স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে পরিবেশ। সংঘাত ও সহিংসতার ঘটনা বাড়ছে। পাল্টাপাল্টি খুনের ঘটনাও ঘটছে। বিশেষ করে কাউন্সিলর প্রার্থীদের মধ্যে বিরোধ ও দ্বন্দ্ব অনেক এলাকায় রক্তক্ষয়ী সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে। নির্বাচনী সহিংসতায় এরই মধ্যে অন্তত ছয়জন মারা গেছেন। প্রার্থীর পথসভায় গুলি ও হাতবোমা হামলা হয়েছে। ভাঙচুর করা হয়েছে কয়েকটি এলাকায় প্রার্থীর নির্বাচনী ক্যাম্প অফিস। এমন পরিস্থিতি আগামীতেও স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে আরও কিছু এলাকায় সংঘাতের আশঙ্কা করছেন মাঠ পর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। আজ ৬০ পৌরসভায় নির্বাচন। আর এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে কোনো রক্তপাত এড়াতে সতর্ক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

তবে সংঘাত রোধে কঠোর হওয়ার বার্তা দেওয়া হয়েছে সংশ্নিষ্ট সব জেলার পুলিশ সুপার, ডিআইজি ও মেট্রোপলিটনে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের। আগাম গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে নৈরাজ্য করার আগেই সন্দেহভাজনদের আইনের আওতায় নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। অনেক জেলার পুলিশ কর্মকর্তা বলছেন, জাতীয় নির্বাচনের মতোই পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে। নির্বাচনী আচরণবিধি স্মরণ করিয়ে দিতে জেলার তথ্য কর্মকর্তার মাধ্যমে মাইকিং করিয়ে প্রার্থী, সমর্থক ও ভোটারদের সতর্ক করা হচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড প্ল্যানিং) মো. হায়দার আলী খান সমকালকে বলেন, নির্বাচনে সহিংসতা রোধে পুলিশকে দফায় দফায় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পুলিশ সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করবে। দু-চার জায়গায় যেখানে সংঘাত হয়েছে, এর সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার কথাও বলা হয়।

এখন পর্যন্ত যেসব এলাকার নির্বাচন ঘিরে সংঘাতের বেশি আশঙ্কা করা হচ্ছে তার মধ্যে ঝিনাইদহের শৈলকূপা ও চট্টগ্রাম অন্যতম। সর্বশেষ শুক্রবার ভোর ৫টার দিকে চট্টগ্রাম নগরের দেওয়ানবাজারে নির্বাচনী প্রচারণার সময় ছুরিকাঘাতে আহত আশিকুর রহমান রোহিত (২২) নামে এক ছাত্রলীগ কর্মী চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। রোহিত নগরের ওমরগণি এমইএস কলেজের ছাত্র ছিলেন। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রচারণা শুরুর দিন ৮ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরীর প্রচারণায় অংশ নেওয়ার সময় ছুরিকাঘাতে আহত হয়েছিলেন তিনি।

নির্বাচন ঘিরে মাঠ পর্যায়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে- এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ভোলা জেলার পুলিশ সুপার সরকার মোহাম্মদ কায়সার সমকালকে জানান, নির্বাচন ঘিরে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর তাদের নজর রাখতে হচ্ছে। কারণ, দেখা গেল এক প্রার্থীর সমর্থক অন্য প্রার্থীর বিপক্ষে ফেসবুকে কোনো একটি ভুল বা বিকৃত তথ্য পোস্ট করেছে। তখন এ নিয়ে দু'পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

একটি ঘটনার উদাহরণ দিয়ে তিনি আরও বলেন, বোরহানউদ্দিন পৌরসভার একজন কাউন্সিলরের প্রার্থিতা প্রথমে বাতিল হয়েছিল। পরে আপিল করে তিনি আবার প্রার্থিতা ফিরে পান। কিন্তু ওই প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বীর সমর্থকরা ফেসবুকে তাদের নেতা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে গেছেন বলে প্রচারণা চালাতে থাকেন। পরে যখন দেখা যায় তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হননি, তখন উভয় গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ হয়।

পৌরসভা নির্বাচন ঘিরে এরই মধ্যে রক্ত ঝরেছে ঝিনাইদহে। পাল্টাপাল্টি খুনের ঘটনায় এখনও ওই জেলার শৈলকূপার পরিস্থিতি নাজুক। বুধবার রাতে ঝিনাইদহের শৈলকূপায় ৮ নম্বর ওয়ার্ডের দুই কাউন্সিলর প্রার্থী শওকত হোসেন ও আলমগীর হোসেন খান বাবুর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় কাউন্সিলর প্রার্থী শওকত হোসেনের ভাই লিয়াকত হোসেন বল্টু মারা যান। ওই রাতেই ওই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী আলমগীর হোসেন খান বাবুর লাশ পাওয়া যায়। এ ঘটনায় এরই মধ্যে ওই ওয়ার্ডের নির্বাচন স্থগিত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এরই মধ্যে বল্টুর পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়েছে। তবে গতকাল পর্যন্ত বাবুর পরিবার পুলিশের কাছে কোনো অভিযোগ দাখিল করেনি।

ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার মুনতাসিরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, আর কোনো সংঘাত যাতে না হয়, এ ব্যাপারে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। যে এলাকা অতি ঝুঁকিপূর্ণ মনে হচ্ছে, সেখানে বেশি ফোর্স থাকবে।

অন্য একটি জেলার পুলিশ সুপার সমকালকে জানান, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তার এলাকায় একটি দেশীয় অস্ত্র তৈরির কারখানার সন্ধান মিলেছিল, যারা নির্বাচন সামনে রেখে সেখানে রামদা তৈরি করছিল। পরে এ ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হয়েছিল। গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে চক্রের সদস্যরা অকপটে স্বীকার করে, নির্বাচন ঘিরে সংঘাত-সহিংসতার সময় রামদার চাহিদা বাড়ে। এ কারণে গোপনে রামদা তৈরি করছিল তারা।

মাঠ পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, কাউন্সিলর প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে বিরোধ থেকেই অধিকাংশ এলাকায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটছে। এই পদে দলীয় প্রতীকে ভোট হচ্ছে না। এ কারণে একই ওয়ার্ডে একই দলের একাধিক প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।

নির্বাচন ঘিরে যেসব জায়গা উত্তপ্ত তার মধ্যে অন্যতম হলো চট্টগ্রাম। এরই মধ্যে নির্বাচন ঘিরে উত্তাপের মাঝে সেখানে পৃথক ঘটনায় চারজন নিহত হয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগে বৈধ অস্ত্র জমা এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে অভিযানের দাবি জানিয়েছেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেন।

এরই মধ্যে নির্বাচন ঘিরে সংঘাত হয়েছে নরসিংদীর মনোহরদীতে। ওই পৌরসভার আওয়ামী লীগের প্রার্থী আমিনুল ইসলামের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। ভাঙচুর করা হয় মেয়র প্রার্থীর গাড়িসহ বেশ কয়েকটি যানবাহন। পোড়ানো হয় বেশ কয়েকটি মোটরসাইকেল। একই দিন রাজশাহীর আড়ানী পৌরসভায় আওয়ামী লীগ মেয়র প্রার্থী শহিদুজ্জামান শাহিদের পথসভায় গুলি ও বোমা হামলার ঘটনায় ঘটে।

সব পৌরসভায় পুলিশের একটি স্ট্রাইকিং ফোর্স ও প্রতি তিন ওয়ার্ডে একটি করে মোবাইল ফোর্স থাকবে। থাকছে র‌্যাবের টিমও। এক লাখের বেশি ভোটার, এমন পৌরসভায় ৪ প্লাটুন বিজিবি থাকবে। এ ছাড়া ভোটার সংখ্যাভেদে বিজিবির নির্দিষ্ট সংখ্যক প্লাটুন দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় নিয়োজিত থাকছে।





মন্তব্য করুন