কেউ কাঁদলেন আনন্দে, কোথাও গম্ভীরার সুর

প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারি ২০২১     আপডেট: ২৪ জানুয়ারি ২০২১

সমকাল প্রতিবেদক

কেউ কাঁদলেন আনন্দে, কোথাও গম্ভীরার সুর

মুজিববর্ষের উপহার হিসেবে শনিবার খুলনার ডুমুরিয়ায় জমি ও সেমিপাকা বাড়ির দলিল হাতে উল্লসিত এক নারী- ফোকাস বাংলা

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে ঘর পেয়ে গৃহহীন কেউ কেউ আনন্দে কেঁদে ফেলেছেন, কেউবা আবার খুশির জোয়ারে ভেসেছেন। কোথাও পরিবেশন করা হয়েছে ভাওয়াইয়ার সুর, তো অন্যত্র শোনা গেছে গম্ভীরার তান।

গতকাল দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘরের চাবি হস্তান্তরের সময় এসব দৃশ্য দেখা যায়। এ সময় দেশের চারটি জায়গা থেকে উপকারভোগীরা যুক্ত হয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন। প্রথমেই প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্ত হন খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার কাঁঠালতলা গ্রামে। সেখানে প্রথমবারের মতো বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ভিডিও কনফারেন্সে কথা বলেন পারভীন নামে এক নারী। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আনন্দে কেঁদে ফেলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর দীর্ঘায়ু এবং সুস্থতা কামনা করেন তিনি।

পারভীন বলেন, 'আমার স্বামী কাজ পায় না। মাঝেমধ্যে না খেয়ে থাকতে হয়। মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল না। কোনোদিন ভাবিনি ঘর হবে। আপনি আমাদের ঘর দিয়েছেন, জমি দিয়েছেন। আপনি দীর্ঘদিন বেঁচে থাকুন।' কয়েকটি বাক্য বলেই উপকারভোগী নারী কৃতজ্ঞতায় কাঁদতে থাকেন।

প্রধানমন্ত্রী তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, 'আপনি কাঁদবেন না। আমি মনে করি এটা আমার কর্তব্য। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে, জাতির পিতার কন্যা হিসেবে দেশের মানুষের জন্য কাজ করব, সিদ্ধান্ত নিয়েছি তার স্বপ্ন পূরণ করব। দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে হবে। সেজন্য আমি আমার জীবনকে উৎসর্গ করেছি। বাংলাদেশে একটি মানুষও যেন গৃহহীন ও ভূমিহীন না থাকে, আমি সেই ব্যবস্থা করব। সেসঙ্গে আপনারা যেন আপনাদের জীবন-জীবিকার পথ খুঁজে পান সেই ব্যবস্থাও করব।'

সারাদেশে যারা ঘর পেয়েছেন তাদের ঘরের সামনে একটি করে গাছ, বিশেষ করে ফলদ গাছ লাগানোর আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। নদীভাঙনে আর কেউ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেজন্য সংশ্নিষ্ট কর্তৃৃপক্ষকে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ারও নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।

এরপর প্রধানমন্ত্রী নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর উপজেলার কামারপুর গ্রামের ঘর পাওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেন। সেখানে এক উপকারভোগী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাকে সালাম দিয়ে জানতে চান, 'প্রধানমন্ত্রী আপনি কি ভালো আছেন'? জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'আমি ভালো আছি। আপনারা কি খুশি?' জবাবে তিনি বলেন, 'খুশি, খুব খুশি। স্বামী-সন্তান নিয়ে মানুষের বাড়িত আছিনু। খুব কষ্টে আছিনু। এখন তোমরা মোক শেখের বেটি শেখ হাসিনা জায়গা জমি, ঘর, কল, সবকিছুই উপহার দিছে। স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখে থাকো। এখন হামরা খুব খুশি। আল্লাহর কাছে দোয়া করি তোমরা দীর্ঘজীবী হও। সুস্থ থাকো, ভালো থাকো, আর এই দেশের উপকার করো।'

পরে উত্তরাঞ্চলের ঐতিহ্য ভাওয়াইয়া গানের সুরে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান উত্তরের এই জেলার সুবিধাভোগীরা। সুরে সুরে শোনান 'বঙ্গবন্ধুর যোগ্য কন্যা আমার শেখ হাসিনা, দেশ-বিদেশে নাই যে তুলনা'। গান শুনে হাততালি দিয়ে তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'খুব ভালো লাগছে। সেখানে তো আপনারা মেলা বসিয়েছেন। নিশ্চয় শীতের পিঠা-টিটা খাওয়া হচ্ছে। সবাই ভালো থাকেন সেই দোয়া করি।'

পরে চুনারুঘাট উপজেলার গাজীপুর ইউনিয়নের ইকরতলী গ্রামে নির্মিত আশ্রয়ণ প্রকল্পে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ভিডিও কনফারেন্সে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় সেখানে ঘর পাওয়া দরিদ্র নুরু মিয়া প্রধানমন্ত্রীকে সালাম দিয়ে বলেন, 'দুই শতক জায়গাসহ আপনি আমাদের সুন্দর পাকা ঘর দিয়েছেন। আমরা আজ অনেক খুশি। আমি এখন আমার বউ-বাচ্চা নিয়ে সুখে-শান্তিতে থাকতে পারমু। আমি আপনার জন্য দোয়া করমু আল্লাহ যেন আপনার হায়াত বাড়াইয়া দেন। আপনি যেন আরও গরিব-দুঃখীদের সাহায্য করতে পারেন।' তার বক্তব্য শোনার পরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি খুব খুশি হলাম। আপনারা ভালোভাবে থাকেন এটাই আমি চাই।

এরপর প্রধানমন্ত্রী চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার বালিয়াবান্দি ইউনিয়নের সল্লা গ্রামের আশ্রয়ণ প্রকল্পে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দেন। উপকারভোগীরা 'জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু' স্লোগান দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান। এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও তাদের সঙ্গে কণ্ঠ মেলান। পরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের পক্ষ থেকে তারা প্রধানমন্ত্রীকে তাদের ঐতিহ্যবাহী গম্ভীরা গান শোনান। হারমোনিয়াম, তবলা নিয়ে এবং নানা-নাতি তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে পরিবেশন করেন- 'প্রধানমন্ত্রী আপনাকে জানাই সাদর সম্ভাষণ, আপনি করছেন দেশের উন্নয়ন, হে নানা ভূমিহীন মানুষেরা তাইতো পাইলো সুখের দরশন'। প্রধানমন্ত্রীকে উচ্ছ্বসিতভাবে তা উপভোগ করতে দেখা যায়।

পরে সেখানে ঘর পাওয়া এক শারীরিক প্রতিবন্ধী ফাতেমা বেগম প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, 'আমার কোনো ঠিকানা ছিল না। আজ আপনার দেওয়া জমি আর বাড়িতে আমার ঠিকানা হয়েছে। এখানে আমার পরিবার নিয়ে এখন বসবাস করতে পারব। আমি খুব খুশি হয়েছি। আল্লাহর কাছে আপনার জন্য অনেক অনেক দোয়া করি। আপনি যেন দীর্ঘজীবী হোন। আমার মতো আরও অসহায় মানুষের উপকার করতে পারেন।'

'শেখ হাসিনা আমার মা লাগে' :আখাউড়া (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি জানান, বাড়ির দলিল হাতে পেয়ে আবেগাপ্লুত পারুল বেগম। খুশিতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। বলেন, 'এতদিন জায়গা-জমি ছিল না। এখন বাড়ির মালিক হয়েছি, ঘর পেয়েছি। স্বপ্নপূরণ হয়েছে। এখন স্বামী-সন্তান নিয়ে শান্তিতে থাকতে পারুম। প্রধানমন্ত্রীর জন্য আজীবন দোয়া করুম।'

গতকাল উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে ৪৫টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারের মাঝে বাড়ির দলিল হস্তান্তর করা হয়। উপকারভোগী মাজেদা বেগম বলেন, 'আমার জায়গা-জমি, ঘরবাড়ি কিছুই ছিল না। দুটি প্রতিবন্ধী সন্তান নিয়ে মানুষের বাড়িতে থাকতাম। ঘর পাইয়া আমি খুবই খুশি। আমার খুবই ভালো লাগছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমার মা লাগে। মাকে আল্লাহ হাজার বছর বাঁচিয়ে রাখুক।'

এরপর শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নতি- ড. মোমেন : সিলেট ব্যুরো জানায়, মুজিববর্ষ উপলক্ষে আশ্রয়ণ প্রকল্প শেষে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নতির জন্য কাজ শুরু হবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। তিনি বলেন, দেশের গৃহহীন-ভূমিহীনদের বিনামূল্যে বসতঘর নির্মাণ প্রকল্প শুরু হয়েছে। ধাপে ধাপে এই কার্যক্রম আরও বৃদ্ধি পাবে। মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ জন্য আমরা গর্বিত। সব সমস্যা পর্যায়ক্রমে সমাধান করে বাংলাদেশকে আরও এগিয়ে নিতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তিনি বলেন, এই প্রকল্প শেষ হলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নতির জন্য কাজ শুরু করবে সরকার। গতকাল শনিবার সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের পর সদর উপজেলার গৃহহীন আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় ১৭ পরিবারকে ঘরের চাবি বুঝিয়ে দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেন।

আর কেউ এভাবে ঘর করে দেবে না- তথ্যমন্ত্রী :রাঙ্গুনিয়া প্রতিনিধি জানান, তথ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের মানুষের অন্ন ও বস্ত্রের সমস্যার সমাধান অনেক আগেই করেছেন। এখন গৃহহীনদের মাথা গোঁজার জন্য ঠাঁই করে দিচ্ছেন। গতকাল চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় মুজিববর্ষ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার আশ্রয়ণের ঘর ও জমির দলিল হস্তান্তর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, যদি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় না থাকে, এখন যে গৃহহীনরা ঘর পেয়েছেন তা অন্যরা ক্ষমতায় এলে কেড়ে নেবে। নৌকা মার্কার সরকার ক্ষমতায় না থাকলে অন্য কাউকেও এভাবে আর কেউ ঘর করে দেবে না। প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ নিজের নির্বাচনী এলাকায় নিজের ও দলের নেতৃবৃন্দের অর্থায়নে এ ধরনের অন্তত ৫০টি ঘর করে দেবেন বলেও জানান অনুষ্ঠানে।

গজারিয়ায় ঘর হস্তান্তর করলেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী :সমকাল প্রতিবেদক জানান, মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় মুজিববর্ষে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ঘর পেলেন ১৫০ জন। মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা মুন্সীগঞ্জ জেলার গজারিয়া উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে উপস্থিত থেকে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে এ উপজেলার ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারের কাছে ঘরের কবুলিয়ত দলিল, নামজারিপত্র ও গৃহ প্রদানের সনদ হস্তান্তর করেন। প্রতিমন্ত্রী বলেন, মুজিববর্ষে বঙ্গবন্ধুকন্যা ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের জন্য যে ৯ লাখ ঘর প্রদান করছে তা সাধারণ মানুষের উন্নয়নে জনসেবার অনন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে।