'ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ/ দুপুর বেলার অক্ত/ বৃষ্টি নামে, বৃষ্টি কোথায়?/ বরকতের রক্ত'। কবি আল মাহমুদের এই কবিতার সেই একুশে ফেব্রুয়ারি আর বরকতদের রক্ত বাঙালি জাতির রাষ্ট্রভাষা ও মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল চূড়ান্ত পরিণতির দিকে। ১৯৪৮ সালে শুরু হওয়া ভাষা আন্দোলন এই দিনে এসে রফিক, শফিক, সালাম, বরকতসহ নাম না জানা অসংখ্য সূর্যসন্তানের আত্মদানের মধ্য দিয়ে রক্তআখরে লিখেছিল সাফল্যগাথা- প্রতিষ্ঠা করেছিল মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার। একুশে ফেব্রুয়ারি হয়ে উঠেছিল শহীদ দিবস।

বাঙালির গৌরব, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগময় সেই মহান শহীদ দিবস এখন বিশ্বের সব ভাষাভাষীর অধিকার রক্ষার দিবস- আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। কভিড-১৯ জনিত মহামারির বাস্তবতায় ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে গতকাল রোববার দিবসটি বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে সারা বিশ্বে। রাজধানীতে দিবসের অনুষ্ঠানমালায় করোনা মোকাবিলায় নিরাপদ দূরত্ব মানতে দেখা যায়নি খুব একটা। তবে করোনা মোকাবিলা করে সুসময় আনার প্রত্যয় ছিল সবার চোখেমুখেই। একই সঙ্গে অঙ্গীকার ছিল শোষণমুক্ত অসাম্প্রদায়িক স্বদেশ গড়ার।

মায়ের ভাষার অধিকার কেড়ে নেওয়ার প্রতিবাদে পাকিস্তানি শাসকদের বুলেটের সামনে প্রাণ দিয়েছিলেন যে সূর্যসন্তানরা, পুরো জাতি কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেছে তাদের। যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে বাঙালি পেয়েছিল ভাষার অধিকার, একুশের প্রথম প্রহরে সেসব শহীদের প্রতি ফুলেল শ্রদ্ধায় ভরে ওঠে শহীদ মিনার। মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সিক্ত হয় স্মৃতির মিনার। নগ্ন পায়ে শহীদ মিনারমুখী প্রভাতফেরিতে অংশ নেওয়া মানুষের কণ্ঠে ছিল বিষাদমাখা চিরচেনা সেই গান- 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/ আমি কি ভুলিতে পারি।'

একুশের প্রথম প্রহরে রোববার রাত ১২টা এক মিনিটে নিস্তব্ধতা ভেঙে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বেজে ওঠে কালজয়ী গান 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি।' এ সময় শহীদ বেদিতে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদের পক্ষে তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল এস এম সালাহউদ্দিন ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল নকিব আহমদ চৌধুরী ফুল দিয়ে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। পরে ভাষাশহীদদের প্রতি জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন সংসদের সার্জেন্ট অ্যাট আর্মস কমডোর এমএম নাঈম রহমান।

এ সময় আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার পক্ষে দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী, লে. কর্নেল (অব.) ফারুক খান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল, দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া, উপ-দপ্তর সম্পাদক সায়েম খান প্রমুখ এ সময় উপস্থিত ছিলেন। এরপর শ্রদ্ধা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন, শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামান ও যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধারা। ঢাকার বিভিন্ন দেশের হাইকমিশনার, রাষ্ট্রদূত, কূটনীতিক ও বিভিন্ন দেশের সংস্থাপ্রধানরাও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, ভারপ্রাপ্ত নৌবাহিনী প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম আবু আশরাফ চৌধুরী, বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল মাসিহুজ্জামান সেরনিয়াবাত, পুলিশের আইজি ড. বেনজীর আহমেদ, অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দীন, ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এ. কে. আজাদের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল, এফবিসিসিআইর প্রেসিডেন্ট শেখ ফজলে ফাহিম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি এবং বাংলা একাডেমির প্রতিনিধিরাও একুশের প্রথম প্রহরে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

পরে সবার জন্য শহীদ মিনার উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে সব স্তরের মানুষ শ্রদ্ধার অর্ঘ্য নিয়ে এগোতে থাকেন শহীদ মিনারের দিকে। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই শহীদ মিনার এলাকায় বাড়তে থাকে মানুষের ঢল। দল-মত নির্বিশেষে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান তারা।

আওয়ামী লীগ সকালে রাজধানীর আজিমপুর কবরস্থানে ভাষাশহীদদের কবরে শ্রদ্ধা জানিয়েছে। সেখান থেকে প্রভাতফেরি সহকারে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে শ্রদ্ধা জানায় দলটি। এ সময় আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট আব্দুল মতিন খসরু, আব্দুর রহমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক প্রকৌশলী আবদুস সবুর, সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল, দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া, উপ-দপ্তর সম্পাদক সায়েম খান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এরপর ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, কৃষক লীগ, জাতীয় শ্রমিক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, যুব মহিলা লীগ, ছাত্রলীগ, তাঁতী লীগ, মৎস্যজীবী লীগ, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ ও বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদসহ আওয়ামী লীগের সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতাকর্মীরাও শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানান।

দলের নেতাকর্মীদের নিয়ে আজিমপুর কবরস্থানে ভাষাশহীদদের কবরে শ্রদ্ধা জানান বিএনপি ও এর অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীরা। সেখান থেকে প্রভাতফেরি সহকারে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে শ্রদ্ধা জানান তারা। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমান, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, খায়রুল কবির খোকন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি হাবিব-উন-নবী খান সোহেল প্রমুখ এ সময় উপস্থিত ছিলেন। এ সময় স্বেচ্ছাসেবক দল, যুবদল, ছাত্রদলসহ বিএনপির অঙ্গ-সংগঠনগুলোও শ্রদ্ধা জানিয়েছে। এ ছাড়া 'বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকা স্মৃতি সংসদ'-এর ব্যানারে শ্রদ্ধা জানান বিএনপির কূটনৈতিক উইংয়ের সদস্য প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন।

একুশের প্রথম প্রহর ও ভোর থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আরও শ্রদ্ধা জানিয়েছে বিকল্পধারা বাংলাদেশ, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, সাম্যবাদী দল, গণতন্ত্রী পার্টি, ন্যাপ, গণফোরাম, বাম গণতান্ত্রিক জোট, বাসদ, সিপিবি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি (বিইউবিটি), সেক্টরস কমান্ডার্স ফোরাম, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, বিএফইউজে, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে), শিল্পকলা একাডেমি, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, খেলাঘর, সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্ট, যুব মৈত্রী, যুব ইউনিয়ন, ছাত্র মৈত্রী, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফ্রন্ট, ছাত্র ফেডারেশন, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বঙ্গবন্ধু পরিষদ, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, বঙ্গবন্ধু গবেষণা পরিষদ, আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি, চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, রাষ্ট্রচিন্তা এবং ছাত্র অধিকার পরিষদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী দল, সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান।

শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ভবনসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রধান ভবনে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত ও কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়। সকালে উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামানের নেতৃত্বে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশ থেকে প্রভাতফেরি সহকারে আজিমপুর কবরস্থান ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য, সিন্ডিকেট সদস্য, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এতে অংশ নেন।

দিবসটি উপলক্ষে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে কোরআনখানি, দোয়া ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ শিশু একাডেমি এ উপলক্ষে আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির চেয়ারম্যান লাকী ইনামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব কাজী রওশন আক্তার, শিশু একাডেমির মহাপরিচালক জ্যোতি লাল কুরী প্রমুখ।

বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি (বিইউবিটি) আলোচনা অনুষ্ঠান করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফৈয়াজ খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন প্রমুখ বক্তব্য দেন।

মন্তব্য করুন