এর চেয়ে বড় উৎসব আর হতে পারে না

গৃহহীনদের ঘরের চাবি বুঝিয়ে দিলেন প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারি ২০২১

অমরেশ রায়, সৈয়দপুর (নীলফামারী) থেকে

এর চেয়ে বড় উৎসব আর হতে পারে না

মুজিববর্ষ উপলক্ষে শনিবার সারাদেশে প্রায় ৭০ হাজার ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে ঘরের চাবি হস্তান্তর অনুষ্ঠানে উৎফুল্ল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা - পিআইডি

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী 'মুজিববর্ষে' গৃহহীন ও ভূমিহীনদের ঘর উপহার দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশের মানুষের জন্য এটি সবচেয়ে বড় উৎসব। এর চেয়ে বড় উৎসব আর হতে পারে না।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, 'আজকে আমার আনন্দের দিন। যাদের কিছুই নেই, তাদের ঘর করে দিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিতে পেরেছি। এই মানুষগুলো যখন এই ঘরে থাকবে, তখন আমার বাবা-মায়ের আত্মা শান্তি পাবে। লাখো শহীদের আত্মা শান্তি পাবে। কারণ, এসব দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই ছিল আমার বাবার লক্ষ্য।' গতকাল শনিবার  গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রায় ৭০ হাজার গৃহহীন ও ভূমিহীন পরিবারের হাতে ঘরের চাবি বুঝিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এ সময় প্রতিটি পরিবারের জন্য বরাদ্দ ২ শতাংশ জমির মালিকানার কাগজপত্রও তুলে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

এদিন ৬৬ হাজার ১৮৯টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে ২ শতাংশ খাসজমির মালিকানা দিয়ে দুই কক্ষবিশিষ্ট একটি ঘর মুজিববর্ষের উপহার হিসেবে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ২১টি জেলার ৩৬টি উপজেলায় ৪৪ প্রকল্পে আরও তিন হাজার ৭১৫টি পরিবারকে ব্যারাকে পুনর্বাসন করা হয়। অর্থাৎ আনুষ্ঠানিকভাবে মোট ৬৯ হাজার ৯০৪ পরিবারকে ঘর ও জমি দেওয়া হয়েছে। একসঙ্গে এত বিপুলসংখ্যক মানুষকে বিনামূল্যে ঘর করে দেওয়ার মধ্য দিয়ে বিশ্বে অনন্য নজির সৃষ্টি করল বাংলাদেশ।

গৃহহীনদের জন্য নির্মিত চারটি উপজেলার আশ্রয়ণ নিবাসের উপকারভোগী মানুষ সরাসরি ভিডিও কনফারেন্স অনুষ্ঠানে যোগ দেন। এ ছাড়া দেশের ৬৪টি জেলার সব উপজেলার মানুষও অনলাইনে এ অনুষ্ঠানে যুক্ত ছিলেন।

'মুজিববর্ষে কেউ গৃহহীন থাকবে না'- প্রধানমন্ত্রীর এমন ঘোষণার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের অধীন চলমান গৃহ ও জমি প্রদান কর্মসূচির প্রথম পর্যায়ে সারাদেশে এসব ঘর পায় ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবার। ভূমিহীন ও গৃহহীনদের ঘর করে দিতে এখন পর্যন্ত প্রায় ৯ লাখ পরিবারকে তালিকাভুক্ত করেছে শেখ হাসিনার সরকার। বাকিদেরও পর্যায়ক্রমে ভূমি ও ঘর দেওয়া হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা এ দেশের মানুষের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন। মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন। বঙ্গবন্ধু নিজের কথা কখনও চিন্তাও করেননি। স্বাধীনতার পর দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে তিনি পাঁচ বছর মেয়াদি যে পরিকল্পনা নিয়েছিলেন, সেটা বাস্তবায়ন করে যেতে পারলে বাংলাদেশের মানুষ অনেক আগেই উন্নত হতে পারত।

পঁচাত্তরে জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার পর ছয় বছরের নিজের নির্বাসন জীবনের কথা তুলে ধরে বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, 'জিয়াউর রহমান আমাকে ও আমার বোনকে ছয় বছর দেশে ঢুকতে দেননি। পাসপোর্ট পর্যন্ত রিনিউ করতে দেননি। আওয়ামী লীগ আমাকে সভাপতি করার পর মানুষের কথা চিন্তা করেই জোর করে দেশে ফিরে এসেছিলাম। আমার লক্ষ্য একটাই- আমি নিজে কী পেলাম বা পেলাম না, সেটি বড় কথা নয়। মানুষকে কী দিতে পারলাম, সেটিই বড় কথা। '

বঙ্গবন্ধু হত্যা-পরবর্তী সামরিক স্বৈরশাসকদের দুঃশাসনের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ তখন কী পেয়েছে? অনেকে গালভরা কথা বলেন, মানুষ নাকি তখন গণতান্ত্রিক অধিকার পেয়েছে! প্রধানমন্ত্রী বলেন, জিয়াউর রহমান অবৈধভাবে ক্ষমতায় গিয়ে বিএনপি নামের দল গঠন করে ভোট কারচুপির মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে। ওই নির্বাচনে ১১০ ভাগ ভোটও পড়েছিল! আগে থেকেই পরিকল্পনা ছিল, আওয়ামী লীগকে ৪০টির বেশি আসন দেওয়া হবে না। সেবার আওয়ামী লীগকে ৩৯টি আসনই দেওয়া হয়েছিল। যারা গণতন্ত্রের কথা বলেন, এটা কী ধরনের গণতন্ত্র? একটি দল সৃষ্টি হলো, যে দলটি শিশুর মতো হাঁটতেও শিখল না, সেই দলটিই ক্ষমতায় চলে গেল?

২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের দুর্নীতি, লুটপাট ও সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ এবং পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুঃশাসনের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ২০০১ থেকে ২০০৮ সাল দেশের জন্য সত্যিকারের একটা অন্ধকার যুগ ছিল। জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস ও দুর্নীতি-লুটপাট ২০০১ সালে বিএনপির সময়ই শুরু হয়েছিল। তাদের কারণেই পরে ওয়ান-ইলেভেন আসে।

মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে সবার জন্য আবাসন নিশ্চিত করার দৃঢ়প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, মুজিববর্ষে একজন মানুষও গৃহহারা থাকবে না। ঠিকানাহীন থাকবে না। আমরা সবার জন্য ঠিকানা করে দেব, সবাইকে ঘর করে দেব। বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ যেন সুন্দরভাবে বসবাস করতে পারে, সেটাই আমার লক্ষ্য।

একসঙ্গে এত বিপুলসংখ্যক মানুষকে ঘর দেওয়ার বিরল নজির প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'আমি জানি না, পৃথিবীর কোনো দেশে কখনও অথবা আমাদের দেশে কোনো সরকার এত দ্রুত এতগুলো ঘর করেছে। এই ঘরগুলো তৈরি করা সহজ কথা নয়।' এ জন্য সরকারের বিভিন্ন প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, এতটা সমন্বিত কার্যক্রম এর আগে দেশে হয়নি।

করোনাভাইরাসের মধ্যেও দেশকে এগিয়ে নিতে তার সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলো তুলে ধরে টানা তিনবারের সরকারপ্রধান বলেন, করোনা যেমন একদিকে অভিশাপ, তেমনি আমাদের জন্য আশীর্বাদও বয়ে এনেছে। কারণ, এ সময়ে আমরা এই কাজগুলো ভালোভাবেই করতে পেরেছি। দেশের মানুষের দোয়া চাই, যেন এই দেশটাকে জাতির পিতার স্বপ্নের ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলতে পারি। প্রতিটি মানুষ যেন ভালোভাবে বেঁচে থাকতে পারে। তারা যেন সুন্দর ও উন্নত জীবন পায়, সকলের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়।

পরে দেশের চারটি জায়গা থেকে উপকারভোগীরা যুক্ত হয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন। প্রথমেই প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্ত হন খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার কাঁঠালতলা গ্রামে। সেখানে প্রথমবারের মতো বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ভিডিও কনফারেন্সে কথা বলেন শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়া। পরে মোনাজাত পরিচালনা করেন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের সিনিয়র পেশ ইমাম মাওলানা মুফতি মিজানুর রহমান।