নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে সাংবাদিক বুরহান উদ্দিন মোজাক্কিরের রক্তাক্ত অবস্থার একটি ভিডিও সমকালের হাতে এসেছে। ৩১ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, উপজেলার চাপরাশিরহাটে গুলিবিদ্ধ মোজাক্কিরের বাঁচার আর্তনাদ। রক্তাক্ত ওই সাংবাদিক 'ভাই, আমাকে বাঁচান, প্লিজ আমাকে বাঁচান' বলে আকুতি জানাচ্ছেন। গত শুক্রবার বিকেলে চাপরাশিরহাট বাজারে আওয়ামী লীগের দু'পক্ষে গোলাগুলির সময় মোবাইলে ধারণ করা ভিডিও এটি। সেখানে একজনকে বলতে শোনা যায়, 'মোবাইলে আছে, আছে...।'

প্রত্যক্ষদর্শী একাধিক ব্যক্তি জানান, প্রথম দফায় গোলাগুলির পর কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে দ্বিতীয় দফা গোলাগুলি শুরু হয়। তখন ছবি তুলতে গিয়ে মোজাক্কির (২৩) গুলিবিদ্ধ হন। প্রথমে তাকে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে রাতেই উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে শনিবার রাত পৌনে ১১টায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। মোজাক্কির অনলাইন পোর্টাল 'বার্তা বাজার' ও দৈনিক বাংলাদেশ সমাচার-এর কোম্পানীগঞ্জ প্রতিনিধি ছিলেন। গতকাল রোববার রাতে তার লাশ বাড়িতে আনা হলে এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরে রাত ৮টায় জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

উপজেলার চরফকিরা ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডে বাদশা মিয়া মেস্তরী বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়িতে লোকে লোকারণ্য। স্বজনদের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে। তিন ভাই ও চার বোনের মধ্যে মোজাক্কির সবার ছোট। বড় ভাই মোফাচ্ছের ঢাকার ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সহকারী গবেষক। আরেক ভাই নুর উদ্দিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। মোজাক্কির গত বছর নোয়াখালী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর পরীক্ষা দিয়ে প্রথম শ্রেণি পান। মেধাবী এই ছেলেটি হারিয়ে এলাকাবাসী সবার চোখই অশ্রুসিক্ত।

স্থানীয়দের ধারণা, সাংবাদিক মোজাক্কির অস্ত্রধারীদের ছবি তুলে ফেলায় চিহ্ন মুছতে ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে গুলির নিশানা করা হয়েছে। এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। সেদিন বিকেলে নোয়াখালীর এএসপি খালেদ ইবনে মালেক ও কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি মীর জাহেদুল হক রনির নেতৃত্বে পুলিশ চাপরাশিরহাট পূর্ব বাজার পরিচালনা কমিটির অফিস থেকে পুরো বাজারের সিসিটিভির ডিবিআর জব্দ করেছে।

চাপরাশিরহাট পূর্ব বাজার পরিচালনা কমিটির সহসভাপতি মফিজ উল্যাহ বলেন, পুলিশ তদন্ত করলে সব বেরিয়ে আসবে। বাজারের সিসিটিভির ফুটেজ দেখলেও সেদিন কী হয়েছে, তা অনুমান করা সম্ভব হবে। তিনি নিহত সাংবাদিক বুরহান উদ্দিন মোজাক্কির হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান।

সেদিনের প্রত্যক্ষদর্শী এক ফল ব্যবসায়ী জানান, রক্তাক্ত হয়ে মোজাক্কির বাঁচার জন্য দৌড়ে চাপরাশিরহাট পূর্ব বাজারে একটি দোকানে ঢুকে পড়েন। পরিস্থিতি অনুকূলে ছিল না বলে প্রায় এক ঘণ্টা পর তাকে সেখান থেকে বের করে হাসপাতালে পাঠানো হয়।

কোম্পানীগঞ্জ রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন মজনু সাংবাদিক বুরহান উদ্দিন মোজাক্কিরের খুনিদের অবিলম্বে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, মোজাক্কির পেশাগত কাজে গিয়ে খুনের শিকার হয়েছেন। এখানে তাকে কারও অনুসারী বা রাজনৈতিক কর্মী তকমা দেওয়া উচিত হবে না।

কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি মীর জাহেদুল হক রনি বলেন, সাংবাদিকের মৃত্যুর ঘটনাটি পুলিশ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে। সিসিটিভি ডিবিআর উদ্ধার করা হয়েছে। ফুটেজ পর্যালোচনা করে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হবে।

গত শুক্রবার বিকেলে চাপরাশিরহাট বাজারে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বাদলের নেতৃত্বে দলীয় নেতাকর্মীদের একটি মিছিলে বসুরহাট পৌরসভার মেয়র আবদুল কাদের মির্জার সমর্থকরা হামলা চালায়। এতে দু'পক্ষের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। দফায় দফায় সংঘর্ষ ও গোলাগুলিতে অন্তত ৬০ জন আহত হন। সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত সাংবাদিক বুরহান উদ্দিন মোজাক্কির শনিবার রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান।

মন্তব্য করুন