সরেজমিন ভাসানচর

আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের বাসস্থানও প্রস্তুত

রয়েছে জীবিকার বন্দোবস্ত

প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২০     আপডেট: ১৮ অক্টোবর ২০২০

সাহাদাত হোসেন পরশ, ভাসানচর (হাতিয়া) থেকে ফিরে

সমুদ্রের বুকে জেগে ওঠা একখণ্ড ভূমি। নোয়াখালীর হাতিয়া দ্বীপের ভাসানচর। এই ভাসানচর এখন দেশে-বিদেশে পরিচিতি পেয়েছে। বিশাল কর্মযজ্ঞ আমূল বদলে দিয়েছে গোটা ভাসানচরকে। এক লাখ রোহিঙ্গা থাকার সুব্যবস্থা করা হয়েছে এখানে। নাগরিক জীবনের সব সুবিধা এখানে নিশ্চিত করা হয়েছে। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের বাসস্থানও তৈরি করা হয়েছে। এসব বাসস্থানে রয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও। হাসপাতাল, স্কুল, সুপারশপ, মসজিদ, খেলার মাঠসহ কী নেই ভাসানচরে। ভবিষ্যতে দেশি-বিদেশি এনজিও এবং উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের থাকার জন্য তৈরি করা হবে আরও দুটি আধুনিক আবাসন কাম অফিস ভবন। সমুদ্রের বুকে বৈচিত্র্যপূর্ণ এক দ্বীপের ভাসানচর এভাবে বদলে গেছে। চোখ জুড়ানো পরিকল্পিত এই আবাসিক এলাকা দেখে সবাই মুগ্ধ।

বর্তমানে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে বসবাস করছেন। অস্থায়ীভাবে এদের স্থানান্তরের লক্ষ্যে তাদের বসবাসের স্থান নির্মাণের জন্য ২০১৭ সালে 'আশ্রয়ণ-৩' নামে প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। চরটি বসবাসের উপযোগী করা, অবকাঠামো উন্নয়ন, বনায়ন ও দ্বীপটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে নৌবাহিনীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

প্রকল্প পরিচালক কমডোর আবদুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের সঠিক ও সময়োপযোগী নির্দেশনায় নির্ধারিত সময়ে মূল প্রকল্পের সব কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে। নৌবাহিনীর সদস্যরা নিরলসভাবে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রকল্প এলাকায় ১০টি ভবনকে বিশেষ শেল্টার হিসেবে তৈরি করা হয়। ইউএনসহ আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের বাসস্থান ও অফিস নির্মাণ করা হয়েছে। পুরো প্রকল্পে নাগরিক জীবনের প্রায় সব সুবিধাও আছে। ভাসানচর ঘুরে দেখা যায়, প্রশাসনিক কাজে নিয়োজিত জাতিসংঘ প্রতিনিধিদের জন্য একটি, শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের প্রতিনিধিদের জন্য একটি, রেডক্রস ও আন্তর্জাতিক এনজিওর জন্য একটি, মাল্টিপারপাস সুপারশপের জন্য একটি, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জন্য দুটি, মসজিদের জন্য দুটি, স্কুলের জন্য তিনটি, ২০ শয্যার হাসপাতাল দুটি ও চারটি কমিউনিটি ক্লিনিক তৈরি করা হয়েছে সেখানে।

চট্টগ্রাম থেকে সন্দ্বীপ, হাতিয়া, নোয়াখালী, চাঁদপুর, ঢাকা ও বিভিন্ন এলাকা থেকে ছোট জাহাজ ও কার্গো ভেসেলে নৌপথে নিরাপদে গমনের জন্য কিছু সংখ্যক 'নেভিগেশনাল বয়' স্থাপন করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ভাসানচরসংলগ্ন অভ্যন্তরীণ নৌপথটি চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী জাহাজ ও কার্গো ভেসেল চলাচলের জন্য ব্যবহূত হবে বিধায় সঠিক নেভিগেশনের জন্য একটি লাইট হাউস নির্মাণ করা হয়েছে। প্রকল্প এলাকায় অগ্নি-প্রতিরোধ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দুটি ফায়ার জিপ একটি ফায়ার স্টেশনও আছে।

দ্বীপটিতে বসবাসরত জনবলের নিরাপত্তা ও জরুরি স্থানান্তরের জন্য চারটি ল্যান্ডিং ক্রাফট ইউটিলিটি (এলসিইউ) খুলনা শিপইয়ার্ডে নির্মাণ শেষে ভাসানচরের কাজে মোতায়েন করা হয়েছিল। এছাড়া গণচীনে নির্মাণ করা ৮টি হাইস্পিড বোট কমসোয়াডস ও ইশা খান বোট পুলের অধীনে ভাসানচরে চলাচলের জন্য নিয়োজিত আছে। জরুরি উদ্ধার, ত্রাণ কাজসহ মালামাল বহনের জন্য দুটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন (রাত্রিকালীন অবতরণ সুবিধাসহ) হেলিপ্যাড নির্মাণ করা হয়েছে।

প্রকল্প এলাকায় ১২০টি ওয়েস্ট বিন নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। সবুজ বর্জ্যসমূহ কম্পোজিট সার হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। বাকি বর্জ্য লোকালয় থেকে দূরে ডাম্প করা হবে। নন কম্পোস্টেবল বর্জ্য পোড়ানোর জন্য ইনসিনারেটর দহনচুল্লির নির্মাণ কাজ দ্রুত শুরু হবে।

প্রকল্প এলাকায় এক লাখ লোকের জন্য প্রতি মাসে এক হাজার ১২৫ টন জ্বালানির প্রয়োজন হবে। রান্নার সুবিধা হিসেবে থাকবে ইকো স্টোভ। এতে জ্বালানি হিসেবে চারকোল ও কাঠকয়লা ব্যবহার হবে। প্রকল্পে আছে ২৫০টি বায়োগ্যাস প্লান্ট। ভাসানচরের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ নেটওয়ার্ক ভালো। ছোট-বড় প্রায় ৪২ কিলোমিটার আরসিসি ও হেরিংবোন সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা রয়েছে। ভাসানচরে ২০ শয্যাবিশিষ্ট ২টি হাসপাতাল ও চারটি কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। ভাসানচরে নির্মিত প্রতিটি শেল্টারের নিচতলায় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, সামাজিক অনুষ্ঠান এবং প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে।

প্রকল্প এলাকা ঘুরে আরও দেখা যায়, ভাসানচরে এখনই ১০ হাজারের মতো মহিষ আছে। ব্যক্তিগত উদ্যোগে এসব মহিষের খামার পরিচালনা করা হয়। সরকারি সংস্থার মাধ্যমে মহিষের দুধ সংগ্রহ করতে চাইলে দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদন কার্যক্রমও গ্রহণ করা যেতে পারে। ভাসানচরে বর্তমানে সাড়ে ৩০০ ভেড়া আছে। ৫০টি ভেড়ার মাধ্যমে এর লালনপালন কার্যক্রম শুরু করা হয়েছিল। ভাসানচরের ঘাসের ওপর তারা নির্ভরশীল। তাদের বাড়তি কোনো খাবার লাগে না। ভাসানচরে ফলদ ও বনজ বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। চলতি বছরই লাগানো হয়েছে দুই লাখ গাছ। প্রকল্প এলাকায় জলাধার হিসেবে একটি বড় লেক তৈরি করা হয়েছে। এটি মৎস্য চাষে সহায়ক হবে। সংশোধিত ডিপিপিতে আরও দুটি লেক তৈরির করার প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়া পরীক্ষামূলকভাবে ধান চাষ করেও ভাসানচরে সফলতা মিলেছে। বরিশাল এলাকায় উৎপাদন হয় এমন ধান চাষ করা হচ্ছে এখানে।

কক্সবাজার থেকে ভাসানচরে রোহিঙ্গারা স্থানান্তরিত হওয়ার পর তারা চাইলে অর্থনৈতিক নানা কাজে অংশ নিতে পারবেন। সেখানে এ ধরনের নানা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। যদিও বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের জন্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সংশ্নিষ্ট হওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কার্ডের মাধ্যমে রেশন ও খাবার পাবেন তারা। তবে নীতিনির্ধারকদের সবুজসংকেত ও রোহিঙ্গাদের মতামতের ভিত্তিতে তারা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও জড়িত হতে পারেন।