উচ্চশিক্ষায় ফিরছে সেশনজট

৪১ লাখ শিক্ষার্থী দিশেহারা, চাকরির বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে অনেকের

প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২০     আপডেট: ২২ অক্টোবর ২০২০

সাব্বির নেওয়াজ

দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ২০০৯ সালের আগে প্রতিষ্ঠানভেদে সেশনজট ছিল এক থেকে দেড় বছরের। কিন্তু ২০১২ সালের মধ্যে সব বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই তা উধাও হয়ে যায়। এমনকি সেশনজটের শীর্ষে থাকা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ও ক্রাশ প্রোগ্রামের মাধ্যমে দূর করে সেশনজট। কিন্তু চলতি বছর কভিড-১৯-এর ছোবলে উচ্চশিক্ষা আবারও সেই সেশনজটের ফাঁদে পড়তে চলেছে।

করোনাভাইরাসের ছোবলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কয়েক মাস টানা বন্ধ থাকায় এবং আবাসিক হলগুলো খালি করে দেওয়ায় শিক্ষার্থীরা সবাই বর্তমানে যার যার বাড়িতে রয়েছেন। গত আগস্ট থেকে অনলাইনে ক্লাস শুরু হলেও আটকে গেছে শত শত পরীক্ষা। উপাচার্যদের কপালে পড়েছে চিন্তার ভাঁজ। সংশ্নিষ্ট ডিনরা বলছেন, এখন বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দিয়ে কোর্স পড়ানো শেষ করে পরীক্ষা নেওয়া শুরু করলেও অন্তত এক বছরের সেশনজটে পড়তে হবে শিক্ষার্থীদের। কভিড-১৯-এর সংক্রমণ প্রথমবারের মতো সেশনজট সৃষ্টি করেছে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও। কবে নাগাদ আটকে থাকা পরীক্ষাগুলো নেওয়া শুরু করা যাবে, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। কয়েকজন উপাচার্য সমকালের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাব্যবস্থাকে স্বাভাবিক ও গতিশীল করতে সরকার একের পর এক উদ্যোগ নিয়েছে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও একইভাবে বিশেষ নজর দিতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) থেকে জানা গেছে, দেশে ৪৬টি সরকারি এবং ১০৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা পড়েছেন বিপাকে। দেশের উচ্চশিক্ষায় মোট শিক্ষার্থী ৪১ লাখের ওপর। এর মধ্যে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন লাখ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চার লাখ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৮ লাখ, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঁচ লাখ এবং ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে আরও এক লাখ ছাত্রছাত্রী পড়ছেন। করোনায় বিভিন্ন বর্ষের সেমিস্টার, ইনকোর্স ও বর্ষ ফাইনাল পরীক্ষা পিছিয়ে গেছে। বিশেষ করে চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীদের সংকট বেশি। নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা শেষ হলে তারা এতদিনে চাকরির বাজারে ঢুকে যেতেন। কিন্তু কভিড তাদের জীবনে ঘোর অমানিশা হয়ে দেখা দিয়েছে।

সরকারের নির্দেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনলাইন ক্লাস শুরু করা হলেও প্রত্যন্ত এলাকায় থাকা অন্তত ৫৫ শতাংশ শিক্ষার্থীর কোনো ইন্টারনেট সুবিধা নেই। অনলাইনে ক্লাস করতে অনীহা রয়েছে ৭৭ শতাংশ শিক্ষার্থীর। পড়ালেখার বাইরে রয়েছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৮ লাখ শিক্ষার্থীও। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কোনো কোনো কলেজে নামমাত্র অনলাইন ক্লাস চললেও শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততা তাতে খুবই কম। আরও পিছিয়ে পড়ছেন উন্মুক্ত ও আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা।

গত ১৭ মার্চ থেকে বন্ধ দেশের সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আগামী ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত এই বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে করোনার সাম্প্রতিক চালচিত্র থেকে ধারণা করা হচ্ছে, নভেম্বরেও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো খোলা সম্ভব হবে না। এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তির ইস্যুও সামনে চলে এসেছে। সম্প্রতি ইউজিসির অনলাইন সভায় উপাচার্যরা জানিয়েছেন, একাডেমিক পরীক্ষা শেষ করে পুরোনোদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়ে যাওয়ার সুযোগ দিতে হবে। নইলে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ার ফলে সংকট আরও তীব্র হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেশনজটের আশঙ্কায় ১৭ অক্টোবর উপাচার্যরা বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদের সভায় অনলাইনে একাডেমিক পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করেন। অনলাইনে পরীক্ষা নেওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মুনাজ আহমেদ নূরের নেতৃত্বে তৈরি করা একটি সফটওয়্যার নিয়ে তাদের মধ্যে আলোচনাও হয়েছে।

তবে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনলাইনে একাডেমিক পরীক্ষা দেওয়া নিয়ে তাদের মধ্যে নানা সংশয় রয়েছে। ইন্টারনেটের দুর্বল গতি, বিদ্যুৎ না থাকা, সব শিক্ষার্থীর স্মার্ট ফোন না থাকার মতো বিষয় নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। প্রসঙ্গত, গত মে মাসে ইউজিসি একটি সমীক্ষা চালায়। সেখানে ৪০ হাজার শিক্ষক-শিক্ষার্থী ৭২টি প্রশ্নের উত্তর দেন। সমীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের ৮৬.৬ শতাংশের স্মার্ট ফোন আছে। ৫৫ শতাংশের ল্যাপটপ আছে। অন্যদিকে সব শিক্ষকের ল্যাপটপ আছে। কিন্তু পরীক্ষা নেওয়ার ক্ষেত্রে ইন্টারনেট খরচ, দুর্বল নেটওয়ার্কসহ বেশ কয়েকটি সমস্যার কথা জানিয়েছেন তারা।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় :বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের দেওয়া তথ্যমতে, গত মে মাস থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় অনলাইনে ক্লাস শুরু হয়। তবে গুটিকয়েক বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া বাকিগুলো মূলত জোড়াতালির অনলাইন ক্লাস নিচ্ছে। মূলত সেমিস্টার ও টিউশন ফি আদায় করতেই বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কোনোরকমে অনলাইন ক্লাস চালাচ্ছে।

বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েই বছরে তিনটি সেমিস্টার। জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত স্প্রিং, মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত সামার এবং সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ফল সেমিস্টার। স্প্রিং সেমিস্টারের মাঝামাঝিতে এসে শুরু হয় করোনাকাল। ফলে বাকি কোর্স তারা অনলাইনে সম্পন্ন করে পরীক্ষাও নেয়। ক্লাস করুক আর না করুক অথবা যা-ই শিখুক না কেন, তাদের সবাইকেই পরবর্তী সেমিস্টারে উন্নীত করেছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। এতে উচ্চশিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন ও সংশয় দেখা দিয়েছে।

সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র :গড়পড়তা এক হিসাবে দেখা গেছে, কভিডের ছোবলে দেশের ৪৬ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন কোর্সের শুধুমাত্র পরীক্ষাই স্থগিত হয়েছে ২০ থেকে ২২ হাজার। সারাদেশের দুই হাজারের বেশি কলেজের ছাত্রছাত্রীদের উচ্চশিক্ষার দায়িত্ব নেওয়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়েও সৃষ্টি হয়েছে একাডেমিক সংকট। এখানে চতুর্থ বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষা গত মার্চেই শেষ হওয়ার কথা ছিল। বেশিরভাগ পরীক্ষাও দিয়েছিলেন শিক্ষার্থীরা। দুই থেকে পাঁচটি বিষয়ের পরীক্ষা আটকে যায় করোনার কারণে। সেই থেকে হাত গুটিয়ে তারা। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি পাস কোর্স দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষ এবং মাস্টার্স ফাইনাল এপ্রিলের মধ্যে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। তবে করোনা সংক্রমণের কারণে এসব পরীক্ষাও স্থগিত হয়ে যায়। ডিগ্রি পাস কোর্সে প্রতিটি বর্ষে ৩৪টি পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল। গত আগস্ট পর্যন্ত মাস্টার্স প্রিলিমিনারি, অনার্স প্রথম বর্ষ পরীক্ষাও হওয়ার কথা ছিল। প্রতিটি বর্ষের ৩১টি বিষয়ে পরীক্ষা ছিল। করোনার কারণে এই পুরো পরীক্ষাসূচিই এলোমেলো হয়ে গেছে। চাকরির বয়স পেরিয়ে যাওয়ায় দুর্ভাবনায় পড়ছেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা।

উপাচার্যরা যা বলেন :সার্বিক বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, বৈশ্বিক এই সংকটকে মেনে নিতে হবে। হতাশাগ্রস্ত হয়ে দিন কাটানো যাবে না। দুর্দিনের কষ্ট ভাগাভাগি করে নেওয়ার দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে সহজেই সংকট কাটানো যাবে। আটকে যাওয়া পরীক্ষাগুলোর কথাও ভাবা হচ্ছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুনাজ আহমেদ নূর বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য 'এডুকেশন বাবল' করা যেতে পারে। এডুকেশন বাবলের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার পুরো পরিস্থিতি আয়ত্তে আনা যেতে পারে। তিনি জানান, কভিড-পরবর্তী সময়ে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পথচলার একটি রূপরেখা তারা ইতোমধ্যেই প্রণয়ন করেছেন।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. হারুন অর রশিদ বলেন, ছাত্রদের উদ্দেশে বলব, তারা যেন বাড়িতে বসে পড়ালেখা করে। এ জন্য যে এই দুর্যোগ কাটিয়ে ওঠার পর আমরা একের পর এক পরীক্ষা নিতে থাকব। আগে যেমন ক্রাশ প্রোগ্রাম করে ওভারকাম করেছি, সেই রকম পদ্ধতি এখানেও প্রয়োগ করতে হবে।