সাতক্ষীরায় ৪ খুন

রায়হানুলই হত্যাকারী

প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২০

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি

রায়হানুলই হত্যাকারী

রায়হানুল ইসলাম

পারিবারিক দ্বন্দ্বের প্রতিশোধ নিতেই কোমল পানীয়র সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে বড় ভাই, ভাবি, ভাইপো ও ভাতিজিকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যার কথা স্বীকার করেছে নিহত শাহিনুর রহমানের ছোট ভাই রায়হানুল ইসলাম। তবে শিশু মারিয়া কাউকে চিনবে না বলে তাকে হত্যা করেনি সে। গতকাল বুধবার বিকেলে সাতক্ষীরা সিআইডি কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান সিআইডির খুলনা বিভাগীয় অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ ওমর ফারুক।

সংবাদ সম্মেলনে সিআইডির এ কর্মকর্তা বলেন, রায়হানুল বেকার ছিল। এ কারণে গত জানুয়ারি মাসে তার স্ত্রী বাপের বাড়ি চলে যায়। এর পর থেকে ভাই-ভাবির সংসারে সে খাওয়া-দাওয়া করত। রায়হানুল কোনো কাজকর্ম করত না বলে প্রায়ই ভাই-ভাবি তাকে গালমন্দ করতেন। ঘটনার দিন গত ১৪ অক্টোবর ভাবি তাকে বকাঝকা করেন। ওই দিনই রায়হানুল সিদ্ধান্ত নেয় ভাবিকে সে হত্যা করবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী সন্ধ্যার পর একটি দোকান থেকে ঘুমের ওষুধ কিনে কোমল পানীয়র (স্পিড) সঙ্গে মিশিয়ে কৌশলে রাতেই ভাবি ও দুই বাচ্চাকে খাইয়ে দেয়। রাতে ভাবি ও বাচ্চারা ঘুমিয়ে পড়ে। রাত দেড়টার দিকে বড় ভাই শাহিনুর রহমান বাইরে থেকে বাড়িতে ফিরে দেখেন রায়হানুল টেলিভিশন দেখছে। এত রাত পর্যন্ত টেলিভিশন দেখা নিয়েও রায়হানুলকে বকাঝকা করেন ভাই শাহিনুর। তখন সে সিদ্ধান্ত নেয় শুধু ভাবিকে নয়, ভাইকেও সে খুন করবে। কৌশলে ভাইকেও ঘুমের ওষুধ মেশানো কোমল পানীয় পান করায়। এরপর রাত ৩টার দিকে ভবনের কার্নিশ বেয়ে ছাদে ওঠে রায়হানুল। ছাদের দরজা খুলে নিচতলায় গিয়ে প্রথমে ভাইকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যার পর তার পা বেঁধে ফেলে রেখে আসে। এরপর পাশের ঘরে গিয়ে ভাবির গলায় চাপাতির কোপ দেয়। ভাবির চিৎকারে ছেলেমেয়েরাও জেগে ওঠে। তখন একে একে সবাইকে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা নিশ্চিত করে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় রায়হানুল। ভোরে প্রতিবেশীদের নিজেই ডাকাডাকি করতে থাকে।

সিআইডি কর্মকর্তা ওমর ফারুক আরও জানান, রায়হানুলের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী বাড়ির পাশের পুকুর থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহূত চাপাতি উদ্ধার করা হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে সিআইডি সাতক্ষীরার বিশেষ পুলিশ সুপার আনিছুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। সন্ধ্যায় তিনি জানান, ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি নিতে আসামি রায়হানুলকে আদালতে হাজির করা হয়েছে। তবে রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত জবানবন্দি রেকর্ডের বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায়নি।

গত ১৫ অক্টোবর ভোররাতে কলারোয়া উপজেলার হেলাতলা ইউনিয়নের খলসি গ্রামের শাহাজান আলীর ছেলে হ্যাচারি মালিক শাহিনুর রহমান (৩৮), তার স্ত্রী সাবিনা খাতুন (৩৫), ছেলে সিয়াম হোসেন মাহি (৯) ও মেয়ে তাসনিম সুলতানাকে (৬) কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করা হয়। নারকীয় এই হত্যাকাণ্ডের সময় বেঁচে যায় ওই পরিবারের একমাত্র সদস্য চার মাসের শিশুকন্যা মারিয়া সুলতানা। শিশুটি বর্তমানে হেলাতলা ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্য নাসিমা খাতুনের হেফাজতে রয়েছে।

ওই ঘটনায় নিহত শাহিনুরের শাশুড়ি ময়না খাতুন বাদী হয়ে কারও নাম উল্লেখ না করে কলারোয়া থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলাটি রুজুর পর থেকেই তদন্তভার নেয় সিআইডি। পরদিন গ্রেপ্তার করা হয় শাহিনুরের ভাই রায়হানুলকে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গত রোববার আদালত থেকে তাকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে রায়হানুল জানায়, একাই সে চারজনকে চাপাতি দিয়ে হত্যা করেছে।

এদিকে মঙ্গলবার বিকেলে এই হত্যা মামলায় আরও তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা হলো- খলসি গ্রামের আব্দুস সামাদের ছেলে আব্দুর রাজ্জাক, আবুল কাশেমের ছেলে আব্দুল মালেক ও আসাদুল ইসলাম। এদের মধ্যে রাজ্জাক ও মালেক নিহত শাহিনুরের নিকট প্রতিবেশী এবং আসাদুল ইসলাম শাহিনুরের হ্যাচারির কর্মচারী বলে জানা গেছে।