করোনা মহামারির ধাক্কায় গত বছর নির্মাণ মৌসুমে কাজ প্রায় বন্ধ ছিল। নতুন পরিস্থিতিতে পিছিয়ে পড়া কাজের পাশাপাশি নতুন অনেক নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে রডের চাহিদা। এই সুযোগে দামও বাড়িয়ে দিয়েছে কোম্পানিগুলো। এখন ব্যয়ের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন নির্মাতারা। গত ডিসেম্বরে এক দফায় প্রতি টন রডের দাম ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা বাড়ানো হয়। চলতি মাসে গত এক সপ্তাহে আবার দাম বেড়েছে। এবার রডের দাম টনপ্রতি ৫ থেকে সাড়ে ৭ হাজার টাকা বাড়িয়েছে কোম্পানিগুলো। এতে করে এক মাস যেতে না যেতেই প্রতি টন রডে দাম বেড়েছে ১৩ থেকে ১৬ হাজার টাকা।

বছরের অন্য সময়ে রডের দাম কম থাকলেও নির্মাণ মৌসুমে কিছুটা বৃদ্ধি পায়। এর পরও গত নির্মাণ মৌসুমের চেয়ে এবার টনপ্রতি রডের ব্যয় বেড়েছে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। গত বছরের শুরুতে নির্মাণকাজ চালু থাকলেও মার্চে করোনা মহামারিতে সারাদেশে সামাজিক দূরত্ব ও চলাচল নিয়ন্ত্রণ করায় সব কাজ বন্ধ হয়ে যায়। তখন সবাই ছিল ঘরমুখী। ওই সময়ে নির্মাণকাজ বন্ধ ছিল। রডের চাহিদাও কমে গিয়েছিল। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করলেও শুরুতে দাম কম ছিল। গত অক্টোবর থেকে করোনার নতুন পরিস্থিতিতে ধীরে ধীরে নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। এতে আগাম প্রস্তুতি না থাকায় চাহিদা বাড়লেও সরবরাহ বাড়াতে পারেনি মিলগুলো। আমদানিনির্ভর এ শিল্পের কাঁচামাল আগাম আমদানি না করায় বাজারে পর্যাপ্ত রড সরবরাহ করতে পারেননি ইস্পাত শিল্প মালিকরা।

এদিকে করোনার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে স্ট্ক্র্যাপের সরবরাহ কমে যাওয়ায় দাম বেড়েছে। এর ফলে এখন বেশি দামে স্ট্ক্র্যাপ আমদানি করছে মিলগুলো। এদিকে বাজারের বাড়তি চাহিদার সুযোগে আগের কম দামে আমদানি করা স্ট্ক্র্যাপের রড এখন কোম্পানিগুলো বেশি দামে বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ করেছেন অবকাঠামো নির্মাতারা।

গতকাল রাজধানীর বাজারে প্রতি টন ৬০ গ্রেডের রড কোম্পানিভেদে ৬৭ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। আর ৪০ গ্রেডের রড ৬৫ থেকে ৬৭ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে, যা এক সপ্তাহ আগেও যথাক্রমে ৬৩ থেকে ৬৫ হাজার ও ৫৭ হাজার ৫০০ থেকে ৬০ হাজার ৫০০ টাকা ছিল। গত বছর একই সময়ে নির্মাণ মৌসুমে ৬০ গ্রেড ৫৯ হাজার ৫০০ থেকে ৬১ হাজার ৫০০ টাকা ও ৪০ গ্রেড ৫১ হাজার থেকে ৫৫ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছিল। এর পরে করোনার কারণে চাহিদা কমে যাওয়ায় টনপ্রতি আরও ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা দাম কমে যায়।

রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এবার রডের দাম বেড়েছে ১৪ থেকে ২৫ শতাংশ। গত এক মাসে রডের দাম বেড়েছে ১১ থেকে ১৫ শতাংশ। এক সপ্তাহে বেড়েছে টনপ্রতি ৫ হাজার থেকে সাড়ে ৭ হাজার টাকা।

বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মো. শহীদুল্লাহ সমকালকে বলেন, এপ্রিল ও মে মাসে রডের ব্যবহার কমে যাওয়ায় দাম কমে যায়। তখন আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দামও কম থাকে। এর পরে চলাফেরার বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ায় কাঁচামালের সরবরাহ আর বাড়েনি কিন্তু চাহিদা বেড়েছে। এমনকি চীন আগে খনিজ লোহা ব্যবহার করেছে। তারা করোনার কারণে স্ট্ক্র্যাপ ব্যবহারের জন্য আমদানি বাড়িয়েছে। এতে কাঁচামালের দাম বেড়েছে। ফলে দেশের বাজারে রডের দাম বেড়েছে। তিনি বলেন, কাঁচামালের দাম দ্বিগুণ বাড়লেও রডের দাম ওই তুলনায় অনেক কম। এখন বাড়তি দামে স্ট্ক্র্যাপ আমদানি করে কম দামে রড বিক্রি কঠিন হয়ে পড়বে। সম্পূর্ণ কাঁচামাল আমদানিনির্ভর এই পণ্যের দাম আন্তর্জাতিক বাজার দামের সঙ্গে সংগতি রেখেই বেচাকেনা হবে।

গত সপ্তাহে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কনস্ট্রাকশন ইন্ডাস্ট্রি (বিএসিআই) জানায়, দেশে রডের দাম বেড়ে যাওয়ায় নির্মাণ খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গত শনিবার সংবাদ সম্মেলেনে সংগঠনের নেতারা অভিযোগ করেন, নভেম্বর ও ডিসেম্বরে রডের দাম ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বেড়েছে। এ কারণে এই খাতের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক্ক কমানোর দাবি করেন তারা। একই সঙ্গে তারা অভিযোগ করেন, মিলগুলো আগে কম দামে স্ট্ক্র্যাপ এনে এখন বেশি দামে বিক্রি করছে।

এখন দেশের বাজারে রডের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় স্ট্ক্র্যাপ আমদানি বাড়িয়েছে কোম্পানিগুলো। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে চড়া মূল্য দিয়ে স্ট্ক্র্যাপ আনতে হচ্ছে। চাহিদা অনুযায়ী স্ট্ক্র্যাপ এলে রডের সরবরাহ বাড়বে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।

আন্তর্জাতিক পণ্য বাজারভিত্তিক মাধ্যম ফাস্টমার্কেটস ডটকমের গত বৃহস্পতিবারের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে তুলনামূলক কম দামে স্টিল স্ট্ক্র্যাপের তিনটি বাল্ক্ক কার্গো বুকিং দিয়েছে বাংলাদেশের মিলগুলো। বিশ্ব বাজারে স্ট্ক্র্যাপের স্বল্পতা এবং কনটেইনার ও জাহাজ বুকিংয়ে ক্রমাগত অসুবিধার মধ্যে ছিল বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো। এই অঞ্চলের মিলগুলোর মধ্যে স্ট্ক্র্যাপ কেনার প্রতিযোগিতা চলছে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূল থেকে গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের একটি মিল প্রতি টন ৫০৩ ডলারে (৪২ হাজার ৬০১ টাকা) ৩৮ হাজার টন একটি কম্পোজিট কার্গো স্ট্ক্র্যাপ বুকিং দিয়েছে। কার্গোতে এইচএমএস ও স্ট্ক্র্যাপ উপকরণ ৫০০ ডলারের আছে। একই মিল অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে একটি কার্গোতে প্রতি টন ৫০০ থেকে ৫০৫ ডলারে ২২ হাজার টন স্ট্ক্র্যাপ বুকিং দিয়েছে। গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বাজারে ৫০৫ থেকে ৫২০ ডলার দামে স্ট্ক্র্যাপ এনেছে বাংলাদেশের মিলগুলো। গত বৃহস্পতিবার ৫০০ থেকে ৫১০ ডলারে আন্তর্জাতিক বাজারে বেচাকেন হয়েছে। এর ফলে সপ্তাহের ব্যবধানে ৫ থেকে ১০ ডলার কমে স্ট্ক্র্যাপ কিনেছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের আরেকটি ইস্পাত মিল ১৫ হাজার টন জাপানি কার্গো এ সপ্তাহে বুকিং দিয়েছে। এই কার্গো স্ট্ক্র্যাপের প্রতি টনের দাম ৪৩১ ডলার বা ৪৪ হাজার ৭৫১ ইয়েন। দেশটি থেকে গত ডিসেম্বরের নিলামের চেয়ে এবার ৫ হাজার ৭৭৯ ইয়েন বেশি দামে কিনেছে বাংলাদেশ। এই স্ট্ক্র্যাপের প্রতি টনের দাম বাংলাদেশে পড়বে ৪৮৫ ডলার। গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বাজারে স্ট্ক্র্যাপ আমদানি স্থিতিশীল হওয়ায় খাত-সংশ্নিষ্টরা মনে করছেন, স্ট্ক্র্যাপের দাম কমে আসবে। গত সপ্তাহে ব্রাজিল থেকে ৪৮২ ডলারে স্ট্ক্র্যাপ কেনার জন্য চুক্তি করেছে বাংলাদেশের একটি মিল। ফাস্টমার্কেটসের দর পর্যালোচনায় দেখা যায়, আগের সপ্তাহের চেয়ে গত সপ্তাহে বাংলাদেশে স্ট্ক্র্যাপ আমদানিতে দাম প্রতি টনে ৫ ডলার বেশি পড়েছে। গত সপ্তাহে গড়ে ৪৭৫ থেকে ৪৮৫ ডলারে আমদানি হয়েছে। আগের সপ্তাহে ৪৭৫ থেকে ৪৮০ ডলারে আমদানি হয়।

আগামী সপ্তাহে স্ট্ক্র্যাপের দাম কমবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ীরা। ইতোমধ্যে তুরস্ক ও পাকিস্তানের বাজারে দাম কমেছে। বাংলাদেশ বাল্ক্ক কার্গো কেনায় স্ট্ক্র্যাপের বাজারে দাম কমবে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে স্টিলের দামও কমবে। যদিও গত মাসের চেয়ে স্ট্ক্র্যাপের দাম টনপ্রতি ১০০ ডলার বেড়েছে। তবে স্থানীয় বাজারে সেভাবে রডের দাম বাড়েনি বলে দাবি করেন বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা।

লন্ডন মেটার এক্সচেঞ্জের তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে স্ট্ক্র্যাপের দাম নিম্নমুখী। বর্তমানে প্রটি টন স্ট্ক্র্যাপের গড় দাম ৪৭২ ডলার। তিন মাসে পরে যা সরবরাহ হবে তা ৪৫৭ ডলারে। তবে ফাস্টমার্কেটসের তথ্য অনুযায়ী, স্ট্ক্র্যাপের দাম গত তিন মাসে প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। গত অক্টোবরে প্রতি টন ২৪৪ ডলার থেকে ২৫১ ডলার ছিল। পর্যায়ক্রমে তা বেড়ে এখন ৫০০ ডলার ছাড়িয়েছে।

দেশে ইস্পাত শিল্প খাতে রড ও অ্যাঙ্গেল বারসহ সব ধরনের উৎপাদিত পণ্যের বার্ষিক বিক্রির পরিমাণ ৪৫ হাজার কোটি টাকা। দেশে বছরে রডের চাহিদা ৫৫ লাখ টনের বেশি। এই চাহিদার বেশিরভাগই থাকে নির্মাণ মৌসুমে।















মন্তব্য করুন