২১ আগস্ট হামলা

মঞ্চে গ্রেনেড নিক্ষেপকারী সেই জঙ্গি গ্রেপ্তার

প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১

সমকাল প্রতিবেদক

মঞ্চে গ্রেনেড নিক্ষেপকারী সেই জঙ্গি গ্রেপ্তার

মঙ্গলবার ঢাকার দিয়াবাড়ি থেকে গ্রেপ্তার হুজি জঙ্গি ইকবাল - সমকাল

রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা মামলায় যাবজ্জীবন সাজা পাওয়া হরকাতুল জিহাদের (হুজি) জঙ্গি মো. ইকবালকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। গতকাল মঙ্গলবার ভোরে ঢাকার দিয়াবাড়ি এলাকা থেকে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) সহায়তায় র‌্যাবের বিশেষ দল এই অভিযান চালায়। প্রায় ১৭ বছর ধরে পলাতক এই জঙ্গি তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে জনসভা মঞ্চে গ্রেনেড ছুড়েছিল বলে র‌্যাব জানিয়েছে।

ইতিহাসের জঘন্যতম সেই হামলায় বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা প্রাণে বাঁচলেও বহু নেতাকর্মী হতাহত হন।

অনেকেই এখনও সেই দুঃসহ এবং বিভীষিকাময় স্মৃতি ও ক্ষত বয়ে চলেছেন। ওই ঘটনায় করা মামলায় ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর নিম্ন আদালতের রায়ে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানসহ ১৯ জনকে দেওয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদ। এ ছাড়া বিভিন্ন মেয়াদে আরও ১১ জনের কারাদণ্ড হয়েছিল। দণ্ডিত আসামিদের মধ্যে তারেক রহমানসহ ১৬ জন পলাতক রয়েছে। তবে ইকবালকে গ্রেপ্তারের পরও ১৫ আসামি পলাতক রয়েছে।

গতকাল দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারের র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে হুজি জঙ্গি ইকবালকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানাতে র‌্যাবের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করা হয়। সেখানে র‌্যাবের মহাপরিচালক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, চাঞ্চল্যকর ওই মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারে র‌্যাবও তৎপরতা অব্যাহত রাখে। এরই ধারাবাহিকতায় এনএসআইয়ের দেওয়া তথ্যমতে র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ দল মঙ্গলবার ভোরে দিয়াবাড়ি এলাকায় অভিযান চালিয়ে জঙ্গি মো. ইকবাল হোসেনকে গ্রেপ্তার করে।

তিনি বলেন, ওই গ্রেনেড হামলার পর র‌্যাব ২০০৫ সালে হুজি নেতা মুফতি হান্নান ও তার ভাই মুহিবুল্লাহ ওরফে মফিজ ওরফে অভিকে গ্রেপ্তার করেছিল। এ ছাড়া ওই মামলার সংশ্নিষ্টতায় ২০০৭ সালে ১৬টি আরজিএস গ্রেনেড উদ্ধারসহ ১৫ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। পলাতক ইকবালকেও গ্রেপ্তারের জন্য বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালায়। ২০০৮ সালে তাকে গ্রেপ্তারের জন্য ঝিনাইদহে তার নিজ বাড়ি ছাড়াও গাজীপুর ও সাভারে অভিযান চালানো হয়। ওই সময় ইকবাল আত্মগোপনে থেকে কখনও নিরাপত্তাকর্মী, শ্রমিক, আবার রিকশা মেকানিক ছদ্মবেশ ধারণ করেছিল।

র‌্যাব মহাপরিচালক বলেন, গ্রেপ্তারের পর জঙ্গি ইকবালকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা সম্পর্কে সে জানিয়েছে, মুফতি হান্নানের নির্দেশে সে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় সরাসরি অংশ নেয়। মুফতি হান্নান হামলা চালানোর জন্য তাকে গ্রেনেড সরবরাহ করেছিল। সে মঞ্চ লক্ষ্য করে গ্রেনেড ছুড়েছিল। ঘটনার পর ঝিনাইদহে চলে যায় এবং সেখানে আত্মগোপন করে।

র‌্যাব কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পলাতক অবস্থাতেই যাবজ্জীবন দণ্ড পাওয়া হুজি জঙ্গি ইকবাল সংগঠনকে চাঙ্গা করার চেষ্টায় ছিল। পুরোনো বিভিন্ন হুজি নেতাদের সঙ্গে সে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছিল।

ছাত্রদলের নেতা থেকে হুজি জঙ্গি ইকবাল :জঙ্গি ইকবাল হোসেনের বাড়ি ঝিনাইদহে। তার বাবার নাম আব্দুল মজিদ মোল্লা। গ্রেপ্তারের পর র‌্যাবের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, সে এইচএসসি পাস করেছে। স্কুল ও কলেজে পড়ালেখার সময়ে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। ১৯৯৪ সালে ঝিনাইদহের কেসি কলেজ ছাত্র সংসদে ছাত্রদলের নির্বাচিত শ্রেণি প্রতিনিধি ছিল সে। ১৯৯৫ সালে মালয়েশিয়ায় চলে যায়। তিন বছর পর দেশে ফিরে আইএসডি ফোনসহ নানা ব্যবসা শুরু করেছিল। ২০০১ সালের দিকে ধর্মের দিকে ঝুঁকে পড়ে। স্থানীয় এক হুজি নেতার মাধ্যমে সংগঠনে যোগ দেয়।

সর্বহারার বিরোধে ভেড়ে জঙ্গি সংগঠনে :ইকবাল জানিয়েছে, ১৯৯৮ সালে মালয়েশিয়া থেকে দেশে ফিরে এলাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করলেও ওই সময়ে চরমপন্থি সর্বহারা সদস্যদের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়ে। ততদিনে তার চিন্তা-চেতনায়ও পরিবর্তন আসে। ওই বিরোধ থেকে নিরাপদে থাকতে জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়। ২০০৩ সালের দিকে হুজির শীর্ষ নেতা মুফতি হান্নান ও অন্যান্য শীর্ষ নেতাদের সান্নিধ্যে চলে আসে। এরপর নানা ধরনের জঙ্গি প্রশিক্ষণ নিতে থাকে। ২০০৪ সালের আগস্ট মাসে মুফতি হান্নানের নির্দেশে ঢাকায় চলে আসে এবং গোপন আস্তানায় অবস্থান করতে থাকে। সেখানেই হুজি নেতা মুফতি হান্নানসহ অন্যান্য সমমানা জঙ্গিদের সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আস্থা অর্জন করায় মুফতি হান্নানের সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে সাংগঠনিক গোপন বৈঠকেও অংশ নিত সে।

গ্রেনেড হামলার পর ফের দেশ ছেড়েছিল ইকবাল :র‌্যাবের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ২০০৪ সালে গ্রেনেড হামলার পর সংগঠনের নির্দেশে সে বিভিন্ন এলাকায় আত্মগোপন করতে থাকে। এক পর্যায়ে ২০০৮ সালে দেশ ছেড়ে চলে যায়। বিদেশে আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় সেলিম নাম ধারণ করে। এক পর্যায়ে জাহাঙ্গীর হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিত। তবে অবৈধভাবে বিদেশ থাকায় ২০২০ সালের দিকে তাকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। এরপর সে আত্মগোপনে থেকে সমমনাদের সঙ্গে ফের যোগাযোগ স্থাপন করে চলেছিল।