ষণিক জরুরি বিভাগ চালু রাখার নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। গত ২২ জুলাই স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের উপসচিব মোহাম্মদ রোকন উদ্দিন স্বাক্ষরিত এ-সংক্রান্ত এক আদেশে বলা হয়, ঈদুল আজহা উপলক্ষে সব সরকারি হাসপাতালে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করতে হবে। ঈদের দিন বিশেষ প্রয়োজনে মেডিকেল টিম ও নির্ধারিত সরকারি ছুটির দিনে সীমিত আকারে বহির্বিভাগ খোলা রাখা এবং জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সার্বক্ষণিক জরুরি বিভাগ চালু রাখতে হবে। তবে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মীরা সরকারি ছুটির দিনে অফিস করবেন কিনা, সে সম্পর্কে আদেশে বিস্তারিত কিছু বলা হয়নি।

গত ঈদের সময় স্বাস্থ্য বিভাগের সবার ছুটি বাতিল করা হয়েছিল। তবে গতকাল নিয়মিত বুলেটিনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা জানান, আজ শুক্রবার থেকে শুধু আইইডিসিআরের হটলাইন নম্বর ১০৬৫৫-তে কল গ্রহণ করা হবে। অন্য নম্বর বন্ধ থাকবে। তবে কতদিন অন্য নম্বর বন্ধ থাকবে কিংবা কেন বন্ধ থাকবে, সে সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।